দুই মাসের বেশি সময় ধরে চলা এই যুদ্ধ কোনো চূড়ান্ত সামরিক বা কূটনৈতিক বিজয় আনতে না পারায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন ব্যাপক রাজনৈতিক ঝুঁকির মুখে পড়েছেন। ইরানের সাথে চলমান এই অচলাবস্থা অনির্দিষ্টকাল ধরে টেনে নেয়ার ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্ববাসীর জন্য যুদ্ধের শুরুর সময়ের চেয়েও বড় সঙ্কট তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
একদিকে ট্রাম্প ইরানের নতুন আলোচনার প্রস্তাব ফিরিয়ে দিচ্ছেন, অন্যদিকে ইরান হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ কাজে লাগিয়ে নিজের অবস্থান শক্ত করছে।
রয়টার্সের অভিজ্ঞ সাংবাদিক ম্যাট স্পেটানিক তার বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন যে, যুদ্ধের অনেক লক্ষ্যই অপূর্ণ রয়ে গেছে ট্রাম্পের, যার ফলে আগামী নির্বাচনে তাকে এবং তার দলকে বড় ধরনের মাশুল গুনতে হতে পারে।
মার্কিন প্রেসিডেন্টের জন্য এই অচলাবস্থার ফল বেশ ভয়াবহ হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। অমীমাংসিত এই লড়াইয়ের কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে ধস নেমেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে, যা জনমনে ক্ষোভ বাড়াচ্ছে।
জরিপে দেখা গেছে, ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গেছে, যা নভেম্বরের নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থীদের ভরাডুবির ইঙ্গিত দিচ্ছে। যদিও মার্কিন ও ইসরাইল বাহিনীর হামলায় ইরানের সামরিক সক্ষমতা কিছুটা কমেছে বলে দাবি করা হচ্ছে, কিন্তু শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন বা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করার মতো ট্রাম্পের মূল লক্ষ্যগুলো পূরণ হয়নি।
এদিকে তেহরান বেশ কৌশলী অবস্থান নিয়েছে। তারা পাকিস্তানের মাধ্যমে যুদ্ধের ইতি টানার এবং হরমুজ প্রণালী খুলে দেয়ার নতুন প্রস্তাব পাঠালেও ট্রাম্প তাতে সন্তুষ্ট হতে পারেননি।
জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষজ্ঞ লরা ব্লুমেনফেল্ড সতর্ক করে বলেছেন, গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথটি ইরানের নিয়ন্ত্রণমুক্ত করতে না পারলে ট্রাম্পের ভাবমূর্তি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং বিশ্বকে এক অনিরাপদ পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেয়ার জন্য তিনি দায়ী থাকবেন।
যদিও হোয়াইট হাউস দাবি করছে যে, তারা সুবিধাজনক অবস্থানে আছে। কিন্তু ইরানকে চাপে ফেলতে দীর্ঘস্থায়ী নৌ-অবরোধের পরিকল্পনাও করছে তারা।
বর্তমানে এই সঙ্কট এক ‘স্থবির যুদ্ধে’ রূপ নেয়ার দিকে যাচ্ছে। বিশ্লেষক জন অল্টারম্যানের মতে, ইরান এখন বুঝে গেছে যে যুদ্ধের মধ্যেও তারা হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে বিশ্ব অর্থনীতিতে ধাক্কা দেয়ার ক্ষমতা রাখে। এই আত্মবিশ্বাস যুদ্ধের আগের তুলনায় ইরানকে আরো শক্তিশালী অবস্থানে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। পাশাপাশি ইউরোপীয় মিত্রদের সাথেও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ফাটল ধরেছে। ট্রাম্পের হামলা সত্ত্বেও ইরানি জনগণের মধ্যে বিদ্রোহের কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি, বরং তেহরান অপেক্ষা করছে। এখনই হার মানছে না, বরং ইরান পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং ট্রাম্পের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সঙ্কট আরো ঘনীভূত হওয়ার সুযোগ দিচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে আরো সুবিধাজনক অবস্থানে থেকে তারা দর কষাকষি করতে পারে।
সব মিলিয়ে ট্রাম্প এখন এমন এক কানাগলিতে আটকা পড়েছেন যেখান থেকে সম্মানজনক বিদায় নেয়া তার জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সূত্র: রয়টার্স



