কুরিয়ার থেকে রিয়েল এস্টেট—ইরানের কর্মবাজারে বাড়ছে নারীর উপস্থিতি

তেহরানের অভিজাত এলাকা থেকে শুরু করে সাধারণ পাড়া-মহল্লা—সবখানেই এই পরিবর্তনের ছাপ স্পষ্ট। বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চশিক্ষার বিস্তার, জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং সেবাখাতের সম্প্রসারণ ইরানের কর্মবাজারের চিত্র পাল্টে দিচ্ছে।

নয়া দিগন্ত অনলাইন

তেহরানের ব্যস্ত সড়ক, অভিজাত শপিংমল কিংবা ভার্চুয়াল জগৎ—সবখানেই এখন চোখে পড়ছে নারীদের সক্রিয় উপস্থিতি। কোথাও তারা রিয়েল এস্টেট এজেন্ট হিসেবে গ্রাহক সামলাচ্ছেন, কোথাও মোটরসাইকেলে পণ্য পৌঁছে দিচ্ছেন ক্রেতার দুয়ারে, আবার কেউ মোবাইল ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে সাবলীলভাবে পণ্যের প্রচার করছেন। একসময় পুরুষপ্রধান হিসেবে পরিচিত ইরানের কর্মক্ষেত্র এখন ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে নারীদের অংশগ্রহণে।

তেহরানের অভিজাত এলাকা থেকে শুরু করে সাধারণ পাড়া-মহল্লা—সবখানেই এই পরিবর্তনের ছাপ স্পষ্ট। বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চশিক্ষার বিস্তার, জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং সেবাখাতের সম্প্রসারণ ইরানের কর্মবাজারের চিত্র পাল্টে দিচ্ছে।

মোটরসাইকেল কুরিয়ারে নারীর উপস্থিতি
ইরানের সরকারি বার্তা সংস্থা ইরনার প্রতিবেদনে মাসুমেহ নিকনাম ও জাহরা আখুন্দি জানান, পণ্য ডেলিভারি নিতে গিয়ে পুরুষ কুরিয়ারের বদলে নারীকে দেখে এখনো অনেকেই বিস্মিত হন। অনলাইন স্টোরের হয়ে মোটরসাইকেলে পণ্য পৌঁছে দেওয়া মারিয়াম বলেন, শুরুতে মানুষ বিষয়টি অবাক হয়ে দেখলেও এখন ধীরে ধীরে তা স্বাভাবিক হয়ে উঠছে।

তিনি জানান, কাজের সময়ের স্বাধীনতা ও প্রতিদিন আয়ের সুযোগ থাকায় তিনি এই পেশা বেছে নিয়েছেন। পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী হিসেবে সংসার চালাতে এই আয় তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

মারিয়ামের ভাষায়, “অনেক সময় বাড়ির মালিক বাইরে এসে পুরুষ কুরিয়ার খোঁজেন, অথচ পার্সেল হাতে দাঁড়িয়ে থাকি আমি। মানুষ এখনো কিছুটা প্রথাগত মানসিকতায় থাকলেও ধীরে ধীরে সেই দৃষ্টিভঙ্গি বদলাচ্ছে।”

আবাসন খাতে বাড়ছে নারীর গ্রহণযোগ্যতা
রিয়েল এস্টেট বা আবাসন ব্যবসার মতো কঠিন পেশাতেও এখন নারীদের চাহিদা বাড়ছে। গ্রাহকদের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে অনেক প্রতিষ্ঠান নারী পরামর্শক নিয়োগ দিচ্ছে।

দক্ষিণ তেহরানের একটি আবাসন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত এক নারী জানান, পরিবার নিয়ে আসা গ্রাহকেরা নারী পরামর্শকদের সঙ্গে কথা বলতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। বাড়ির পরিবেশ বা এলাকার সুবিধা-অসুবিধা নারীরা সহজেই একে অপরকে বোঝাতে পারেন।

এজেন্সির মালিক হাজ আগা বখতিয়ারি বলেন, “আগে এই পেশা পুরোপুরি পুরুষদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। এখন নারীরা আসায় অফিসের পরিবেশ আরও পেশাদার ও গোছানো হয়েছে। তাদের ধৈর্য ও সততা গ্রাহকদের আস্থা বাড়াচ্ছে।”

ডিজিটাল দুনিয়ায় তরুণীদের নতুন সম্ভাবনা
প্রথাগত চাকরির বাইরে কন্টেন্ট তৈরি ও অনলাইন ব্যবসার মতো নতুন ধারার পেশায় তরুণীদের আগ্রহ সবচেয়ে বেশি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোশাক, হস্তশিল্প কিংবা ঘরসজ্জার পণ্যের প্রচার করে ঘরে বসেই ভালো আয় করছেন অনেকে।

২৭ বছর বয়সী সারা জাওয়ানি জানান, কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের বড় একটি অংশ এখন নারী। স্বাধীনভাবে কাজ করা এবং তুলনামূলক ভালো আয়ের সুযোগ থাকায় তরুণ প্রজন্ম এখন আর কম বেতনের প্রচলিত চাকরিতে আগ্রহী নয়।

তবে তিনি জানান, এই খাতে যেমন তীব্র প্রতিযোগিতা রয়েছে, তেমনি ইন্টারনেট বিভ্রাট ও আয়ের অনিশ্চয়তার মতো ঝুঁকিও রয়েছে।

জীবনসংগ্রামে হার না মানা নারীরা
ইরানের নগরজীবনে এমন অনেক নারীর দেখা মেলে, যাদের কাছে জীবনযুদ্ধ কোনো লিঙ্গভেদ মানে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের খরচ ও বাসাভাড়া চালাতে স্ন্যাপের হয়ে কুরিয়ার হিসেবে কাজ করছেন আনাহিতা। তার মতে, বর্তমান মূল্যস্ফীতির বাজারে বেঁচে থাকার জন্য যেকোনো সম্মানজনক কাজই গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে, ৫৬ বছর বয়সী তুবি বাসচালক হিসেবে যাত্রী পরিবহন করছেন। স্বামীর অনুপস্থিতিতে সন্তানদের মানুষ করার পুরো দায়িত্ব তিনি একাই কাঁধে তুলে নিয়েছেন।

মেট্রো স্টেশনের সামনে দেখা মেলে ১৭ বছর বয়সী লায়লার, যে অসুস্থ বাবার চিকিৎসার খরচ জোগাতে ড্রাম বাজিয়ে আয় করছে। ভবিষ্যতে আইনজীবী হয়ে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখে সে।

বদলে যাচ্ছে কর্মবাজারের চিত্র
ইরনার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আবাসন খাত, কন্টেন্ট নির্মাণ, মোটরসাইকেল কুরিয়ার কিংবা গণপরিবহন—সবখানেই নারীদের ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণ ইরানের কর্মবাজারে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এতে যেমন নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা বাড়ছে, তেমনি কর্মক্ষেত্রে বৈচিত্র্যও তৈরি হচ্ছে।

তবে চাকরির নিরাপত্তাহীনতা ও অনিশ্চিত আয়ের মতো চ্যালেঞ্জ এখনো রয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সহায়তা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং কার্যকর নীতিমালার মাধ্যমে এই পরিবর্তনকে টেকসই করা জরুরি।

সূত্র: ইরনা