সরকারের বাস্তবমুখী পদক্ষেপে গতি ফিরছে অর্থনীতিতে

বাংলাদেশের অর্থনীতি যে চাপের মুখে রয়েছে, তা মূলত সামগ্রিক ও বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে। এটি পুরোপুরি অভ্যন্তরীণ নয়। তবে ইরান-ইসরাইল যুদ্ধের কারণে দেশে জ্বালানি তেলের যে সঙ্কট তৈরি হয়েছিল, সরকার তা এখন পর্যন্ত ভালোভাবেই সামাল দিয়েছে বলে মনে হচ্ছে।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
অতিবৃষ্টিতে কৃষকদের যে ফসল নষ্ট হয়েছে, তাদের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে তিন মাসের সহায়তা দেয়ার কথা বলা হয়েছে
অতিবৃষ্টিতে কৃষকদের যে ফসল নষ্ট হয়েছে, তাদের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে তিন মাসের সহায়তা দেয়ার কথা বলা হয়েছে |বাসস

জ্বালানি তেলের সঙ্কট মোকাবিলা, রফতানিকারকদের জন্য কম সুদের ঋণ চালু, কৃষিভিত্তিক শিল্পে অগ্রাধিকারসহ সরকারের বাস্তবমুখী নানা উদ্যোগে বাণিজ্য খাতসহ সামগ্রিক অর্থনীতিতে গতি ফিরছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর প্রায় আড়াই মাসের মধ্যেই ব্যবসাবান্ধব ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করায় বড় ধরনের অর্থনৈতিক সঙ্কট থেকে মুক্তি পেয়েছে বাংলাদেশ।

ইরান-ইসরাইল যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সঙ্কট দেখা দেয়। এর প্রভাব পড়ে বাংলাদেশেও। তবে শুরু থেকেই সরকার জ্বালানি তেলে ভর্তুকি দেয় এবং মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের উদ্যোগ নেয়। দ্রুত পদক্ষেপের ফলে চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত তেল আমদানি করা সম্ভব হয়েছে। ফলে কোনো জটিলতা ছাড়াই ভোক্তাদের চাহিদা অনুযায়ী তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। এর প্রভাব পড়েছে দেশের সামগ্রিক উৎপাদন ব্যবস্থায়। জ্বালানি সঙ্কটের কারণে কোনো শিল্প-কারখানার উৎপাদন বন্ধ করতে হয়নি।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাদা দলের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মোর্শেদ হাসান খান বলেন, সরকার সতর্কতার সাথে জ্বালানি সঙ্কট সমাধানের চেষ্টা করেছে। শিল্প-কারখানায় জ্বালানি তেল সরবরাহ নিশ্চিত করেছে, যাতে উৎপাদন বন্ধ না হয়। পাশাপাশি বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি আমদানির জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টাও চালিয়ে গেছে। যার সুফল আমরা এখন পাচ্ছি। এটিকে আমরা তারেক রহমান ‘ক্যারিশমা’ বলতে পারি।

এদিকে রফতানিকারকদের জন্য বন্ধ থাকা কম সুদের প্রি-শিপমেন্ট ঋণ পুনরায় চালু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ১০ হাজার কোটি টাকার রফতানি সহায়ক প্রাক-অর্থায়ন তহবিল থেকে এ খাতে পাঁচ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।

ব্যাংকগুলো দুই শতাংশ সুদে এ তহবিল নিয়ে গ্রাহক পর্যায়ে সর্বোচ্চ পাঁচ শতাংশ সুদে ঋণ বিতরণ করবে। রফতানি পণ্য জাহাজীকরণের আগের ব্যয় মেটাতে ব্যবসায়ীরা এ ঋণ নিতে পারবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এ সিদ্ধান্তে রফতানিকারকদের মধ্যে ইতিবাচক সাড়া দেখা গেছে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, কম সুদে ঋণ পাওয়ায় দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে রফতানি বাণিজ্যে গতি বাড়বে। পুঁজির সঙ্কট কমলে বৈশ্বিক মন্দার মধ্যেও শ্রমিকদের নিয়মিত বেতন-ভাতা দেয়া সহজ হবে। এতে শ্রমিক অসন্তোষও কমবে।

