মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে সৌদি আরব সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের মোট প্রবাসী শ্রমশক্তির প্রায় অর্ধেক কাজ করে সে দেশটিতে। একই সাথে সৌদি আরবে কাজ করা বিদেশী শ্রমিকদের শীর্ষেও রয়েছে বাংলাদেশীরা। আর তাই সৌদি শ্রমবাজারে অস্থিরতা আমাদের উদ্বিগ্ন করে।
গত মঙ্গলবার নয়া দিগন্তে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি আরবে বৈধ কাগজপত্র-এমনকি আকামা থাকার পরও কর্মীদের পুলিশ হয়রানি ও গ্রেফতার করছে। সম্প্রতি সৌদি আরবের ‘সফর জেল’ থেকে দেশে ফেরত আসা এক মধ্যবয়সী কর্মী ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের বলেছেন, আকামা থাকার পরও কাজ পাওয়া যাচ্ছে না। আবার কাজ পেলেও পুলিশ হয়রানি করছে। অনেক সময় আকামা থাকা সত্ত্বেও সেটি অকার্যকর বা ভুয়া বলে ধরে নিয়ে গাড়িতে তুলে সফর জেলে পাঠানো হচ্ছে। কেউ এক সপ্তাহ, কেউ ১৫ দিন জেল খাটার পর তাদের দেশে ফেরত পাঠাচ্ছে। অনেকে মাসের পর মাস আটক থেকেও দেশে ফেরারও সুযোগ পাচ্ছেন না। সৌদি আরব ফেরত এই প্রবাসী শ্রমিকের গুরুতর ভোগান্তি তার একার নয়; দেশটিতে বাংলাদেশী প্রবাসী শ্রমিকদের এই দুরবস্থা বহুদিন ধরে চলছে।
দেশের কিছু অসাধু রিক্রুটিং এজেন্সি চার-পাঁচ লাখ টাকা নিয়ে তথাকথিত ‘ফ্রি ভিসা’র নামে কর্মী পাঠাচ্ছে। এই ভিসাগুলো সাধারণত স্বল্পমেয়াদি (প্রায় তিন মাস) হওয়ায় মেয়াদ শেষ হওয়ার পর কর্মীরা অবৈধ হয়ে পড়ছেন। তখন তারা বাধ্য হয়ে অনানুষ্ঠানিকভাবে কাজ করতে গিয়ে পুলিশের হাতে ধরা পড়ছেন এবং শেষ পর্যন্ত জেলে যাচ্ছেন। সৌদি আরবে প্রতি বছর লাখ লাখ শ্রমিক যায়। এর সুযোগ নিচ্ছে এই অসাধু চক্র। দুর্ভাগ্য হচ্ছেÑ অব্যাহত তারা এ অপকর্ম করছেন। এর ভুক্তভোগী হচ্ছে সাধারণ মানুষ। যেন বিষয়টি দেখার কেউ নেই। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় কেন এ প্রবণতা রোধ করতে পারছে না, সেই প্রশ্ন এসে যায়। সৌদি কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনার মাধ্যমে বিপদে পড়া শ্রমিকদের পাশে দাঁড়াতে হবে সে দেশে আমাদের দূতাবাসকে। প্রবাসে শ্রমিক পাঠানোর নামে যারা অপরাধ করছেন, তাদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
বিদেশী শ্রমবাজার সংশ্লিষ্ট সমস্যা ও অভিযোগের শেষ নেই। কিন্তু এসব সমস্যা সমাধান ও অভিযোগ খতিয়ে দেখার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের যেমন গাফিলতি থাকে, তেমনি নির্দিষ্ট দেশের দূতাবাসের কর্মকর্তাদের কাক্সিক্ষত সহযোগিতা মেলে না।
শ্রম-কূটনীতি জোরদার করা আমাদের জন্য এখন জরুরি। যেসব দেশে প্রবাসী শ্রমিক বেশি রয়েছেন সেখানকার দূতাবাসকে এ লক্ষ্যে সাজাতে হবে। শ্রমিকদের ন্যায্য হিস্যা আদায়ের পাশাপাশি বিপদেও তাদের সাথে থাকতে হবে।
বিশ্বে শ্রমবাজারে দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। সৌদি আরবও তার বাইরে নয়। দেশটি প্রতিনিয়ত প্রযুুক্তি-নির্ভর ও জ্ঞানভিত্তিক শিল্পের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি, জ্বালানি খাত, স্বাস্থ্য ও প্রকৌশল বিভাগে দক্ষ শ্রমিকের চাহিদা বাড়ছে। সেই সাথে নিম্ন দক্ষতাসম্পন্ন কাজের চাহিদা ক্রমশ কমছে। একই সাথে স্থানীয় নাগরিকরা নিজের কাজ নিজেরাই করতে আগ্রহী হয়ে উঠছে। এমতাবস্থায় সৌদি আরব যাওয়ার ক্ষেত্রে শ্রমিকদের শুধু সদনধারী হলেই চলবে না, তাদের হাতে-কলমে দক্ষ হতে হবে।
বাংলাদেশী শ্রমিকদের জন্য অস্থির হয়ে ওঠা সৌদি শ্রমবাজার নিয়ে সরকারকে সময়মতো ব্যবস্থা নিতে হবে।



