উন্নয়ন তদারকিতে সংরক্ষিত এমপিরা

গণতন্ত্রের সাথে কতটা সঙ্গতিপূর্ণ

নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি যে দলেরই হোক না কেন, জনগণের রায়কে শ্রদ্ধা জানিয়ে তাদেরকে স্বাভাবিক কাজ করতে দেয়া উচিত। তবে স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে উন্নয়ন তদারকি নিশ্চিত করা হবে প্রকৃত দূরদর্শিতার পরিচয়।

জাতীয় সংসদ মূলত আইন প্রণয়ন এবং সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জায়গা। আইন প্রণেতাদের অবকাঠামো উন্নয়ন বা ঠিকাদারি কাজের তদারকিতে জড়িয়ে ফেলা আমাদের দীর্ঘদিনের ত্রুটিপূর্ণ সংস্কৃতি। উন্নত ও প্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক দেশে এই সংস্কৃতি নেই। সেসব দেশে স্থানীয় সরকার শক্তিশালী ও স্বাধীন।

বাংলাদেশে সংসদ সদস্যদের উন্নয়ন কাজে জড়িত রাখার সংস্কৃতি দীর্ঘদিনের, এ কারণে সেটি রাতারাতি পরিবর্তন করে ফেলা কঠিন। কিন্তু এই পদ্ধতি এখনো অব্যাহত থাকাটা দুঃখজনক। গণমাধ্যমের খবর বলছে, যেসব এলাকায় বিরোধীদলের সংসদ সদস্য রয়েছেন, সেসব এলাকায় উন্নয়ন তদারকি সরকারি দলের সংরক্ষিত আসনের নারী এমপিদের দেয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার।

অতীতে আমরা এ ধরনের প্রবণতা দেখেছি। আওয়ামী লীগ রেজিম বছরে পাঁচ কোটি টাকা এমপিদের বরাদ্দ দিয়েছিল তাদের নিজ নিজ আসনের উন্নয়নে। সরকারদলীয় নারী এমপিদের নির্দিষ্ট আসন না থাকায় তারা বিরোধীদলীয় এমপিদের আসনে এসব বরাদ্দ দিয়ে উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতেন। বর্তমান সরকারও নারী এমপিদের এলাকা ভাগ করে দায়িত্ব দেয়ার কথা বলছে বলে খবর প্রকাশ করেছে সহযোগী একটি পত্রিকা।

গণতান্ত্রিক রীতিতে দেশের সাধারণ আসনগুলোর জনপ্রতিনিধিরা সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন। জনগণ যখন কোনো নির্দিষ্ট দলের বা মতের প্রার্থীকে ভোট দিয়ে বিজয়ী করে, বাংলাদেশের প্রচলিত সংস্কৃতিতে তখন সেই আসনের ভালো-মন্দের ম্যান্ডেট মূলত তার ওপরই বর্তায়। সেই এলাকায় পরাজিত দলের সংরক্ষিত আসনের কোনো এমপিকে সমান্তরাল বা প্রধান দায়িত্ব দিয়ে বসানো হলে সরাসরি নির্বাচিত হয়ে আসা জনপ্রতিনিধির গুরুত্ব থাকে না। এটি জনগণের রায়ের প্রতি অবজ্ঞা, ভোটারদের সরাসরি অপমান করার শামিল। এতে এই আসনগুলোতে তৈরি হয় ক্ষমতার দ্বন্দ্ব। জবাবদিহিতাহীন দ্বৈত শাসনে বিভ্রান্ত হয় স্থানীয় প্রশাসন। বন্ধ হয় সুশাসনের পথ। সেই সাথে খুলে যায় লুটপাটের নতুন খাত।

সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে নারীদের ক্ষমতায়ন, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং নারী নির্যাতন প্রতিরোধের যে দিকনির্দেশনা দেয়া হয়েছে, সেগুলো ইতিবাচক। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সংরক্ষিত আসনের সদস্যরা নির্দিষ্ট দলের প্রতিনিধি নন, তারা দেশের সব নারীর আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটাবেন। আমরাও আশা করি, তারা আইনসভায় দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী তথা নারীদের অধিকার ও বঞ্চনার কথা তুলে ধরবেন। কিন্তু তাদেরকে বিরোধী দলের এলাকায় সমান্তরাল প্রশাসন বা উন্নয়ন তদারকির দায়িত্ব দেয়া ক্ষমতার অপব্যবহার।

সরকারের এই সিদ্ধান্ত গণতান্ত্রিক চেতনার বিপরীত। ক্ষমতার বিভাজন নীতিকেও প্রশ্নের মুখে ফেলে এই সিদ্ধান্ত। আমরা আশা করব, সরকার এমন অনভিপ্রেত ও বিতর্কিত সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসবে।

নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি যে দলেরই হোক না কেন, জনগণের রায়কে শ্রদ্ধা জানিয়ে তাদেরকে স্বাভাবিক কাজ করতে দেয়া উচিত। তবে স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে উন্নয়ন তদারকি নিশ্চিত করা হবে প্রকৃত দূরদর্শিতার পরিচয়।