মাত্র এক দিন আগে। মার্চের সেই তপ্ত দুপুরের শান্ত আকাশ হঠাৎ করেই এক যান্ত্রিক গর্জনে কেঁপে উঠেছিল, যা পারস্য উপসাগরের ভূ-রাজনীতিকে চিরতরে বদলে দেয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছিল। কাতারের আল উদেদ বিমান ঘাঁটি, যা মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক শক্তির স্নায়ুকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত, সেখানে মোতায়েন রাডার অপারেটরদের কাছে দিনটি আর দশটি সাধারণ দিনের মতোই শুরু হয়েছিল। কিন্তু দিগন্তের বুক চিরে যখন দু’টি যান্ত্রিক দানব ধেয়ে আসছিল, তখন আধুনিক বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও কয়েক মুহূর্তের জন্য স্তম্ভিত হয়ে পড়ে। এগুলো ছিল রুশ নির্মিত ইরানি সু-২৪ ‘ফেন্সার’ বোমারু বিমান।
তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, রাডার স্ক্রিনে তাদের কোনো অস্তিত্ব ছিল না। কারণ বিমান দু’টি তখন সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ১০০ ফুট ওপর দিয়ে উড়ছিল, যা একটি সাধারণ ১০ তলা ভবনের উচ্চতার সমান। এটি কোনো ভুল ছিল না, এটি ছিল একটি সুপরিকল্পিত ‘ডেডলি গেম অফ হাইড অ্যান্ড সিক’ বা মরণপণ লুকোচুরি খেলা।
আধুনিক যুদ্ধবিমান সাধারণত হাজার ফুট ওপর দিয়ে উড়ে, যাতে শত্রু রাডার সহজেই তাদের ধরতে পারে এবং নিজেদের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হয়। কিন্তু ইরানি পাইলটরা বেছে নিয়েছিলেন এক অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং প্রায় আত্মঘাতী পথ। একে সামরিক পরিভাষায় বলা হয় ‘টেরেন মাস্কিং’ বা ভূমির আড়ালে লুকিয়ে থাকা। মাটির এত কাছে ওড়ার ফলে রাডারের তরঙ্গগুলো বিমানকে শনাক্ত করার বদলে মরুভূমির বালু, সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ এবং উপকূলীয় ছোটখাটো স্থাপনার প্রতিধ্বনিতে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ছিল। একে রাডার বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘ক্লাটার’। সু-২৪ বিমানে থাকা বিশেষায়িত ‘টেরেন ফলোয়িং রাডার’ বা টিএফআর এই মিশনে মূল চাবিকাঠি হিসেবে কাজ করছিল। এই সিস্টেমটি বিমানটিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মাটির সমান্তরালে ভাসিয়ে নিয়ে আসছিল, যা শত্রুর প্রতিরক্ষা ব্যুহকে ফাঁকি দেয়ার এক প্রাচীন কিন্তু কার্যকর কৌশল।
এই উচ্চতায় ওড়ার পথে প্রধান বাধাগুলো যতটা না সামরিক, তার চেয়েও বেশি প্রাকৃতিক এবং প্রযুক্তিগত। মাত্র ১০০ ফুট উচ্চতায় উড়ার সময় সবচেয়ে বড় আতঙ্ক হয়ে দাঁড়ায় বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন বা ‘পাওয়ার লাইন’। মরুভূমি বা উপকূলীয় অঞ্চলে হঠাৎ করে সামনে চলে আসা কোনো উঁচু টাওয়ার বা মোবাইল টাওয়ারের সাথে সংঘর্ষ মানেই চোখের পলকে সলিল সমাধি। এছাড়া উপকূলীয় অঞ্চলের ছোট ছোট পাহাড় বা বালির ঢিবি এড়িয়ে চলা এই গতিতে অত্যন্ত দুরুহ। সু-২৪ বিমানে থাকা