গ্রেট নিকোবর ঘিরে বিতর্কে ভারত : চীনকে ঠেকানো না কি অন্যকিছু?

প্রকল্পটি ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা, কৌশলগত ও প্রতিরক্ষা উপস্থিতি বৃদ্ধি, দ্বীপপুঞ্জের অর্থনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী এবং ওই অঞ্চলে সামগ্রিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার জন্য নকশা করা হয়েছে।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
গ্রেট নিকোবর দ্বীপকে ঘিরে উন্নয়ন প্রকল্পের অংশ হিসেবে বনভূমির মধ্য দিয়ে একটি রাস্তা নির্মাণের কাজ করছে শ্রমিকরা
গ্রেট নিকোবর দ্বীপকে ঘিরে উন্নয়ন প্রকল্পের অংশ হিসেবে বনভূমির মধ্য দিয়ে একটি রাস্তা নির্মাণের কাজ করছে শ্রমিকরা |এএফপি

গ্রেট নিকোবর দ্বীপকে ঘিরে ১১ বিলিয়ন ডলারের একটি বিশাল উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করেছে ভারত। দ্বীপটিকে ভারত মহাসাগরে অন্যতম প্রধান কৌশলগত ও অর্থনৈতিক তল্লাশি চৌকি কিংবা ঘাঁটিতে পরিণত করতে এই প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এই প্রকল্প কেন্দ্র করে দেশটিতে এখন তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।

মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার উপকূলের নিকটবর্তী ভারত মহাসাগরে মালাক্কা প্রণালীর প্রবেশমুখের কাছাকাছি এই দ্বীপের অবস্থান। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ দ্বীপটির কাছ দিয়েই চলে গেছে। এই পথ দিয়ে বিশ্ব বাণিজ্যের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এবং চীনের প্রায় ৮০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল পরিবাহিত হয়। ফলে চীনকে নজরে রাখার এই কৌশলগত পরিকল্পনাকে সামনে রেখে এই অঞ্চলে বন্দর, সামরিক ও বেসামরিক বিমানবন্দর এবং বিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারত।

গত মে মাসে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ভারত সরকার বলেছে, গ্রেট নিকোবর প্রকল্প ‘একটি কৌশলগত প্রকল্প; যা আন্দামান সাগর এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ভারতের উপস্থিতি জোরদার করার লক্ষ্যে গ্রহণ করা হয়েছে।’

এতে আরো বলা হয়েছে, ‘প্রকল্পটি ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা, কৌশলগত ও প্রতিরক্ষা উপস্থিতি বৃদ্ধি, দ্বীপপুঞ্জের অর্থনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী এবং ওই অঞ্চলে সামগ্রিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার জন্য নকশা করা হয়েছে।’

দেশটির বিশেষজ্ঞদের একাংশ বলছেন, ইরান যেভাবে হরমুজ প্রণালীকে প্রভাবিত করে, মালাক্কা প্রণালীতে ভারতের তেমন নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা মোটেও বাস্তবসম্মত নয়, কারণ এই পানিপথটির মূল নিয়ন্ত্রণ ইন্দোনেশিয়ার হাতে।

ভারতের সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী দ্বীপে একটি ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দর, বিমানবন্দর, বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও নতুন নগর গড়ে তোলা হবে। কিন্তু এই উন্নয়নের চরম আঘাত এসে পড়ছে স্থানীয় শম্পেন ও নিকোবরি আদিবাসীদের ওপর। প্রকল্পের জন্য প্রায় এক মিলিয়ন গাছ কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, যা দ্বীপটির ভঙ্গুর ও সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের জন্য বড় হুমকি। বর্তমানে মাত্র ১০ হাজার মানুষের এই দ্বীপে আগামী তিন দশকে প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষের পুনর্বাসনের পরিকল্পনা রয়েছে, যা স্থানীয় জনসংখ্যার তুলনায় প্রায় চার হাজার শতাংশ বৃদ্ধি। এতে পুরো সামাজিক ও পরিবেশগত ভারসাম্য ভেঙে পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

গণহত্যাবিষয়ক ৩৯ জন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুকে চিঠি দিয়ে পরিষ্কার সতর্ক করেছেন যে, এই প্রকল্প শম্পেন জনগোষ্ঠীর জন্য কার্যত একটি মৃত্যুপরোয়ানা এবং এটি আন্তর্জাতিক অপরাধের পর্যায়ে পড়ে।

স্থানীয় আদিবাসীরা তাদের জমি ছাড়তে অস্বীকৃতি জানিয়ে ভারতের আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে। তারা বলছেন, এই প্রকল্প তাদের অস্তিত্বকেই চিরতরে মুছে দেবে। ভারতের বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী দ্বীপটি পরিদর্শন করে এই প্রকল্পকে দেশের প্রাকৃতিক ও আদিবাসী ঐতিহ্যের বিরুদ্ধে একটি বড় কেলেঙ্কারি ও গুরুতর অপরাধ বলে বর্ণনা করেছেন।

২০০৪ সালের সুনামিতে ইতোমধ্যে দ্বীপের বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং এটি তীব্র ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল হওয়ায় এখানে এত বড় অবকাঠামো নির্মাণ করা চরম ঝুঁকিপূর্ণ।

সমালোচকদের মতে, চীনকে ঠেকানোর নয়াদিল্লির এই অন্ধ কৌশল শেষ পর্যন্ত উপকারের চেয়ে বড় দায় হয়ে দাঁড়াবে।

ভারতীয় সমালোচকদের মতে, দেশটির জাতীয় নিরাপত্তার যুক্তিতে এগিয়ে আনা এই প্রকল্প শেষ পর্যন্ত একটি বড় বাণিজ্যিক ও কৌশলগত ঝুঁকির উদ্যোগে পরিণত হতে পারে, যার ভার এবং দায় বহন করবে দ্বীপটির স্থানীয় মানুষ ও ভঙ্গুর পরিবেশ।

সূত্র: আল জাজিরা