ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় ধস, রিপাবলিকানদের জন্য বিপদের বাঁশি

বিভিন্ন জরিপে দেখা যাচ্ছে, অর্থনীতি, অভিবাসন ও পররাষ্ট্রনীতিতে অসন্তোষের কারণে ডোনাল্ড ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এতে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জন্য ঝুঁকি বাড়ছে।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প |সংগৃহীত

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় ধস নেমেছে। হোয়াইট হাউসে ফিরে আসার পর বছর না ঘুরতেই দেখা যাচ্ছে, তার রাজনৈতিক ম্যাজিক যেন কিছুটা ফিকে হয়ে আসছে। সম্প্রতি রয়টার্স-ইপসোস, ভেরাসাইট এবং এপি-এনওআরসি (অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস ও শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ গবেষণা কেন্দ্র)-এর মতো বাঘা বাঘা সংস্থার জনমত জরিপ বলছে, ট্রাম্পের প্রতি জনসমর্থন এখন আশঙ্কাজনকভাবে নিচের দিকে।

অর্থনীতি, অভিবাসন আর ইরানের সাথে সঙ্ঘাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে তার সিদ্ধান্তের সাথে খোদ মার্কিনীরাই খুব একটা একমত হতে পারছেন না। মধ্যবর্তী নির্বাচনের আর মাত্র ছয় মাস বাকি, আর ঠিক এই সময়ে জনসমর্থনের গ্রাফ ৩৩ থেকে ৩৬ শতাংশের ঘরে ঘোরাফেরা করাটা রিপাবলিকান শিবিরের জন্য মোটেও সুখকর কোনো খবর নয়।

দ্য গার্ডিয়ানের বিশ্লেষক ও কলামলেখক জুলিয়ান পোর্টার মনে করেন, ট্রাম্পের সেই চিরাচরিত ‘স্ট্রংম্যান’ ইমেজে কোথাও যেন একটা বড়সড় ফাটল ধরেছে।

এই প্রতিবেদনে দেখা যাবে, কেন ডোনাল্ড ট্রাম্পের পায়ের তলার মাটি এভাবে সরতে শুরু করল।

সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা এসেছে ট্রাম্পের সবচেয়ে প্রিয় জায়গা থেকে- তা হলো অর্থনীতি। এপি-এনওআরসি-এর জরিপ বলছে, প্রতি ১০ জন মার্কিনীর মধ্যে সাতজনই মনে করছেন দেশের অর্থনীতির হাল খুবই করুণ। শুধু তাই নয়, দেশের সামগ্রিক গতিপথ নিয়ে ও মানুষের মনে অসন্তোষ দানা বেঁধেছে। মাত্র ২৩ শতাংশ মানুষ মনে করছেন যে ট্রাম্প জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে সফল হয়েছেন।

জীবনযাত্রার আকাশছোঁয়া খরচ আর সাধারণ মানুষের পকেটে টান পড়ায় ট্রাম্পের অর্থনৈতিক নীতির ওপর আস্থা এখন মাত্র ৩০ শতাংশে এসে ঠেকেছে, যা গত মার্চের তুলনায় অনেকটা কম। মানুষ এখন আর শুধু চটকদার কথায় ভুলছে না, বরং মাস শেষে পকেটের হিসাব মেলাতে গিয়ে তারা ট্রাম্পের ওপর বিরক্ত হচ্ছে। এই বিরক্তি আগামী নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থীদের জন্য গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

অভিবাসন নীতি নিয়ে ট্রাম্প বরাবরই কট্টর, কিন্তু এবার সেই কট্টরপন্থা উল্টা ফল দিচ্ছে। রয়টার্স-ইপসোসের তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্পের গণ-বিতাড়ন বা ডিপোর্টেশন নীতি সাধারণ ভোটারদের মনে ভীতির সঞ্চার করেছে। ৫২ শতাংশ ভোটার জানিয়েছেন, যারা ট্রাম্পের এই কঠোর নীতি সমর্থন করবেন, তাদের ভোট দেয়ার সম্ভাবনা খুব কম। বিশেষ করে নিরপেক্ষ বা ইনডিপেনডেন্ট ভোটারদের মধ্যে এই অনীহা আরো প্রকট।

বছরের শুরুতে মিনিয়াপোলিসে অভিবাসন কর্মকর্তাদের সাথে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষে দুজন প্রাণ হারানোর পর প্রশাসন কিছুটা নরম হলেও, সাধারণ মানুষের মনে এর নেতিবাচক প্রভাব রয়েই গেছে। জানুয়ারিতে শপথ নেয়ার সময় যে অভিবাসন নীতিতে অর্ধেক দেশের সমর্থন ছিল, এখন তা নেমে এসেছে মাত্র ৪০ শতাংশে। মানুষের মুখের ভাষা এখন ট্রাম্পের এই আগ্রাসী নীতির বিরুদ্ধে কথা বলতে শুরু করেছে।

ইরানের সাথে যুদ্ধ আর মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা নিয়েও মার্কিনীরা ট্রাম্পের ওপর বেশ ত্যক্ত। ৬৭ শতাংশ মানুষ ইরানের সাথে যুদ্ধে ট্রাম্পের ভূমিকার ঘোর বিরোধী। এমনকি দেশের ৬১ শতাংশ মানুষই মনে করেন, ইরানের বিরুদ্ধে আর কোনো সামরিক পদক্ষেপ নেয়া একদমই উচিত হবে না। ডেমোক্র্যাট আর নিরপেক্ষ ভোটারদের বিশাল অংশ তো বটেই, এমনকি খোদ রিপাবলিকানদের মধ্যেও কিছু মানুষ এখন যুদ্ধংদেহী মনোভাবের চেয়ে স্থিতিশীলতাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। অর্থনীতির পর এই যুদ্ধ আর নিরাপত্তার ইস্যুটিই এখন ভোটারদের কাছে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

যদিও রিপাবলিকানদের ৮৩ শতাংশ এখনো ট্রাম্পের সাথে আছেন, কিন্তু নিজের দলের ভেতরেই সমর্থন ৪ শতাংশ কমে যাওয়াটা ভবিষ্যতের জন্য ভালো লক্ষণ নয়।

তবে সব নেতিবাচক খবরের মাঝেও ট্রাম্পের জন্য এক চিলতে স্বস্তির রেখা আছে ভোটার আইডি কার্ড নিয়ে। মার্কিনীরা এখনো মনে করেন যে ভোট দিতে গেলে সরকারের দেয়া ফটো আইডি আর নাগরিকত্বের প্রমাণ থাকা জরুরি। এই একটি জায়গায় ট্রাম্প আর রিপাবলিকানদের নীতির সাথে জনগণের বিশাল এক অংশের মিল পাওয়া গেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, শুধু আইডি কার্ডের সমর্থন দিয়ে কি তেলের দাম আর বাজারের আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব? মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানরা তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা টিকিয়ে রাখতে পারবে কি না, তা এখন সুতোর ওপর ঝুলছে।

কারণ জরিপ বলছে, দুই-তৃতীয়াংশ মার্কিনীই মনে করছেন ট্রাম্পের যুক্তরাষ্ট্র আসলে ভুল পথে হাঁটছে। ট্রাম্পের ব্যক্তি ইমেজ এখন তার দ্বিতীয় মেয়াদের সর্বনিম্ন স্তরে গিয়ে পৌঁছেছে, যা রিপাবলিকান প্রার্থীদের জন্য এক বিশাল সতর্ক সঙ্কেত।

সূত্র : দ্য গার্ডিয়ান