টিএফআর সিস্টেমটি মাটির উচ্চতা প্রতি মিলিসেকেন্ডে মেপে বিমানকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করে ঠিকই, কিন্তু সামান্য যান্ত্রিক ত্রুটি বা পাইলটের এক সেকেন্ডের অসাবধানতা মুহূর্তেই বিমানটিকে মাটিতে আছড়ে ফেলতে পারে। এর বাইরে আরেকটি বড় বিপদ হলো ‘বার্ড স্ট্রাইক’ বা পাখির সাথে ধাক্কা লাগা। নিম্ন উচ্চতায় পাখির ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি থাকে এবং এই উচ্চতায় ইঞ্জিনে একটি মাঝারি আকারের পাখি ঢুকে যাওয়া মানেই হলো ইঞ্জিনের ভয়াবহ বিস্ফোরণ। ১০০ ফুট উচ্চতায় বিমান থেকে ইজেক্ট করার বা প্যারাশুটে নামার সময়ও পাওয়া যায় না। মরুভূমির তপ্ত বাতাসের ঝাপটা বা ‘টার্বুলেন্স’ এই ঝুঁকিকে আরো কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়। কারণ বাতাসের ঘনত্বের তারতম্যের কারণে বিমানটি হঠাৎ নিচে নেমে যেতে পারে বা ওপরে উঠে রাডারের আওতায় চলে আসতে পারে।
সাধারণ অবস্থায় সোজা পথে উড়ার সময় পাইলটের শরীরের ওপর স্বাভাবিক মধ্যাকর্ষ বল বা ‘ওয়ান জি’ কাজ করে। কিন্তু চ্যালেঞ্জটি তৈরি হয় যখন সামনে কোনো বাধা আসে। মাটির মাত্র ১০০ ফুট ওপর দিয়ে ওড়ার সময় কোনো উঁচু ভবন বা পাহাড় এড়াতে পাইলটকে অত্যন্ত তীক্ষ্ণভাবে বিমানটি ঘুরাতে হয়। একে বলা হয় ‘হাই জি টার্ন’। যখন পাইলট খুব দ্রুত এবং তীক্ষ্ণভাবে মোড় নেন, তখন তার শরীরের ওপর স্বাভাবিক ওজনের চেয়ে পাঁচ থেকে ছয় গুণ বেশি চাপ পড়ে, যাকে ‘সিক্স জি’ বলা হয়। সু-২৪ একটি ভারী এবং শক্তিশালী বোমারু বিমান হওয়ায় এর পাইলটদের এই প্রচণ্ড চাপ সহ্য করার জন্য বিশেষ শারীরিক সক্ষমতা এবং বছরের পর বছর প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হয়।
এই মিশনে ইরানের সু-২৪ ব্যবহারের পেছনে গভীর সামরিক কৌশল লুকিয়ে ছিল। ধারণা করা হচ্ছে, ওই বিমান দু’টিতে ‘খিবিনি’ বা সমগোত্রীয় শক্তিশালী ‘জ্যামিং পড’ যুক্ত ছিল। এই জ্যামিং প্রযুক্তি আল উদেদ-এর প্রাথমিক রাডার এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার চোখে ধুলো দিতে সক্ষম হয়েছিল। এটি মার্কিন বাহিনীর জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা কারণ আল উদেদ ঘাঁটিটি অত্যাধুনিক ‘প্যাট্রিয়ট’ মিসাইল সিস্টেম এবং ‘থাড’ প্রতিরক্ষা ব্যুহ দিয়ে ঘেরা। কিন্তু ১০০ ফুট নিচ দিয়ে আসা কোনো লক্ষ্যবস্তুকে আঘাত করা এই সিস্টেমগুলোর জন্য প্রায় অসম্ভব।
ইরানি বিমানগুলো যখন মাত্র দুই মিনিটের দূরত্বে ছিল, তখন পরিস্থিতি এক চরম উত্তেজনার শিখরে পৌঁছায়। কিন্তু গল্পের মোড় ঘোরে যখন প্রতিবেশী কুয়েতি বিমান বাহিনী সক্রিয় হয়ে ওঠে। আকাশসীমা লঙ্ঘনের গুরুত্ব অনুধাবন করে কুয়েতি ইন্টারসেপ্টরগুলো দ্রুত উড্ডয়ন করে এবং ইরানি বিমানগুলোকে লক্ষ্য করে ধাওয়া শুরু করে। আন্তর্জাতিক প্রটোকল অনুযায়ী বারবার সতর্কবার্তা দেয়া সত্ত্বেও যখন ইরানি পাইলটরা তাদের গতিপথ পরিবর্তন করতে অস্বীকার করে, তখন কুয়েতি কমান্ড থেকে চূড়ান্ত ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ আসে। আকাশের বুকে আগুনের গোলক তৈরি করে কুয়েতি বিমানগুলো তাদের নিখুঁত নিশানায় ইরানি সু-২৪ বিমান দুটিকে ভূপাতিত করে। এটি ছিল কয়েক দশকের মধ্যে পারস্য উপসাগরে ঘটে যাওয়া সবচেয়ে বড় সামরিক সংঘাতের একটি।
