ইলিশের আকাল

প্রয়োজন উন্নত গবেষণার

সরকার, মৎস্য বিভাগ এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সৎ প্রচেষ্টা পারে ইলিশের ঐতিহ্য ধরে রাখতে, জেলেদের মুখে হাসি ফোটাতে। না হয় জাতীয় মাছ ইলিশ কেবল উচ্চবিত্তের বিলাসিতায় সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে।

জাটকা সংরক্ষণের লক্ষ্যে নদীতে জাল ফেলায় নিষেধাজ্ঞা ছিল গত দুই মাস। পয়লা মে থেকে নিষেধাজ্ঞা উঠে গেছে। চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনা নদীতে শুরু হয়েছে ইলিশ শিকারের উৎসব। কিন্তু জালে কাক্সিক্ষত ইলিশ উঠছে না। ফলে নিষেধাজ্ঞার সময় ধারদেনা করে টিকে থাকা হাজারো জেলে পরিবার এখন দিশেহারা। মৎস্য বিভাগ তাদের ধৈর্য ধরার পরামর্শ দিয়েছে। কিন্তু ইলিশের রাজধানী চাঁদপুরে কেন ইলিশের আকাল দেখা দিয়েছে, সেটি এখন পর্যালোচনার দাবি রাখে।

মৎস্য কর্মকর্তাদের দাবি, এ বছর জাটকা রক্ষা অভিযানে তারা সফল। এই অভিযানের সুফল পেতে কিছুটা সময় লাগবে। কিন্তু জেলে ও ব্যবসায়ীদের অভিযোগ ভিন্ন। তারা বলছেন, নিষেধাজ্ঞা চলার সময় নদী ও সড়কপথে নজরদারির ঘাটতি ছিল। এর সুযোগ নিয়ে অসাধু চক্র নির্বিচারে জাটকা ধরেছে। জ্বালানি তেল সঙ্কটের অজুহাতে অভিযানে শৈথিল্য ছিল।

নজরদারির ঘাটতি জাটকা নিধনের কারণ। এছাড়া ইলিশ সঙ্কটের জন্য মোটা দাগে দায়ী জলবায়ু পরিবর্তন। অস্বাভাবিক আবহাওয়া ও সাগরের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় ইলিশের প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কারখানার বর্জ্য ও প্লাস্টিক দূষণে নদীর পানি নষ্ট হচ্ছে। ডুবোচর ও পলি জমে নদীর গভীরতা কমে গেছে। নদীর নাব্য সঙ্কটে ইলিশের গতিপথ পরিবর্তন হয়ে থাকতে পারে। ফলে গভীর জলের মাছ ইলিশ ধরা পড়ছে না।

ইলিশের বর্তমান অবস্থান ও সঠিক পরিমাণ নির্ধারণে উন্নত গবেষণার অভাব রয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে এবং স্যাটেলাইট ট্র্যাকিং করে ইলিশ বর্তমানে কোথায় অবস্থান করছে এবং কোন কোন নতুন অঞ্চলে প্রজননক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে, সেটি সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা প্রয়োজন।

পদ্মা, মেঘনা এবং উপকূলীয় অঞ্চলের ইলিশের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য এক নয়। ডিএনএ বারকোডিং ও জেনেটিক গবেষণার মাধ্যমে বিভিন্ন পপুলেশনের ইলিশের বৃদ্ধি এবং রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বিশ্লেষণ করা সম্ভব। গবেষণার মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন- ঠিক কতটুকু গভীরতা এবং লবণাক্ততার মাত্রা ইলিশের ডিম ছাড়ার জন্য আদর্শ। শিল্পবর্জ্য এবং প্লাস্টিক দূষণ ইলিশের খাদ্যশৃঙ্খলে কেমন প্রভাব ফেলছে, তা নিয়েও দরকার নিবিড় গবেষণা। প্রথাগত পদ্ধতির বাইরে গিয়ে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর গবেষণা পারে ইলিশের ভবিষ্যৎ ঠিক করতে। সঠিক তথ্য হাতে থাকলে ইলিশ ধরার নিষিদ্ধ সময় এবং এলাকাগুলো আরো বিজ্ঞানসম্মতভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হবে।

আমরা মনে করি, কেবল কঠোর আইন বা সাময়িক নিষেধাজ্ঞা দিয়েই ইলিশ রক্ষা সম্ভব নয়। সময়ের সাথে সাথে নতুন কৌশল নিতে হবে। নিষেধাজ্ঞার সময়ে যে জেলেরা জাটকা ধরতে যান, তাদের চিহ্নিত করতে হবে। সেই সাথে নিষেধাজ্ঞার সময় জেলেদের জন্য বরাদ্দ করা সহায়তা বা ভিজিএফ চাল স্বচ্ছতার সাথে পৌঁছাতে হবে। যাতে অভাবের তাড়নায় তারা নদীতে নামতে বাধ্য না হন। ওই সময় তাদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।

সরকার, মৎস্য বিভাগ এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সৎ প্রচেষ্টা পারে ইলিশের ঐতিহ্য ধরে রাখতে, জেলেদের মুখে হাসি ফোটাতে। না হয় জাতীয় মাছ ইলিশ কেবল উচ্চবিত্তের বিলাসিতায় সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে।