আন্তর্জাতিক আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে মাঝসমুদ্রে এক নজিরবিহীন তাণ্ডব চালিয়েছে ইসরাইল। গাজায় মানবিক সহায়তা নিয়ে যাওয়ার পথে ‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা’ বা সুমুদ ত্রাণ বহরের ওপর সশস্ত্র হামলা চালিয়েছে দেশটির বাহিনী।
কোনো উসকানি ছাড়াই আন্তর্জাতিক পানিসীমায় ঢুকে ড্রোন, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার প্রযুক্তি খাটিয়ে এবং ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে নিরস্ত্র বেসামরিক মানুষের এই বহরকে ঘিরে ফেলে তারা।
বৃহস্পতিবার গ্রিসের ক্রিট দ্বীপের কাছাকাছি এলাকায় ৫৮টি নৌযানের মধ্যে অন্তত ৭টি জাহাজকে অস্ত্রের মুখে আটক করে নিজেদের দখলে নিয়েছে ইসরাইলি সেনাবাহিনী। তারা কেবল ত্রাণবাহী জাহাজ থামিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, শত শত ত্রাণকর্মীকে বন্দুকের নলের মুখে হাঁটু গেড়ে বসিয়ে এক ভয়াবহ আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করে।
ইসরাইল এবার যুদ্ধের নিয়মকানুন বা অন্য দেশের পানিসীমার তোয়াক্কা না করে গাজা থেকে প্রায় ৬০০ নটিক্যাল মাইল দূরেই এই হামলা শুরু করে। সাধারণত ইসরাইলি বাহিনী গাজার কাছাকাছি এলাকায় বাধা দেয়, কিন্তু এবার তারা কয়েক শ’ মাইল ভেতরে গিয়ে এই জলদস্যুগিরি চালিয়েছে।
বহরে থাকা অ্যাক্টিভিস্ট তারিক রউফ জানান, বিশাল সব রণতরি দিয়ে তাদের চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলা হয়েছিল। ইসরাইলি সেনারা ড্রোনের আলো দিয়ে তাদের অন্ধ করে দেয়ার চেষ্টা করে এবং রেডিওতে গান বাজিয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থায় জ্যাম তৈরি করে এক ধরনের মানসিক যুদ্ধ শুরু করে।
অথচ এই পুরো ঘটনাটি ঘটেছে এমন এক জায়গায় যেখানে ইসরাইলের কোনো আইনি কর্তৃত্বই নেই। তারা রেডিওর মাধ্যমে অদ্ভুত দাবি তুলছে যে ত্রাণকর্মীরা নাকি আন্তর্জাতিক আইন ভাঙছেন।
জাতিসঙ্ঘে ইসরাইলের দূত ড্যানি ড্যানন এই হামলাকে বীরত্ব হিসেবে জাহির করার চেষ্টা করলেও বাস্তব চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। নিরস্ত্র বেসামরিক মানুষের নৌকায় লেজার তাক করা এবং সেমি-অটোমেটিক রাইফেল নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়াকে মানবাধিকার কর্মীরা ‘অপহরণ’ এবং ‘সন্ত্রাসবাদ’ হিসেবে দেখছেন। বহরের মুখপাত্র গুর তসাবারের মতে, এটি আন্তর্জাতিক পানিসীমায় থাকা বেসামরিক মানুষের ওপর সরাসরি আক্রমণ। ইসরাইল যেভাবে মাঝসমুদ্র থেকে মানুষকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে, তা আন্তর্জাতিক আইনের ভাষায় স্রেফ অপহরণ ছাড়া আর কিছুই নয়। ১১টি জাহাজের সাথে দীর্ঘ সময় ধরে কোনো যোগাযোগ করা যাচ্ছে না, যা ওই নৌযানগুলোতে থাকা ৪০০-র বেশি মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে চরম উদ্বেগ তৈরি করেছে।
এই বিশাল ত্রাণ বহরটি গত রোববার ইতালি থেকে যাত্রা শুরু করেছিল। তাদের লক্ষ্য ছিল অবরুদ্ধ গাজার ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে খাদ্য ও ওষুধ পৌঁছে দেয়া, যেখানে ইসরাইলি হামলায় ইতোমধ্যেই ৭২ হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। গত অক্টোবরেও তারা এমন একটি চেষ্টা চালিয়েছিল এবং ওই সময় নেলসন ম্যান্ডেলার নাতি ও গ্রেটা থুনবার্গের মতো ব্যক্তিত্বদের গ্রেফতার করে ইসরাইল ভয়াবহ সমালোচিত হয়েছিল। বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিশ্বজুড়ে প্রশ্ন উঠছে, ইসরাইলের এই বেপরোয়া আচরণের সামনে বিশ্ববিবেক আর কতকাল নীরব থাকবে? ত্রাণকর্মীরা বলছেন, বিভিন্ন দেশের সরকারের এই নীরবতা আসলে ইসরাইলি অপরাধের প্রতি পরোক্ষ সমর্থন ছাড়া আর কিছু নয়।
সূত্র : আল জাজিরা