এদিকে, বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্প-কারখানা পুনরায় চালুর মাধ্যমে কর্মসংস্থান বাড়াতে কম সুদে ঋণ সহায়তা দিতে বিশেষ পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠনের পরিকল্পনাও করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে, সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. মো: কবির আহাম্মদের নেতৃত্বে ১৯ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে বন্ধ কারখানা পুনরায় চালুর জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক ও নীতিগত সহায়তা নির্ধারণ করে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো: নাজমুল হোসাইন বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি যে চাপের মুখে রয়েছে, তা মূলত সামগ্রিক ও বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে। এটি পুরোপুরি অভ্যন্তরীণ নয়। তবে ইরান-ইসরাইল যুদ্ধের কারণে দেশে জ্বালানি তেলের যে সঙ্কট তৈরি হয়েছিল, সরকার তা এখন পর্যন্ত ভালোভাবেই সামাল দিয়েছে বলে মনে হচ্ছে।

তিনি বলেন, সম্প্রতি দেশে অতিবৃষ্টিতে কৃষকদের যে ফসল নষ্ট হয়েছে, তাদের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে তিন মাসের সহায়তা দেয়ার কথা বলা হয়েছে। এটিও ইতিবাচক উদ্যোগ। এখন পর্যন্ত অর্থনীতির জন্য সরকার যে সিদ্ধান্তগুলো নিয়েছে, সেগুলো ইতিবাচক মনে হচ্ছে। নবগঠিত সরকারকে সমালোচনা করার মতো কিছু আমরা এখনো পাইনি।

বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর রফতানিমুখী খাতের জন্য দ্রুত ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পাঁচ শতাংশ সুদে পাঁচ হাজার কোটি টাকার এ তহবিল ব্যবসায়ীদের জন্য বেশ সহায়ক হবে এবং এতে রফতানি অনেক বাড়বে।’

এদিকে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ, পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ অথরিটি এবং মহেশখালী সমন্বিত উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ একটি যৌথ ১৮০ দিনের পরিকল্পনা তার কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান।

জাতীয় সংসদে বুধবার (২৯ এপ্রিল) সংসদ সদস্য মো: আবুল কালামের এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৮০ দিনের পরিকল্পনার মাধ্যমে স্বল্পমেয়াদে বিনিয়োগ ও ব্যবসাবান্ধব গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও অবকাঠামোগত পদক্ষেপসমূহ এগিয়ে নেয়া হবে। যার মাধ্যমে বিনিয়োগ বৃদ্ধির ভিত্তি শক্তিশালী হবে।

এছাড়াও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উত্তরবঙ্গকে একটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করছেন। এ অঞ্চলের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে শিল্পায়ন বৃদ্ধি এবং এটিকে অ্যাগ্রো-প্রসেসিং হাবে পরিণত করার পরিকল্পনা রয়েছে তার।

স্থানীয় সম্পদ ব্যবহার করে উৎপাদনশীলতা ও কর্মসংস্থান বাড়ানোই এ উদ্যোগের লক্ষ্য। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য গত ১৪ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ফল, দুগ্ধ, খাদ্য ও পানীয় এবং পোলট্রি খাতের শীর্ষ উদ্যোক্তাদের সাথে একাধিক বৈঠক করেছেন তিনি। বৈঠকে মোট ১৬ জন ব্যবসায়ী নেতা অংশ নেন।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে আমরা ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা নির্বাচনের আগে সাক্ষাৎ করেছিলাম। তখন তিনি সরকার গঠন করলে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরির আশ্বাস দিয়েছিলেন। জ্বালানি তেলের সঙ্কট সমাধান ও প্রি-শিপমেন্ট ঋণ চালু তারই প্রতিফলন।

সূত্র : বাসস