চীন সফরে ‘মুগ্ধ’ ট্রাম্প, গোলাপের বীজ উপহার পাঠাবেন শি

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে ‘গঠনমূলক’ একটি নতুন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে পৌঁছানোর কথা জানিয়েছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেইজিং সফরের দ্বিতীয় দিনেও তার সাথে দেখা করেছেন তিনি।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
ডোনাল্ড ট্রাম্প ও শি জিনপিং
ডোনাল্ড ট্রাম্প ও শি জিনপিং |সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে ‘গঠনমূলক’ একটি নতুন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে পৌঁছানোর কথা জানিয়েছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেইজিং সফরের দ্বিতীয় দিনেও তার সাথে দেখা করেছেন তিনি।

শুক্রবার (১৫ মে) সকালে ট্রাম্পকে জংনানহাই লিডারশিড কম্পাউন্ড ঘুরে দেখান শি, যেখানে তিনিসহ চীনের শীর্ষ নেতারা বসবাস করেন ও সেখান থেকে কাজকর্ম পরিচালনা করেন।

দুই নেতাকে এ সময় বেশ হাসিখুশি ও কিছুটা হালকা মেজাজে দেখা যায়।

হেঁটে হেঁটে ঘোরার সময় শি বলেন, ‘এ জায়গাটি একসময় সম্রাটের উদ্যানের অংশ ছিল, এই প্রাঙ্গণে প্রচুর ইতিহাস রয়েছে।’ তিনি আরো যোগ করেন, তাদের হাঁটার সময় যে গাছটি তারা দেখেছিলেন, সেটির বয়স ৪৯০ বছর।

হাঁটার সময় এক পর্যায়ে ট্রাম্প বলেন, ‘এগুলোই কারো দেখা সবচেয়ে সুন্দর গোলাপ।’

এ সময় শি জানান, বাগানে তারা যে চীনা গোলাপ দেখেছেন, তার বীজ তিনি ট্রাম্পকে উপহার হিসেবে পাঠাবেন।

এতে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি এটি খুব পছন্দ করি, এটি দারুণ।’

পরে চায়ের ঘরের দিকে যাওয়ার সময়ও ট্রাম্পকে বলতে শোনা যায়, শি তাকে হোয়াইট হাউসের রোজ গার্ডেনের জন্য গোলাপ দেবেন।

জংনানহাই প্রাঙ্গণে ট্রাম্প ও শির হাঁটার সময় ধারণ করা একটি ভিডিওতে তাদের কথোপকথন শোনা গেছে।

ট্রাম্প ও শি তাদের দোভাষীদের সাথে একটি বাগানে দাঁড়িয়ে থাকার সময় শির কাছে ট্রাম্প জানতে চান, ‘আমি কি প্রেসিডেন্টকে জিজ্ঞাসা করতে পারি- অন্য দেশ থেকে আসা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের, যেমন প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রীদের, তিনি কি এখানে নিয়ে আসেন?’

শি জবাব দেন, ‘খুবই কম। আমরা সাধারণত এখানে কূটনৈতিক আয়োজন করি না। যদি এরকম কিছু আয়োজন শুরু হয়েছে, এরপরও এটি এখনো অত্যন্ত বিরল।’

তিনি আরো বলেন, ‘উদাহরণ হিসেবে, পুতিন।’ পূর্ববর্তী সফরগুলোর সময় রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট একাধিকবার জংনানহাই পরিদর্শন করেছেন।

ট্রাম্প বলেন, ‘ভালো। আমার এটা পছন্দ হয়েছে।’

বৃহস্পতিবার যখন দুই প্রেসিডেন্ট দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিলিত হন, তখন রাশিয়া ঘোষণা করে যে পুতিন খুব শিগগিরই আবার চীন সফর করবেন। পরে ট্রাম্প ও শি দু’জনই সাংবাদিকদের সাথে কথা বলেন।

চীনে ‘মুগ্ধ’ ট্রাম্প
সাংবাদিকদের সামনে কথা বলার সময় ট্রাম্প প্রথমে বক্তব্য শুরু করেন এবং বলেন, তারা বাণিজ্য, ইরান এবং ‘আরো অনেক বিষয়’ নিয়ে আলোচনা করেছেন।

তিনি আরো বলেন, তারা ‘ভিন্ন অনেক সমস্যা সমাধান করেছেন, যেগুলো অন্য কেউ সমাধান করতে পারত না।’

ইরান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘তাদের পারমাণবিক অস্ত্র থাকুক এটা আমরা চাই না’ এবং ‘আমরা চাই প্রণালিটি খোলা থাকুক।’

এরপর তিনি শিকে ধন্যবাদ জানান এবং বলেন, বেইজিংয়ে সফর করতে পারা তার জন্য সম্মানের।

তিনি জানান, ২৪ সেপ্টেম্বর তারা আবার সাক্ষাৎ করবেন, যখন শি যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাবেন।

বিষয়টিকে ‘পাল্টাপাল্টি শুল্কের মতো পাল্টাপাল্টি সফর’ বলে উল্লেখ করেন ট্রাম্প।

তিনি আরো বলেন, তিনি আশা করেন শি যুক্তরাষ্ট্র দেখে সেইভাবেই মুগ্ধ হবেন, যেমন এই সফরে ট্রাম্প চীনকে দেখে মুগ্ধ হয়েছেন।

ট্রাম্পের সফর ‘ঐতিহাসিক ও মাইলফলক’
শি ও ট্রাম্প দু’জনই বেইজিংয়ে ট্রাম্পের সফরকে ‘অত্যন্ত সফল’ ও ‘ঐতিহাসিক’ বলে উল্লেখ করেছেন।

চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে জংনানহাই বৈঠকে শি ও ট্রাম্পের আলোচনার একটি সারসংক্ষেপ প্রকাশিত হয়েছে।

সেখানে বলা হয়েছে, শি এই সফরকে ‘ঐতিহাসিক ও মাইলফলক’ হিসেবে উল্লেখ করেন এবং বলেন, দুই নেতা তাদের দুই দেশের মধ্যে ‘গঠনমূলক, কৌশলগত ও স্থিতিশীল সম্পর্কের জন্য একটি নতুন অবস্থান নির্ধারণ করেছেন’।

তিনি বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আমেরিকাকে আবার মহান করতে চান, আর আমি চীনা জনগণকে নেতৃত্ব দিয়ে চীনা জাতির মহান পুনর্জাগরণ বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’

তিনি আরো বলেন, উভয় দেশের উচিত অর্জিত ‘গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতাগুলো’ বাস্তবায়ন করা।

চীনের এই বিবরণ অনুযায়ী, ট্রাম্প বলেন সফরটি ‘অত্যন্ত সফল, বিশ্বব্যাপী আলোচিত এবং স্মরণীয়’ ছিল। তিনি শিকে ‘আমার পুরোনো বন্ধুদের একজন’ বলে উল্লেখ করেন এবং বলেন, ‘আমি তাকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করি।’

প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে আন্তরিক ও গভীর যোগাযোগ বজায় রাখতে আগ্রহের কথাও জানান তিনি এবং বলেন, ‘ওয়াশিংটনে তাকে স্বাগত জানানোর জন্য আন্তরিকভাবে অপেক্ষা করছি।’

সফর শেষ করে ট্রাম্প ওয়াশিংটনের পথে রওনা হয়েছেন। বেইজিং ছাড়ার আগে শি জিনপিংয়ের সাথে মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।

হোয়াইট হাউজ জানায়, খাবারের মেনুতে ছিল- কড মাছ ছড়ানো সি-ফুড স্যুপ, মচমচে ও উচ্চতাপে দ্রুত ভাজা লবস্টার বল, মোরেল মাশরুম ভরা হাড়হীন গরুর মাংসের ফিলেট, কুং পাও চিকেন ও স্ক্যালপস, সেদ্ধ মৌসুমি সবজি, বাঁশ কোঁড়ল, মাশরুম ও শিম, বান-এর ভেতরে স্টিউ করা গরুর গোস্ত, ভাপে সেদ্ধ শুকরের মাংস ও চিংড়ির ডাম্পলিং, চকোলেট ব্রাউনি, ফল ও আইসক্রিম এবং কফি ও চা।

এদিকে, হোয়াইট হাউসের সফরসঙ্গী সাংবাদিকদের জন্য তাদের ভ্যানে ম্যাকডোনাল্ডস সরবরাহ করা হয়।

ইরান, বাণিজ্য ও অন্যান্য
গত বুধবার রাতে চীন পৌঁছান ডোনাল্ড ট্রাম্প। দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর এই প্রথম চীন সফর করেছেন তিনি। বেইজিংয়ে বিমানবন্ধর থেকে শুরু করে যেসব জায়গায় তিনি গেছেন, সবখানেই তাকে বর্ণাঢ্যভাবে স্বাগত জানানো হয়েছে।

এর আগে ২০১৭ সালের নভেম্বরে তিনি তার প্রথম মেয়াদেও বেইজিং ঘুরে যান এবং তার ওই সফরের পর মার্কিন কোনো প্রেসিডেন্ট আর দেশটিতে যাননি।

বৃহস্পতিবার ট্রাম্প ও তার সাথে সফররত প্রশাসনিক, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন ধরনের প্রতিনিধিরা প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে শি জিনপিং ও চীনের কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক করেন। নির্ধারিত সময়ের চেয়েও প্রায় দ্বিগুণ সময় ধরে চলেছিল ওই বৈঠক।

সেখানে ‘চমৎকার’ আলোচনা হয় বলেও সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এক শব্দে জানান ডোনাল্ড ট্রাম্প।

প্রথমদিনের কর্মসূচির পর ফক্স নিউজের উপস্থাপক শন হ্যানিটিকে একটি সাক্ষাৎকার দেন ট্রাম্প। এ সময় তিনি জানান, বৃহস্পতিবার দুই নেতার মধ্যে আলোচনার সময় শি ইরানকে সামরিক সরঞ্জাম দেয়া বন্ধ রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

ফক্স নিউজকে তিনি বলেন, ইরানের সাথে সম্ভাব্য কোনো শান্তিচুক্তি নিয়ে তিনি ‘আর খুব বেশি ধৈর্য ধরতে চান না’।

এর পরপরই চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে চীনের সরকারের বক্তব্য প্রকাশিত হয় যেখানে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্ঘাতের অবসান ঘটাতে তারা ‘নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে’ এবং ‘শান্তি আলোচনায় আরো বেশি সহায়তা প্রদান ও শেষ পর্যন্ত স্থায়ী শান্তি অর্জনে গঠনমূলক ভূমিকা রাখতে’ চায়।

বেইজিং তেহরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র। চীন ইরানি তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা এবং দেশটির বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার। ট্রাম্প প্রশাসন আশা করেছিল, এই অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে শি তেহরানকে আলোচনার টেবিলে আনতে ভূমিকা রাখবেন।

চীনা বিবৃতিতে আজ বলা হয়েছে, এই সঙ্ঘাত ‘কখনোই ঘটার কথা ছিল না’ এবং ‘এটি চালিয়ে যাওয়ার কোনো কারণ নেই’, তবে লক্ষণীয়ভাবে সেখানে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করা হয়নি।

‘চীন হরমুজ প্রণালী খোলা রাখতে চায়’
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট আরো দাবি করেন, চীন হরমুজ প্রণালী খোলা রাখতে চায় এবং এ বিষয়ে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে।

শিকে উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, ‘তিনি বলেছেন তারা সেখান থেকে অনেক তেল কেনেন এবং তারা তা চালিয়ে যেতে চান। তিনি হরমুজ প্রণালী খোলা দেখতে চান।’

ট্রাম্প আরো বলেন, হরমুজ প্রণালী খোলা রাখার বিষয়ে কোনো চুক্তি করতে শি সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘যে কেউ এত তেল কিনে, তাদের স্পষ্টভাবেই কোনো না কোনো ধরনের সম্পর্ক থাকে। তবে তিনি বলেছেন, ‘আমি যেভাবেই পারি সাহায্য করতে চাই, যদি কোনোভাবে সাহায্য করতে পারি।’ তিনি হরমুজ প্রণালী খোলা দেখতে চান।’

বাণিজ্য আলোচনা আগের তুলনায় ‘ভালো হয়েছে’
বাণিজ্য আলোচনা আগেরবারের তুলনায় ‘ভালো হয়েছে’ দাবি করে ট্রাম্প বলেন, সেগুলো আগেরবার স্বাক্ষরিত ৩৬টি চুক্তির তুলনায় ‘অনেক বড়’।

তিনি বলেন, চীন ‘আমাদের প্রচুর কৃষিপণ্য কিনবে’, যেমন সয়াবিন।

চীন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ২০০টি বোয়িং বিমান কিনতে রাজি হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেছেন।

ফক্স নিউজের উপস্থাপক শন হ্যানিটি জানতে চান, যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে চীন কী চায়। এর জবাবে ট্রাম্প বিস্তারিত না বলে বলেন, ‘আলোচনার মতো অনেক বিষয় আছে- অনেক কিছু।’

সূত্র: বিবিসি