কেবল রণক্ষেত্র নয়, ইরান যুদ্ধ এখন বেইজিংয়ের কাছে এক বিশাল জীবিত গবেষণাগার। একদিকে ভারত-পাকিস্তান সীমান্ত সঙ্ঘাত আর অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের এই লড়াই- সবকিছুই খুব কাছ থেকে দেখছে চীন। তাদের মূল লক্ষ্য মার্কিন যুদ্ধকৌশলের হাঁড়ির খবর বের করা এবং নিজেদের সমরাস্ত্রের ঝালাই করে নেয়া। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কিভাবে কাজ করে আর কোথায় তাদের ঘাটতি- তা খুঁটিয়ে দেখছে চীনা সমরবিদরা।
লক্ষ্যটা আরো গভীর। ভবিষ্যতে তাইওয়ান নিয়ে কোনো সঙ্ঘাত বাধলে যেন মার্কিন বাহিনীকে টেক্কা দেয়া যায়। দক্ষিণ চীন সাগরের ওপাড়ে যে বড় লড়াইয়ের প্রস্তুতি বেইজিং নিচ্ছে, তার জন্য ইরানের এই সঙ্ঘাতকে তারা একটি ‘লাইভ ল্যাবরেটরি’ বা জীবন্ত পরীক্ষাগার হিসেবে ব্যবহার করছে।
চীনের নজর এখন মূলত যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক প্যাট্রিয়ট এবং থাড প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর। ইরানের সস্তা ড্রোন আর ক্ষেপণাস্ত্রের বন্যায় এই দামি ব্যবস্থাগুলো কতটা কার্যকর থাকছে, তা বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, চীন দেখছে যে কেবল প্রযুক্তিতে সেরা হলেই হয় না, দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে গোলাবারুদের টান পড়লে যুক্তরাষ্ট্র কিভাবে সামাল দেয়। এছাড়া যুদ্ধের ময়দানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে লক্ষ্যবস্তু ঠিক করার মার্কিন পদ্ধতি ‘প্রজেক্ট মেভেন’ নিয়েও বেইজিংয়ের ব্যাপক আগ্রহ।
স্যাটেলাইটের তথ্য আর এআই প্রযুক্তির সমন্বয়ে যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে অতি দ্রুত হামলা চালাচ্ছে, সেই ‘কিল চেইন’ পদ্ধতিটি নিজেদের আয়ত্তে আনতে চায় চীন। হোয়াইট হাউস কিভাবে রাজনৈতিক চাপ আর মিত্রদের সাথে সম্পর্ক বজায় রেখে যুদ্ধ চালায়, সেই কূটনৈতিক পাঠও বেইজিংয়ের নীতিনির্ধারকরা বেশ গুরুত্বের সাথে নিচ্ছেন।
নিজেদের শক্তির পাল্লাও দিন দিন বেশ ভারি করছে চীন। ২০২৩ সাল থেকে তারা প্রতি বছর প্রায় ১০০টি করে পরমাণু অস্ত্র ভাণ্ডারে জমা করছে। বেইজিংয়ের নৌবাহিনী এখন জাহাজের সংখ্যায় বিশ্বের অন্যতম সেরা।
তবে সাবেক চীনা সামরিক কর্তাদের মতে, শুধু আক্রমণ নয়, প্রতিরক্ষায় অজেয় হওয়াটাই এখন চীনের প্রধান চ্যালেঞ্জ। ইরানের কম দামি শাহেদ ড্রোন যেভাবে মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যুহ ভেদ করে সামরিক ও জ্বালানি স্থাপনায় আঘাত করেছে, তা থেকে চীন শিখছে কিভাবে সস্তায় বড় ক্ষতি করা যায়। পাল্টা হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রও তাদের নতুন প্রযুক্তির ড্রোন লুকাশ মাঠে নামিয়েছে, যা চীনের নজর এড়ায়নি।
নিজেদের সীমানার কাছে ভারত-পাকিস্তান সঙ্ঘাত থেকেও চীন বড় দু’টি শিক্ষা নিয়েছে। ভারতের আকাশসীমা রক্ষায় ব্যবহৃত রুশ প্রযুক্তির এস-৪০০ এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্যাট্রিয়ট- এই দুই ব্যবস্থার কার্যকারিতা চীনকে সবচেয়ে বেশি ভাবাচ্ছে। ভারত যেভাবে ‘সুদর্শন চক্র’ বা নিজস্ব আয়রন ডোম তৈরির চেষ্টা করছে, তার নাড়িনক্ষত্র জানার চেষ্টায় আছে বেইজিং। পাকিস্তান সীমান্তে চীনা প্রযুক্তির রাডার ও অস্ত্র কতটা কার্যকর ছিল, সেই তথ্যও এখন চীনা প্রকৌশলীদের হাতে। এই বাস্তব অভিজ্ঞতাগুলো তাদের নিজেদের অস্ত্র ব্যবস্থার ত্রুটি সংশোধন করতে এবং ভারতের মতো প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কৌশল সাজাতে বড় ভূমিকা রাখবে।
সূত্র : এনটিটিভি



