অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সুযোগ এসেছিল জনপ্রশাসন সংস্কারের মাধ্যমে জনবান্ধব করে গড়ে তোলার। সংস্কারের বদলে বাস্তবে পুরনো প্রশাসনের ওপর ভর করে সরকারকে চলতে হয়েছে। এ জন্য পরিণতিও ভোগ করতে হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার বড় যেসব সংস্কার আনতে চেয়েছে, সেগুলোর অনেক কিছু ব্যর্থ করে দিয়েছেন আমলারা। আমলাতন্ত্র সংস্কারে পদক্ষেপ নিতে গিয়ে অনাকাক্সিক্ষত বিক্ষোভ বিশৃঙ্খলার ঘটনা ঘটেছে সচিবালয়ে। ড. ইউনূস সরকারের সময় আনা প্রস্তাব এখন কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ। দেশকে অগ্রগতির ধারায় নিতে দুর্নীতি অনিয়ম স্বজনপ্রীতি মুক্ত গতিশীল একটি স্বচ্ছ প্রশাসন প্রতিষ্ঠার তাগিদ থাকলেও তা এখনো বহু দূরে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গঠিত মুয়ীদ কমিশন জনপ্রশাসন সংস্কারের বিস্তারিত রূপরেখা দিয়েছে। তাতে পুরনো কাঠামো ভেঙে জবাবদিহিমূলক প্রশাসন গড়ে তোলার সুপারিশ করা হয়। নিয়োগ, পদোন্নতি ও পদায়নে একটি স্বচ্ছ নীতির অনুসরণের নিয়ম প্রস্তাব করেছে কমিশন। বাংলাদেশের পুরনো মাথাভারী দুর্নীতিগ্রস্ত প্রশাসনকে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা দলীয় বাহিনীতে পরিণত করে পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটান। ‘সার্ভিস রুল ও রুলস অব বিজনেস’-এর বদলে রাজনৈতিক আনুগত্যকে নিয়োগ পদোন্নতি পদায়নের মানদণ্ড করা হয়।
শেখ হাসিনা, শেখ পরিবার এবং আওয়ামী লীগের সাথে কার কতটা সম্পর্ক তাই বিবেচ্য ছিল। প্রশাসনে রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তির সর্বোচ্চ নজির তৈরি করা হয় তখন। ফলে মেধাবী দক্ষ কর্মকর্তারা শুধু চাকরিচ্যুত, ওএসডি এবং বঞ্চনার শিকার হননি, প্রশাসন মুখ থুবড়ে পড়েছিল। এ সুযোগে প্রশাসনে দুর্নীতিবাজদের একটি শক্ত চক্র গড়ে উঠেছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সরকারি কর্মকর্তাদের সম্পদের তালিকা চেয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের পক্ষ থেকে চিঠি দেয়া হয়। দুর্নীতি বন্ধে আরো কিছু পদক্ষেপ সরকার নিয়েছিল। আমলাদের বিষয়ে নেয়া পদক্ষেপগুলো তখন ঠেকিয়ে দেয়া হয়। ফলে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রশাসন সেই চক্রের হাত থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি।
নির্বাচিত নতুন সরকারের সময়ও ঘুরেফিরে আওয়ামী আমলের কর্মকর্তারা প্রভাবশালী। শুধু তাদের রাজনৈতিক আনুগত্যের পরিবর্তন ঘটেছে। এ অবস্থায় দেশের স্বার্থ বিঘ্নিত হওয়া স্বাভাবিক। সরকারের অনেক ভালো পরিকল্পনা প্রশাসনের দুর্নীতি অনিয়ম লালফিতার দৌরাত্ম্যে ব্যর্থ হতে পারে। প্রশাসনে প্রাণ সঞ্চার করতে চেয়েও নতুন সরকার সেভাবে কাক্সিক্ষত সাড়া পাচ্ছে না।
রাজধানীতে শুরু হয়েছে চার দিনব্যাপী জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলন। এ উপলক্ষে ডিসি ও বিভাগীয় কমিশনাররা এক হাজার ৭২৯টি প্রস্তাব পেশ করেছেন। এর মধ্যে আছে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত স্বাধীনভাবে জেলা ও বিভাগীয় প্রশাসন চালানোর প্রস্তাব। একজন সৎ দক্ষ আমলার এই স্বাধীনতার প্রয়োজন আছে। এতে সরকারি কাজে গতি আসবে। সংশয় রয়েছে দীর্ঘ আওয়ামী আমলে গড়ে ওঠা দুর্নীতিবাজ চক্র নিয়ে। সরকারকে আমলাদের স্বাধীনভাবে যেমন কাজ করতে দেয়া উচিত, তেমনিভাবে সতর্ক থাকতে হবে এর যেন অপব্যবহার কেউ করতে না পারেন।
বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রগতিতে একটি দক্ষ গতিশীল জনপ্রশাসন অত্যাবশ্যক। পুরনো ধ্যান ধারণায় অভ্যস্ত দুর্নীতিগ্রস্ত চক্র হঠানো না গেলে তা সম্ভব নয়। মুয়ীদ কমিশনের সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নে সরকার সেই পথে হাঁটতে পারে।



