সামান্য বৃষ্টিতে চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা

ভোগান্তির স্থায়ী সমাধান হোক

নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে নগরবিদরা মাস্টারপ্ল্যানের কথা বলে আসছেন। কারণ এতে করে কাজ হয় পরিকল্পিত। প্রকল্পগুলো যেমন সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা দরকার, তেমনি এ সমস্যার সমাধানে নগরবাসীর দায়িত্বও কম নয়। চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সামাজিক ঐক্যও জরুরি। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা সমস্যার স্থায়ী অবসান হতে পারে।

বন্দরনগরী চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নতুন কোনো বিষয় নয়। সামান্য বৃষ্টিতেই এ নগরী তলিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়, সেটি সবাই জানে। জলাবদ্ধতা নিরসনে একের পর এক প্রকল্প নেয়া হয়, জলাবদ্ধতা থেকে নগরবাসীর মুক্তি মেলে না। এই ভোগান্তি যেন তাদের স্থায়ী সাথী হয়ে গেছে। কয়েক দিন আগে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র বলেছিলেন, এবার নগরে জলাবদ্ধতা কম হবে। গত মঙ্গলবার মাত্র ছয় মিলিমিটার বৃষ্টিতে চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতার সেই পুরনো চিত্রই দেখা গেল।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মঙ্গলবার বৃষ্টিতে নগরীর প্রবর্তক মোড়, আগ্রাবাদ, হালিশহর, নিউ মার্কেট, তিন পুলের মাথা, কাতালগঞ্জ, আমতলা, এনায়েত বাজারসহ বহু এলাকায় সড়কে পানি জমে চরম দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে।

সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে নগরীর প্রবর্তক মোড় এলাকায়। সেখানে সড়কে বুক সমান পানি জমায় যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। রিকশা, সিএনজি ও ব্যক্তিগত গাড়ি মাঝপথে আটকে যায়। সড়কে সৃষ্টি হয় বিশৃঙ্খলা ও জটলা। পথচারীদের অনেককে কাপড় গুটিয়ে পানি মাড়িয়ে চলতে দেখা গেছে। কেউ কেউ জুতা হাতে নিয়ে হাঁটছেন, আবার কেউ নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য দোকানের ছাউনির নিচে দাঁড়িয়ে ছিলেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। স্থানীয় দোকানপাটেও পানি ঢুকে পড়ায় ক্ষতির মুখে পড়েন ব্যবসায়ীরা।

বর্ষা এখনো আসেনি। তার আগেই যদি বৃষ্টির পানিতে নগরীর এই অবস্থা হয় তাহলে বর্ষার সময় যে অবস্থা আরো বেগতিক হবে, তা সহজেই অনুমেয়। এ নিয়ে নগরবাসীর মধ্যে একধরনের উদ্বেগ আছে; কিন্তু নগরবাসীর এই উদ্বেগ কি নগরের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছবে?

চট্টগ্রামে দুই ধরনের জলাবদ্ধতা দেখা যায়। একটি জোয়ারজনিত এবং অপরটি বর্ষাকালীন। তবে বর্ষকালীন জলাবদ্ধতাই নগরীর অন্যতম সমস্যা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চট্টগ্রাম নগরীর জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণÑ অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ-ব্যবস্থা এবং নিয়মিতভাবে খাল ও নালা পরিষ্কারের অভাব, অপরিকল্পিত বাঁধ, ব্রিজ, কালভার্ট ও সড়ক; পাহাড় কর্তন, পুকুর ও জলাশয় ভরাট, অপরিকল্পিত নগরায়ন প্রভৃতি।

চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে এখন পর্যন্ত প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকারও বেশি প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার আগেই অনেক স্থানে জলাবদ্ধতা আগের মতোই হচ্ছে। কোথাও খাল খননের পর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নেই, কোথাও ড্রেন নির্মাণ হলেও সংযোগ ঠিকভাবে হয়নি। আবার কোথাও ভূমি অধিগ্রহণ জট, কোথাও অবৈধ দখল, কোথাও সমন্বয়হীনতার কারণে কাজ দীর্ঘসূত্রতায় পড়েছে। জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পগুলোতে একধরনের অবহেলা ও নজরদারির অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। এর অবসান হতে হবে।

দখলকৃত খাল, নালাগুলো উদ্ধার করতে হবে। শহরের বিদ্যমান নালা ও খালের প্রতিবন্ধকতা অপসারণ করতে হবে। সেগুলো নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে। পাহাড় কাটা কঠোরভাবে বন্ধ করতে হবে। নগরীর পুকুর-জলাশয় ও নিচু জমিগুলো রক্ষা করতে হবে। জোয়ারজনিত জলাবদ্ধতা নিরসনে খালগুলোতে স্লুইস গেট স্থাপন করতে হবে।

নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে নগরবিদরা মাস্টারপ্ল্যানের কথা বলে আসছেন। কারণ এতে করে কাজ হয় পরিকল্পিত। প্রকল্পগুলো যেমন সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা দরকার, তেমনি এ সমস্যার সমাধানে নগরবাসীর দায়িত্বও কম নয়। চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সামাজিক ঐক্যও জরুরি। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা সমস্যার স্থায়ী অবসান হতে পারে।