লেবাননকে ইহুদিবাদী প্রকল্পের বিরোধিতা করতে হবে কেন

লেবানিজদের অবশ্যই একটি জাতি হিসেবে অভ্যন্তরীণ ঐক্য জোরদার করার দিকে এগিয়ে যেতে হবে।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
নেতানিয়াহু ও ইসরাইলি শীর্ষ কর্মকর্তারা
নেতানিয়াহু ও ইসরাইলি শীর্ষ কর্মকর্তারা |পার্সটুডে

‘মিডল ইস্ট মনিটর’ এক প্রবন্ধে লেবাননে ইহুদিবাদী ইসরাইলের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে বিশ্লেষণমূলক মতামত তুলে ধরেছে।

মঙ্গলবার মিডল ইস্ট মনিটর এক প্রবন্ধে লিখেছে, শুরু থেকেই ইহুদিবাদী প্রকল্পটি ফিলিস্তিনে একটি ‘ইহুদি রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং লেবাননেও সম্প্রসারণের লক্ষ্য ছিল। ফিলিস্তিন মুক্তি সংস্থা গঠনের আগেই লেবাননের উপর ইসরাইলি আক্রমণ শুরু হয়েছিল। অসংখ্য প্রতিবেদনে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে ইসরাইলি রেজিম দক্ষিণ লেবাননের আরো বেশি এলাকা দখল করতে এবং ‘কৃষি উপনিবেশ’ স্থাপন করে দেশের সীমান্ত অস্থিতিশীল করতে চেয়েছিল।

দক্ষিণ লেবাননের সীমান্তবর্তী গ্রাম, অবকাঠামো এবং খামারগুলোতে আক্রমণ করতো ইসরাইল; এই আক্রমণগুলোর লক্ষ্য ছিল এই অঞ্চলের মানুষকে দেশান্তরিত হতে বা আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করা। ইসরাইল অভ্যন্তরীণ উত্তেজনা তৈরি করে এবং ধর্মীয় মতপার্থক্যকে উস্কে দিয়ে লেবাননে গৃহযুদ্ধ বাধানোর চেষ্টা করছে। গত বছর, ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী লেবাননের জনগণকে খ্রিস্টান, সুন্নি, শিয়া এবং দ্রুজ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন, একবারের জন্যও ‘লেবানিজ’ শব্দটি ব্যবহার করেননি।

এই আলোচনার লক্ষ্য ছিল জনগণকে নিজেদেরকে একক রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে নয়, পৃথক ধর্মীয় গোষ্ঠী হিসেবে দেখতে উৎসাহিত করা। ফিলিস্তিনে ইহুদিবাদীরা যে লক্ষ্য অনুসরণ করছে, তা হলো এমন একটি ধর্মীয় রাষ্ট্র গঠন যেখানে কেবল একটি ধর্মের অনুসারীদের পূর্ণ নাগরিকত্বের অধিকার প্রদান করা হবে। এই দৃষ্টিভঙ্গি লেবানন ও আশপাশের অঞ্চলটিকে ছোট এবং দুর্বল ধর্মীয় সত্তায় বিভক্ত করতে চায় যাতে তারা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পারে ও তাদের সম্পদ লুণ্ঠন করতে পারে।

খ্রিস্টানদের জন্য জায়নিস্ট প্রকল্পের বিপদ

লেবানন, বিশেষ করে এর খ্রিস্টানরা সুদানের মতো অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে পারে, যেখানে ব্রিটিশ উপনিবেশবাদ সমাজকে আরব ও আফ্রিকান, মুসলিম ও খ্রিস্টান এবং বিভিন্ন উপজাতিতে বিভক্ত করে পরিচয়ের বিভাজনকে আরো বাড়িয়ে তুলেছিল। এই পরিচয়ের পার্থক্য এতটাই তীব্র হয়ে ওঠে যে দক্ষিণের খ্রিস্টানরা বিচ্ছিন্নতার ডাক দেয়, যা ২০১১ সালে অর্জিত হয়। কিন্তু দক্ষিণ সুদান প্রজাতন্ত্র স্বাধীনতা লাভের সাথে সাথেই খ্রিস্টানদের মধ্যে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়, যেমনটি আমরা লেবাননে ‘খ্রিস্টান’ অঞ্চলে গৃহযুদ্ধের সময় দেখেছি।

