আল জাজিরা ও লিবার্টি ইনভেস্টিগেটসের এক চাঞ্চল্যকর অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে যে, ব্রিটেনের অন্তত ১২টি নামী বিশ্ববিদ্যালয় তাদের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের ওপর নজরদারি করতে সামরিক বাহিনীর সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের পরিচালিত একটি বেসরকারি সংস্থাকে মোটা অঙ্কের অর্থ দিয়েছে।
হোরাস সিকিউরিটি কনসালটেন্সি লিমিটেড নামের এই প্রতিষ্ঠানটি মূলত ফিলিস্তিনপন্থী সক্রিয়বাদী বা অ্যাক্টিভিস্ট এবং গাজা সংহতি আন্দোলনের সাথে জড়িতদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও গতিবিধির ওপর গোপন নজরদারি চালিয়েছে।
ব্রিটিশ সাবেক লেফটেন্যান্ট কর্নেল জোনাথন হোয়াইটলি ও কর্নেল টিম কলিন্সের মতো তুখোড় গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মাধ্যমে পরিচালিত এই সংস্থাটি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে তথাকথিত ‘থ্রেট অ্যাসেসমেন্ট’ বা হুমকি পর্যালোচনা রিপোর্ট সরবরাহ করত। তদন্তে দেখা গেছে, গাজা পরিস্থিতি নিয়ে সোচ্চার থাকা পিএইচডি শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত অতিথি বক্তাদেরও এই গোপন তদন্তের আওতায় আনা হয়েছিল। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর ব্রিটেনের অ্যাকাডেমিক অঙ্গনে মুক্তচিন্তার টুটি চেপে ধরার অভিযোগ উঠেছে।
অনুসন্ধান উঠে এসেছে, ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত হোরাস সিকিউরিটি এই কাজের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কাছ থেকে প্রায় ৪ লাখ ৪৩ হাজার পাউন্ডের বেশি অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে। এই নজরদারির তালিকায় অক্সফোর্ড, ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডন, এলএসই এবং ইউসিএল-এর মতো প্রথম সারির বিদ্যাপীঠগুলো রয়েছে।
হোরাস তাদের নিজস্ব ‘ইনসাইট’ টুলের মাধ্যমে ইন্টারনেট থেকে বিপুল তথ্য সংগ্রহ করে এবং ২০২২ সাল থেকে এই কাজে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার শুরু করে। ব্রিস্টল বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো এমনকি কোন কোন প্রতিবাদী গোষ্ঠীর ওপর নজর রাখতে হবে, তার একটি তালিকাও এই সংস্থাকে ধরিয়ে দিয়েছিল। বিশেষ করে যারা ইসরাইল-গাজা যুদ্ধ নিয়ে সরব ছিল, তাদের ওপর নজরদারি ছিল সবথেকে বেশি। যদিও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দাবি করছে যে তারা কেবল নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত তথ্য বিশ্লেষণ করতে এই সেবা নিয়েছে। এদিকে ব্যক্তিগত তথ্যের এমন ব্যবহার নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এই নজরদারির শিকার হওয়াদের মধ্যে রয়েছেন লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের (এলএসই) পিএইচডি শিক্ষার্থী লিজি হবস। গাজা সংহতি শিবিরে অংশ নেয়ায় তার সাধারণ একটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পোস্ট হোরাস সংগ্রহ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা দলকে পাঠিয়েছিল। লিজি পরে জানতে পারেন, তার মতো হাজার হাজার শিক্ষার্থীর পোস্ট সংগ্রহ করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে মাসে ৯০০ পাউন্ডের বিনিময়ে 'এনক্যাম্পমেন্ট আপডেট' বা শিবিরের খবরাখবর বিক্রি করা হতো। একইভাবে ম্যানচেস্টার মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি (এমএমইউ) ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত মার্কিন অধ্যাপক রাবাব ইব্রাহিম আব্দুলহাদির ওপর গোপন গোয়েন্দা তদন্ত চালায়। ফিলিস্তিন বিষয়ে একটি স্মারক বক্তৃতায় অংশ নিতে আসার আগে তার অতীত রেকর্ড ও ফিলিস্তিনপন্থী অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে ছয় পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছিল। অথচ ইসরাইল সমর্থক গোষ্ঠীগুলোর তোলা যেসব অভিযোগ সেখানে আনা হয়েছিল, তা অনেক আগেই আদালতে ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয়েছিল।
হোরাস সিকিউরিটির অন্যতম পরিচালক কর্নেল টিম কলিন্সের রাজনৈতিক অবস্থানও এখন প্রশ্নের মুখে। তিনি প্রকাশ্যে দাবি করেছেন যে, পশ্চিমা দেশগুলোতে গাজা সংহতি আন্দোলন মূলত রাশিয়া ও ইরানের মদতপুষ্ট একটি প্রচারণার ফল। এমনকি তিনি আন্দোলনে অংশ নেওয়া অ-ব্রিটিশ নাগরিকদের দেশ থেকে বের করে দেয়ারও পরামর্শ দিয়েছিলেন।
এদিকে, জাতিসংঘের বিশেষ দূত জিনা রোমেরো এই ঘটনাকে ‘গভীর উদ্বেগজনক’ বলে অভিহিত করেছেন। তার মতে, শিক্ষার্থীদের তথ্য সংগ্রহের জন্য এআই-এর ব্যবহার তাদের মাঝে এক ধরনের ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করছে।
ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষক-কর্মচারীদের সংগঠন ইউসিইউ এই ঘটনাকে ‘লজ্জাজনক’ বলে বর্ণনা করেছে। তাদের মতে, শিক্ষার মুক্ত পরিবেশে যখন শিক্ষার্থীদের ওপর গোয়েন্দাগিরি করা হয়, তখন তা কেবল নজরদারি নয়, বরং ভিন্নমতের কণ্ঠ রোধ করার একটি প্রাতিষ্ঠানিক হাতিয়ারে পরিণত হয়। আল জাজিরা ও লিবার্টি ইনভেস্টিগেটসের এই প্রতিবেদনটি সামনে আসার পর ব্রিটিশ উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার ভেতরে লুকিয়ে থাকা এই করপোরেট গোয়েন্দাগিরির কুৎসিত রূপটি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
সূত্র : আল জাজিরা