ইরানি পাইলটদের ককপিটে থাকা যন্ত্রপাতিগুলোর দিকে তাকালে এই অভিযানের ভয়াবহতা বোঝা যায়। তাদের সামনে থাকা ‘রাডার আল্টিমিটার’ প্রতি সেকেন্ডে মাটির নিখুঁত দূরত্ব জানাচ্ছিল। তাদের ককপিটে তখন একের পর এক সতর্কবার্তা বা ‘অডিও অ্যালার্ট’ বাজছিল কারণ বিমানটি তার সর্বোচ্চ নিরাপদ সীমার নিচে অবস্থান করছিল। এই ধরনের মিশনকে বলা হয় ‘লো লেভেল পেনিট্রেশন মিশন’। এর উদ্দেশ্য ছিল মার্কিন এবং আঞ্চলিক জোটের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সক্ষমতা যাচাই করা। তেহরান সম্ভবত এই অভিযানের মাধ্যমে দেখতে চেয়েছিল যে তাদের আধুনিকায়িত ইলেকট্রনিক জ্যামিং প্রযুক্তি কতটা কার্যকরভাবে কাজ করছে। কিন্তু কুয়েতি বিমান বাহিনীর এই তাৎক্ষণিক এবং কঠোর প্রতিক্রিয়া ইরানের এই ‘স্ট্রেস টেস্ট’-কে এক রক্তক্ষয়ী পরিণতিতে রূপ দেয়। আল উদেদ ঘাঁটিটি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন অপারেশনাল কমান্ডের প্রধান দফতর হওয়ার কারণে সেখানে মাত্র দুই মিনিটের দূরত্বে ইরানি বোমারু বিমানের পৌঁছে যাওয়া মানে ছিল সুরক্ষাবলয়ে এক বিশাল গর্ত তৈরি হওয়া। যদি এই বিমানগুলোতে শক্তিশালী মারণাস্ত্র থাকতো, তবে ফলাফল হতে পারতো কল্পনাতীত। বিমান দু’টি ভূপাতিত হওয়ার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে এক নতুন সামরিক অস্থিরতার জন্ম হয়েছে।
ঘটনাটি শেষ পর্যন্ত কোনো সাধারণ মহড়া বা সতর্কবার্তায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তা এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ নিয়েছে। কাতার বিমান বাহিনীর সজাগ দৃষ্টির মধ্যেই কুয়েতি বিমান বাহিনী শেষ মুহূর্তে ধাওয়া দিয়ে ইরানি বিমানগুলোকে ভূপাতিত করে এক চূড়ান্ত বার্তা প্রদান করে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, পরের বার যদি তারা ২ মিনিটের বদলে ১ মিনিটে চলে আসে?
পারস্য উপসাগরের আকাশে এই ১০০ ফুটের ব্যবধান এখন ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যে এক নতুন স্নায়ুযুদ্ধের সূচনা করেছে। যেখানে জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয় রাডারের একটি সূক্ষ্ম বিন্দুর ওপর ভিত্তি করে। কুয়েতিদের এই কঠোর পদক্ষেপ একদিকে যেমন আঞ্চলিক সার্বভৌমত্বের প্রমাণ দিয়েছে, অন্যদিকে তা বড় ধরনের যুদ্ধের উসকানি হিসেবেও কাজ করতে পারে। এখন সবার তাকিয়ে থাকা ছাড়া উপায় নেই যে, তেহরান এই বিমান ধ্বংসের বদলা নিতে কী পদক্ষেপ নেয়। মরুভূমির বালু আর সমুদ্রের লোনা পানিতে মিশে থাকা সেই বিমানের ধ্বংসাবশেষ এখন বিশ্ব রাজনীতির পরবর্তী রক্তক্ষয়ী অধ্যায়ের নীরব সাক্ষী হয়ে রইল।


