ইরান ও প্রতিরোধ অক্ষের সাথে যুদ্ধে নিজেদের লক্ষ্য পূরণে ভয়াবহ ব্যর্থতার পর এখন ইসরাইলি জনপদগুলোতে হতাশা আর মোহভঙ্গের জোয়ার বইছে। খোদ ইহুদিবাদী বিশেষজ্ঞরাই স্বীকার করছেন, ইসরাইল আজ সব দিক থেকেই ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে।
ইরানের বার্তাসংস্থা তাসনিম জানাচ্ছে, ইসরাইলি সংবাদপত্র মা’রিভর প্রখ্যাত সামরিক বিশ্লেষক আভি আশকেনাজি এক বক্তব্যে স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে সব ফ্রন্টেই ইসরাইলের দশা আগের চেয়ে অনেক বেশি শোচনীয়। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের চাপে লেবাননে যে সাময়িক যুদ্ধবিরতি এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো নেয়া হয়েছে, তাতে ইসরাইলের অবস্থা আরো নাজেহাল হয়ে পড়েছে।
আশকেনাজির বিশ্লেষণ বলছে, কয়েক মাস যুদ্ধ করার পর ইসরাইলের অবস্থা আগের চেয়ে ভালো হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু হয়েছে উল্টা। ২৭ ফেব্রুয়ারি যখন ইরান ও তার মিত্রদের ওপর বড় কোনো হামলার পরিকল্পনা বা তোড়জোড় চলছিল, ইসরাইল তখন যে অবস্থানে ছিল, এখনকার অবস্থা তার চেয়েও অনেক বেশি দুর্বল।
অর্থাৎ এত লড়াই আর ধ্বংস চালিয়েও তারা গাজা বা লেবানন- কোনো ফ্রন্টেই নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে পারেনি, বরং দিন দিন আরো বেশি চোরাবালিতে আটকে গেছে।
সহজভাবে বলতে গেলে, লাভের চেয়ে তাদের লোকসানই বেশি হয়েছে।
লেবাননের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে এই বিশেষজ্ঞ বলছেন, আগে ইসরাইলি বাহিনী লেবাননজুড়ে নিয়মিত নিরাপত্তা অভিযান চালাতে পারত। কিন্তু গত কয়েক দিনে সেই ছবিটা পুরো পাল্টে গেছে। এখন হিজবুল্লাহ নিয়মিতভাবে ইসরাইলি বাহিনীর ওপর মিসাইল, মর্টার ও ড্রোন দিয়ে পাল্টা হামলা চালাচ্ছে।
বাস্তব চিত্রটা হলো, ইসরাইলি সেনাবাহিনী এখন তাদের নিজেদের রাজনৈতিক শক্তির চাপিয়ে দেয়া সীমাবদ্ধতার কবলে পড়েছে। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে লেবাননে ইসরাইল কী ধরনের সামরিক নীতি নেবে তা এখন আর তেল আবিব ঠিক করে না, বরং এর নিয়ন্ত্রণ চলে গেছে ওয়াশিংটনের হোয়াইট হাউসের হাতে।
ইরান প্রসঙ্গে ইসরাইলি সেনা কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে সামরিক বিশ্লেষকরা বলছেন, পরিস্থিতি এখন সাংঘাতিক জটিল। ইরান তার বিভিন্ন ফ্রন্ট থেকে কার্যক্রম চালিয়েই যাচ্ছে; একদিকে লেবাননে হিজবুল্লাহ, গাজায় হামাস ও ইয়েমেনে হাউছিরা সমানে চাপ বজায় রেখেছে।
এর মাঝেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট যখন লেবানন ও ইসরাইলের মধ্যে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিলেন, তখন থেকেই ইসরাইলের রাজনৈতিক ও সংবাদ মাধ্যমে ভয়াবহ অসন্তোষের আগুন ছড়িয়ে পড়ে। খোলামেলা আলোচনা শুরু হয়েছে যে ইসরাইল তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে এবং তাদের রাজনৈতিক মহল এখন স্রেফ মার্কিন সরকারের আজ্ঞাবহ হিসেবে কাজ করছে।
এই ক্ষোভের সবচেয়ে বড় প্রকাশ দেখা গেছে অধিকৃত ফিলিস্তিনের উত্তরাঞ্চলীয় বসতিগুলোর নেতাদের মধ্যে। তাদের কেউ কেউ এই যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে সরাসরি ‘আত্মসমর্পণ আর বিশ্বাসঘাতকতার দলিল’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
ইহুদিবাদী জনসমর্থনের দিকে তাকালে এই সঙ্কটের গভীরতা আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গত ৯ এপ্রিল প্রকাশিত এক জনমত জরিপে দেখা গেছে, ৭৭ শতাংশ ইসরাইলি লেবাননে যুদ্ধবিরতির ঘোর বিরোধী ছিল। এমনকি বর্তমান সরকারি জোটের ৯৪ শতাংশ ভোটার মনে করে, লক্ষ্য পূরণ না হওয়া পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়া উচিত ছিল।
হিব্রু ইউনিভার্সিটির অন্য এক জরিপ বলছে, দীর্ঘ যুদ্ধের ফলে ইসরাইলিদের মধ্যে এখন ক্লান্তিবোধ চলে এসেছে। বেশিভাগ ইসরাইলিই মনে করে না যে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরাইলের বোমা হামলায় ইরান বা হিজবুল্লাহর শক্তি খুব একটা কমেছে। বর্তমান অবস্থা নিয়ে সাধারণ ইসরাইলিদের মনে এখন আশার চেয়ে হতাশা, বিভ্রান্তি আর রাগই বেশি কাজ করছে।
সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, ইসরাইলিরা যা চায় আর তাদের সেনাবাহিনীর বাস্তবে যা করার ক্ষমতা আছে- এই দুইয়ের মাঝে এক বিশাল ফারাক তৈরি হয়েছে।