এটা কোন কাকতালীয় ঘটনা নয় যে ইসরাইলি দখলদার গোষ্ঠী লেবানন ও সুদানে ‘খ্রিস্টান’ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন করেছে। ঠিক যেমন তারা সিরিয়ায় ‘সুন্নি‘, ‘ড্রুজ‘ এবং ‘কুর্দি‘ গোষ্ঠীগুলিকে এবং আজারবাইজান প্রজাতন্ত্রের অন্যান্য গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন করে। ইসরাইল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এই সমন্বয় আজও অব্যাহত রয়েছে; উদাহরণস্বরূপ, সিরিয়ার গোলানি শাসন আলাউইট তথা আলাভি ও দ্রুজ বা ড্রুজের বিরুদ্ধে গণহত্যা চালায়, যার লক্ষ্য দেশগুলোকে ছোট ছোট এবং দুর্বল সত্তায় বিভক্ত করা যাতে গোটা অঞ্চল ইসরাইলি আধিপত্যের অধীনে থাকে।

অন্যদিকে, একটি ‘ইহুদি‘ রাষ্ট্রের ‘বৈধতা‘ মেনে নেয়া আসলে এই যুক্তিকে বৈধতা দেয় যে এই অঞ্চলের খ্রিস্টানরা একটি সংখ্যালঘু গোষ্ঠীতে পরিণত হবে। এমনকি যদি আমরা লেবাননকে খ্রিস্টানদের আবাসভূমি হিসেবে বিবেচনা করি, যার উপস্থিতি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসছে, দখলদারিত্ব এবং রাজনৈতিক ও সামরিক চাপ তাদের অনেককে দেশত্যাগ করতে বাধ্য করছে; ফিলিস্তিনি খ্রিস্টানদের দেশত্যাগ এর সবচেয়ে বড় সাক্ষ্য। ইহুদিবাদী প্রচারণা সত্ত্বেও যে ইহুদিবাদ খ্রিস্টানদের সমর্থন করে, ফিলিস্তিনি গির্জাগুলো বারবার বলেছে যে খ্রিস্টান অভিবাসনের মূল কারণ হলো ইসরাইলের দখলদারিত্ব এবং আক্রমণাত্মক নীতি।

সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ

ইসরাইলের সাথে যুদ্ধে লেবাননের দুর্বলতার কারণে কেউ কেউ সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের বিষয়টি উত্থাপন করেন, কিন্তু আমাদের ইসরাইলের গণহত্যার ধারণাটি ভুলে যাওয়া উচিত নয়। কারণ এই ইসরাইল একদিন সিদ্ধান্ত নিতে পারে যে গাজায় তারা যে ধরণের গণহত্যা করছে তারা লেবাননসহ অন্যত্রও তারা একই কাজ করতে পারে। অবশ্যই, গাজা থেকে শেখার অনেক কিছু আছে। কিন্তু গণহত্যা চায় এমন শত্রুর কাছে আত্মসমর্পণ করা কখনো সমাধান হতে পারে না। লেবানিজদের অবশ্যই একটি জাতি হিসেবে অভ্যন্তরীণ ঐক্য জোরদার করার দিকে এগিয়ে যেতে হবে। যারা লেবানিজ জনগণ, যার মধ্যে খ্রিস্টানরাও রয়েছেন, তাদের সুরক্ষার বিষয়ে চিন্তা করতে হবে, তাদের অবশ্যই ধর্মীয় পরিচয় নয়, বরং নাগরিকত্বের নীতি মেনে চলতে হবে, যা একক স্বদেশের অন্তর্ভুক্তির ভিত্তি। ইহুদিবাদী প্রকল্প লেবাননের জনগণের জন্য যে বিভিন্ন ধরনের হুমকি তৈরি করছে, জবাবে তাদের অবশ্যই ‘না‘ বলতে হবে।

সূত্র : পার্সটুডে