রাতের আঁধারে, যখন পাহাড়ের বুক চিরে আলো ফোটে ক্ষেপণাস্ত্র বিস্ফোরণে, তখন বোঝা যায়—একটি যুদ্ধ ঘোষণা না করেও শুরু হয়ে গেছে।
ব্রিটিশ দৈনিক টাইমসের মধ্যপ্রাচ্য প্রতিবেদক সামের আল-আতরুশ ‘হোয়াই ইজ ইসরাইল অ্যাটাকিং ইরান? অপারেশন রাইজিং লায়ন এক্সপ্লেইডন’ শীর্ষক নিবন্ধে আজ আরও বলেন, ইরানের পাহাড়ঘেরা গোপন শহরগুলোর নিচে লুকিয়ে থাকা দুইটি পরমাণু কেন্দ্র—নাতাঞ্জ ও ফোরদু—দীর্ঘদিন ধরেই ছিল ইসরাইলের কাঁটা হয়ে। বহু বছর ধরেই পশ্চিমা গোয়েন্দারা মনে করতেন, এত গভীরে তৈরি করা এসব স্থাপনা ধ্বংস করা প্রায় অসম্ভব। কিন্তু ইসরাইল থেমে থাকেনি।
‘অপারেশন রাইজিং লায়ন’—এই নামেই ইতিহাসে চিহ্নিত হয়ে থাকবে এক অঘোষিত আঘাত, যেখানে ইসরায়েলি ক্ষেপণাস্ত্র আছড়ে পড়ে ইরানের পরমাণু গবেষণাকেন্দ্রের ওপর।
নাতাঞ্জে যখন আগুন জ্বলছিল, তখন শুধু স্থাপনা নয়, মারা যাচ্ছিলেন ইরানের শীর্ষ পরমাণু বিজ্ঞানীরা। নিহত হন দুজন শীর্ষ সামরিক কমান্ডারও। শহীদ হয়েছেন আয়াতুল্লাহ খামেনের ঘনিষ্ঠ পরমাণু উপদেষ্টা শামখানীও।
ইসরাইলের ভাষায়, এই হামলা ছিল আত্মরক্ষার অংশ। কারণ, ইরান ইতোমধ্যেই ৪০০ কেজিরও বেশি ইউরেনিয়াম ৬০ শতাংশ মাত্রায় সমৃদ্ধ করেছে। আর জানেন নিশ্চয়ই ৯০ শতাংশ হলেই সেটা হয়ে যায় বোমার জ্বালানি।
জাতিসঙ্ঘের হিসাব বলছে, এই ইউরেনিয়ামই যথেষ্ট নয়টি পারমাণবিক বোমা বানানোর জন্য। আর ঠিক এই মুহূর্তে, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা আইএইএ ইরানকে পরমাণু ভাণ্ডার নিয়ে তথ্য গোপন করছে বলে প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে দোষী সাব্যস্ত করল তেহরানকে।
আর কয়েকদিন পরই বসার কথা ছিল যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের নতুন করে আলোচনায়, কিন্তু না তার আগেই বিস্ফোরণ।
পশ্চিমা গোয়েন্দারা, এমনকি মার্কিন সংস্থারাও বলছে, ইরান এখনো বোমা বানাচ্ছে না। কিন্তু তারা চাইলে বানাতে পারবে, প্রযুক্তি আছে, বিজ্ঞানী আছে, ইউরেনিয়ামও আছে।
ইরান সবসময় দাবি করে, তাদের কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ। বিদ্যুৎ উৎপাদন, চিকিৎসা, গবেষণা, এমন সব তৎপরতার জন্য। তবে ইরান এটাও বলে, যদি কেউ হামলা করে, তবে প্রতিক্রিয়া আসবে ‘প্রতিশোধের ভাষায়’।
বিশ্লেষক কেলসি ড্যাভেনপোর্ট বলেন, এই হামলা ইরানকে হয়তো পরমাণু বিস্তার রোধ চুক্তি, এনপিটি থেকে সরিয়ে দিতে পারে এবং তেহরান বোমা বানানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্তও নিতে পারে।
ইসরাইল যা ধ্বংস করেছে, তা হলো কিছু ভবন। কিন্তু তারা ধ্বংস করতে পারেনি ইরানের অর্জিত জ্ঞান। তা ছাড়া এমটাও সম্ভব—ইরান গোপনে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম অন্য কোথাও সরিয়ে ফেলছে। অর্থাৎ, যুদ্ধ যতই চলুক, ইরানের পারমাণবিক ছায়া অম্লান।
এই হামলার বিষয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প পরিষ্কারভাবে বলেছেন, আমেরিকা অংশ নেয়নি। তবে ঘটনা ঘটার আগে তারা জানত। ট্রাম্পের আশা ছিল, তেহরান আলোচনায় বসবে। কিন্তু কে বসে গোলাগুলির শব্দে?
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সরাসরি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, ইরান যেন মার্কিন বাহিনীর ওপর প্রতিশোধ না নেয়। আমরা জড়িত নই, কিন্তু প্রতিক্রিয়া হলে সেটা মেনে নেয়া হবে না।
গত বছর দুইবার ইরান ক্ষেপণাস্ত্র, ক্রুজ মিসাইল, এমনকি ড্রোন দিয়ে ইসরাইলকে আঘাত করেছে। তখনো যুদ্ধ হয়নি, কারণ ইসরাইলের আকাশ প্রতিরক্ষা ছিল বর্মের মতো শক্ত।
কিন্তু যুদ্ধের ময়দানে ভুল মানেই সর্বনাশ। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এবার যদি একটা ক্ষেপণাস্ত্র ঢুকে পড়ে, তাহলে এই দাবানল ছড়িয়ে যেতে পারে গোটা মধ্যপ্রাচ্যে।
আর ট্রাম্প? তিনিও হয়তো বাধ্য হবেন সিদ্ধান্ত বদলাতে—তেহরানের পরমাণু কেন্দ্রে যুক্তরাষ্ট্রকেও হয়তো এবার আঘাত হানতেই হবে।
এই যুদ্ধ শুধু বোমার বিরুদ্ধে নয়, এটি একটি দৃষ্টি ও সিদ্ধান্তের লড়াই—কে শেষ পর্যন্ত স্থির থাকতে পারে, কে প্রথম আঘাত করে আর কে শেষ প্রতিক্রিয়া দেয়—এটাই নির্ধারণ করবে পরবর্তী মধ্যপ্রাচ্য।
বলতে পারেন, রাইজিং লায়ন শুধু একটি সামরিক অভিযান নয়। এটি ইতিহাসের পাতায় লেখা হতে চলেছে একটি অনিশ্চিত যুদ্ধের সূচনাগান।



