প্রবল বর্ষণে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে বন্যায় প্রাণহানি ও বিপুল সম্পদের ক্ষতি হয়েছে। পাহাড়ি ঢল ও ভূমিধস পরিস্থিতি আরো নাজুক করে তোলে। দুই সপ্তাহের ভারী বর্ষণে বৃহত্তর চট্টগ্রামের পাঁচ জেলার বড় একটি অংশ তলিয়ে যায়। মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জও একই সময়ে বন্যার কবলে পড়ে। মোট মিলে দেশের সাত জেলার ৫৭টি উপজেলায় বন্যা দেখা দেয়। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৩৬২টি ইউনিয়ন ও আটটি পৌরসভা। পানিবন্দী অবস্থায় এখনো দিন কাটাচ্ছে ৫০ হাজারের বেশি পরিবার। পানি নেমে যাওয়ার পর বন্যার্তরা পড়েছে নানা ধরনের সমস্যায়। তবে বহু জায়গায় এখনো বন্যার পানি নামেনি। সরকার বন্যার্তদের ঘিরে ত্রাণ কার্যক্রম চালালেও বিপুল দুর্ভোগ সামাল দেয়া যাচ্ছে না।
বন্যায় এবার ৫৮ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি কক্সবাজারে ৩২ জন। এর মধ্যে ১৩ জন রোহিঙ্গাও আছেন। চট্টগ্রামে প্রাণ হারিয়েছেন ১৫ জন। দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মোট মানুষের সংখ্যা ১২ লাখের বেশি। ৫৮০টি আশ্রয়কেন্দ্রে ২২ হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছিল। চট্টগ্রামে ১৪ হাজার ২৮১টি বসতঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাদের আসবাব ও গৃহস্থালি সামগ্রী নষ্ট হয়ে গেছে। বিশুদ্ধ পানি ও খাবার সঙ্কটে পড়েছে।
পানি নেমে যাওয়ার পর বিপুল ক্ষয়ক্ষতি দৃশ্যমান হচ্ছে। সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের তথ্যানুযায়ী, চট্টগ্রাম জোনে ২১৩ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বেসরকারি হিসাবে সেটি এক হাজার ৩২০ কিলোমিটার। তবে এর বেশির ভাগ গ্রামীণ সড়ক, যা চলাচলের অযোগ্য হয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শত শত সেতু কালভার্ট। ধান, শাকসবজি ও পানের বরজ তলিয়ে বিনষ্ট হয়েছে। চট্টগ্রাম অঞ্চলে ১০ হাজার মাছের ঘের পানিতে ভেসে গেছে। পাঁচ জেলায় প্রাথমিক হিসাবে এক লাখ ১২ হাজার গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগির মৃত্যু হয়েছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ দুই উপ খাত মিলে ৪০০ কোটি টাকার বেশি ক্ষতি হয়েছে।
সরকার বন্যাকবলিত এলাকায় নগদ অর্থ, চাল, শুকনো খাবার, শিশুখাদ্য, ঢেউটিন ও গৃহনির্মাণ অনুদানসহ বিভিন্ন ধরনের ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করছে। স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম চলছে। পরিস্থিতি যেখানে গুরুতর সেখানে সেনাবাহিনী নিয়োগ করে ত্রাণ কার্যক্রমে সহায়তা দেয়া হচ্ছে। রাজনৈতিক নেতাকর্মী এবং স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবীরা ত্রাণ কার্যক্রম চালাচ্ছেন। স্থানীয় অর্থনীতি ও অবকাঠামোতে বন্যা যে ক্ষত তৈরি করেছে সেটি সারিয়ে তুলতে এই ত্রাণ কার্যক্রম যথেষ্ট নয়।
বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও মৎস্যখামারি এবং ঘরবাড়ি হারানোরা দীর্ঘমেয়াদি বিপর্যয়ে পড়বেন। এ জন্য প্রণোদনা নিয়ে তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে, যাতে ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারেন। এ ছাড়া স্থানীয় যোগাযোগ অবকাঠামোর বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন হবে। পিচঢালা রাস্তা, ইটের রাস্তা এবং গ্রামীণ কাঁচা রাস্তা এগুলো সম্পূর্ণ চলাচলের উপযোগী করতে দ্রুততার সাথে কার্যক্রম হাতে নিতে হবে।
বন্যা আমাদের দেশে একটি নিয়মিত দুর্যোগ। এ জন্য সবার একধরনের প্রস্তুতি থাকে। তারপরও বিভিন্ন পর্যায়ে কিছু গাফিলতি ও অসতর্কতা ঘাটতি থেকে যায়, যার কারণে ভুক্তভোগীদের কষ্ট বাড়ে। এখন দরকার সরকারি সেবায় আন্তরিকতা, যেন ত্রাণ ও পুনর্গঠনে কোনো ধরনের দুর্নীতি না ঘটে।



