নতুন করে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ সম্পর্কিত দু’টি আইনের খসড়া প্রস্তুতও করা হয়েছে। আইন মন্ত্রণালয় ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন-২০২৬’ ও ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন-২০২৬’-এর খসড়া নিয়ে অংশীজনের মতামত নিয়েছে।
এর আগে সরকার জাতীয় সংসদে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা এ সম্পর্কিত অধ্যাদেশ বাতিল করে। এ ক্ষেত্রে সংসদ-সদস্যদের বিরোধিতা আমলে নেয়া হয়নি। বলা হয়েছে, অধ্যাদেশ বাতিল করে ২০০৯ সালের আইন সাময়িকভাবে বহাল করা হচ্ছে। এ বক্তব্যের যৌক্তিকতা নিয়ে সংশয়ের কারণ আছে। সরকার আন্তরিক হলে অধ্যাদেশ বহাল রেখে নতুন আইন প্রণয়ন করতে পারত। অধ্যাদেশের কোনো অসঙ্গতি বা ঘাটতি থাকলে তা সংশোধন করে নতুন আইন প্রণয়ন করা যেত। অধ্যাদেশ বাতিলের পর খোদ কমিশনের সদস্যরা একযোগে পদত্যাগ করেন এবং এক খোলা চিঠিতে উল্লেখ করেন, মানবাধিকার রক্ষায়-২০২৫ সালের অধ্যাদেশ অত্যন্ত শক্তিশালী ছিল।
খসড়া আইনে অধ্যাদেশের কিছু অসঙ্গতি ও সীমাবদ্ধতা দূর করা এবং আইন কঠোর করার কথা বলা হচ্ছে।
২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত সরকারের সময় রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশের মাধ্যমে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০০৯ সালে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন-২০০৯’ প্রণীত হয়। মূলত নাগরিক সমাজের ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়গত মানবাধিকার রক্ষাই কমিশনের দায়িত্ব। প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে জোরালো আইনের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। কিন্তু আইন যত শক্তিশালী বা কঠোর হোক না কেন, তাতে কিছু এসে যায় না। যদি না যথাযথ প্রয়োগ হয়। আওয়ামী দুঃশাসনে বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম, নারী ও শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্যাতন, বল প্রয়োগে উচ্ছেদের মতো অগণিত ঘটনা ঘটেছে যেখানে ভুক্তভোগী ন্যায়বিচার পায়নি। ১৫ বছরের আওয়ামী ফ্যাসিবাদী শাসনে কার্যত মানবাধিকারের শিকড় পুরোপুরি উপড়ে ফেলা হয়েছিল। কমিশনকে অকার্যকর করা হলেও এটিকে বিরোধী মত দমনে ব্যবহারের উদাহরণও অসংখ্য। বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীসহ অসংখ্য মানুষের ঠাণ্ডা মাথায় গুমের ঘটনা, আয়নাঘরের মতো পীড়নযন্ত্রের অবিশ্বাস্য বাস্তবতা এ ক্ষেত্রে স্মরণীয়। ক্ষতিগ্রস্তদের সুরক্ষা দেয়নি বা দিতে পারেনি তথাকথিত জাতীয় মানবাধিকার কমিশন।
এখন দরকার আইন প্রয়োগের পরিবেশ পরিবেশ তৈরি করা। মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যত ক্ষমতাধর বা প্রভাবশালী হোক না কেন, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার মতো সক্ষমতা কমিশনকে দিতে হবে। এ জন্য শুধু আইন নয়, কাজের স্বাধীনতাও অপরিহার্য।
মানবাধিকার, সুরক্ষার অধিকার ও মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হলে তার দেখাশোনার দায়িত্ব জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের। অথচ এখনো মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটছে। মানবাধিকার কমিশনের ভূমিকা কোথাও তেমন একটি দেখা যায় না। কমিশনের সক্ষমতা, দক্ষতা ও কার্যক্রম নিয়ে শুরু থেকে প্রশ্ন আছে। এমন কমিশন দরকার যেটি সত্যিকার অর্থে মানবাধিকার রক্ষায় কাজ করবে।
শুধু আইন করে এ দায়িত্ব সুসম্পন্ন হবে না। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় গণতন্ত্র ও সুশাসন নিশ্চিত করা সবার আগে জরুরি। ঠিক এখানে বর্তমান সরকারের সদিচ্ছার বিষয়টি সংশয়াচ্ছন্ন। জুলাই সনদ নিয়ে গণরায় উপেক্ষার অভাবিত দৃষ্টান্ত এ সংশয়ের কারণ।



