উত্তর-পূর্ব ইউক্রেনের এক কুয়াশাচ্ছন্ন মাঠ। কনকনে শীতের রাতে একটা ভ্যানের ভেতর চারজন সৈন্য নির্ঘুম চোখে তাকিয়ে আছেন মনিটরের দিকে। স্ক্রিনে লাল আর হলুদ রঙের ছোট ছোট কিছু বিন্দু নড়াচড়া করছে। তাদের হাতে ধরা ড্রোন নিয়ন্ত্রণের রিমোট আর পাশে রাখা এনার্জি ড্রিংকসের ক্যান- রাতভর জেগে থাকার সম্বল। এই যোদ্ধারা এবং তাদের মতো আরো হাজারো দল এখন ইউক্রেনের আকাশ রক্ষার অতন্দ্র প্রহরী। তাদের লক্ষ্য একটাই, রাশিয়ার সবচেয়ে ভয়ঙ্কর অস্ত্র শাহেদ ড্রোনকে আকাশেই গুঁড়িয়ে দেয়া। এই লড়াইটা শুধু যুদ্ধের নয়, টিকে থাকার।
ইউক্রেনের এই ড্রোন ইউনিটের কমান্ডার বরিস যুদ্ধের আগে ছিলেন একটি টেলিভিশন চ্যানেলের নিউজ প্রোডিউসার। জীবন উল্টাপাল্টা করে দেয়া এই যুদ্ধ তাকে আজ রণক্ষেত্রে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। বরিস খুব সহজ করে বুঝিয়ে বললেন তাদের কাজের গুরুত্ব।
তার মতে, একটা শাহেদ ড্রোনকে মারতে যদি ৫০টা ইন্টারসেপ্টর বা প্রতিরোধকারী ড্রোনও খরচ করতে হয়, তবুও সেটা লাভ। কারণ একটা শাহেদ ড্রোন উড়ে এসে যখন কোনো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার ওপর পড়ে, তখন তার ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ হয় আকাশচুম্বী।
ইরানের নকশায় তৈরি এই শাহেদ ড্রোনগুলো এখন ইউক্রেনের মানুষের কাছে এক মূর্তিমান আতঙ্ক। প্রতি মাসে রাশিয়া হাজার হাজার ড্রোন ছুড়ছে। শুধু গত মাসেই প্রায় সাড়ে ছয় হাজার ড্রোন ছোড়া হয়েছে, যার মধ্যে এক হাজারের বেশি ড্রোন ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ফাঁকি দিয়ে আঘাত হেনেছে। আর এর ফলে লাখ লাখ মানুষকে বিদ্যুৎ ও তাপহীন অন্ধকারে কাটাতে হচ্ছে।
ইউক্রেনের বর্তমান প্রতিরক্ষা মন্ত্রী মিখাইলো ফেদোরভ গত ফেব্রুয়ারিতে ঘোষণা দিয়েছিলেন যে তারা ৯৫ শতাংশ শাহেদ ড্রোন আকাশেই ধ্বংস করার লক্ষ্য নিয়েছেন। কাজটা মোটেও সহজ নয়। তথ্য বলছে, গত কয়েক মাসে তারা ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ ড্রোন আটকাতে সফল হয়েছেন।
পাশাপাশি রাশিয়াও বসে নেই। তারাও শাহেদ ড্রোনগুলোর প্রযুক্তিতে বারবার পরিবর্তন আনছে। আগে এই ড্রোনগুলো ঘণ্টায় ১৭০ কিলোমিটার বেগে চলত, এখন সেগুলো ২০০ কিলোমিটারের বেশি গতিতে ওড়ে। এমনকি ২০ শতাংশ ড্রোনে এখন জেট ইঞ্জিন লাগানো হয়েছে, যার গতি ঘণ্টায় ৪০০ কিলোমিটার পর্যন্ত। ফলে ইউক্রেনকেও পাল্লা দিয়ে তাদের ইন্টারসেপ্টর ড্রোনের গতি বাড়াতে হচ্ছে।
রাশিয়ার এই শাহেদ ড্রোনগুলো দেখতে অনেকটা ছোট বিমানের মতো, যার মাথাটা সুচালো আর ডানাগুলো ত্রিভুজাকার। ওড়ার সময় এগুলো মোটরবাইকের মতো বিকট শব্দ করে বলে স্থানীয়রা এর নাম দিয়েছে ‘মোপেড’। একেকটা শাহেদ ড্রোন বানাতে রাশিয়ার খরচ হয় প্রায় ৩৫ হাজার ডলার। এর বিপরীতে ইউক্রেন যে ইন্টারসেপ্টর ড্রোনগুলো ব্যবহার করছে, সেগুলো প্লাস্টিকের তৈরি এবং থ্রি-ডি প্রিন্টারে ছাপা। এগুলোর দাম বড়জোর দেড় হাজার ডলার। অর্থাৎ কম খরচের ড্রোন দিয়ে রাশিয়ার দামী ড্রোন ঠেকানোর এক অভিনব রণ-কৌশলে নেমেছে ইউক্রেন।
তবে কুয়াশা বা খারাপ আবহাওয়া হলে এই কৌশল কঠিন হয়ে পড়ে। তখন ড্রোনের ক্যামেরায় কিছুই দেখা যায় না। বরিস জানালেন, এমন রাতও গেছে যখন ১০টা ড্রোন ছুড়েও তারা একটা শাহেদকেও ধরতে পারেননি।
ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা এখন কয়েক স্তরে সাজানো। ভারী মেশিনগান বসানো পিকআপভ্যান থেকে শুরু করে ইলেকট্রনিক যুদ্ধ সরঞ্জাম এবং এফ-সিক্সটিন ফাইটার জেট- সবই ব্যবহার করা হচ্ছে এই ড্রোন ঠেকাতে।
বিমান বাহিনীর কমান্ডার ইউরি চেরেভাশেঙ্কো বলছেন, রাশিয়া এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে ড্রোনের ওড়ার পথ ঠিক করছে, যা মাঝেমধ্যে তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
তবে ইউক্রেনের বড় শক্তি হলো তাদের উদ্ভাবনী ক্ষমতা। এখন অনেক দক্ষ পাইলট ঘরে বসে ইন্টারনেটের মাধ্যমে দূর থেকেও ইন্টারসেপ্টর ড্রোন পরিচালনা করছেন। যুদ্ধের এই কঠিন সময়ে এটাই ইউক্রেনের সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার নতুন আশার আলো।
সুত্র : রয়টার্স



