ফারাক্কা বাঁধ প্রসঙ্গে রিজভী

ভারতের মনে বাংলাদেশ নিয়ে প্রকৃত বন্ধুত্ব ছিল না

প্রতিবেশীদের সাথে আমাদের সৎ প্রতিবেশীসুলভ সুসম্পর্ক থাকবে, কিন্তু সেটা হতে হবে সমান মর্যাদার ভিত্তিতে। ‘কী দরকার ছিল এই ফারাক্কা বাঁধের?’- এই প্রশ্ন তো আসতে পারে। সব কথা, চুক্তি, নানা কথা আছে। কিন্তু প্রথমে যদি এই প্রশ্ন আসে যে, কেন আপনারা এটা পরীক্ষামূলকভাবে চালু করতে গেলেন? কেন আপনারা ফারাক্কা ব্যারেজ করতে গেলেন? কী দরকার ছিল আপনাদের?

অনলাইন প্রতিবেদক
আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী
আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী |নয়া দিগন্ত

শুধুমাত্র কলকাতা পোর্ট বা কলকাতা বন্দরের নাব্যতা রক্ষা করার জন্য ভারত সরকার ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ করেছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী।

ভারতের উদ্দেশে তিনি বলেছেন, বাংলাদেশকে নাকি আপনারা বন্ধু মনে করেন, এ দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে নাকি আপনারা অবদান রেখেছেন। রেখেছেন, সত্যি কথা। কিন্তু আপনাদের অন্তরে তো তাহলে প্রকৃত ভালোবাসা, প্রকৃত বন্ধুত্ব ছিল না। তিন বছর, সাড়ে তিন বছর যেতে না যেতেই আপনারা গঙ্গার উপর একটা বাঁধ দিয়ে দিলেন, যে বাঁধে আমাদের ভয়ঙ্কর রকমের পরিবেশগত ও ইকোলজিক্যাল প্রতিক্রিয়া হচ্ছে। এভাবে একটা দেশের ক্ষতি করে দেবেন?

আজ শনিবার রমনা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে ফারাক্কা লং মার্চ দিবস উপলক্ষে আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। আলোচনা সভার আয়োজন করে বিএনপি।

রিজভী বলেন, নিশ্চয়ই আমাদের প্রতিবেশীদের সাথে সৎ প্রতিবেশীসুলভ সুসম্পর্ক থাকবে, কিন্তু সেটা হতে হবে সমান মর্যাদার ভিত্তিতে। ‘কী দরকার ছিল এই ফারাক্কা বাঁধের?’- এই প্রশ্ন তো আসতে পারে। সব কথা, চুক্তি, নানা কথা আছে। কিন্তু প্রথমে যদি এই প্রশ্ন আসে যে, কেন আপনারা এটা পরীক্ষামূলকভাবে চালু করতে গেলেন? কেন আপনারা ফারাক্কা ব্যারেজ করতে গেলেন? কী দরকার ছিল আপনাদের?

ভারতের বেশ কয়েকজন প্রকৌশলির কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ভারতের বিখ্যাত ইঞ্জিনিয়ার, তার নাম হচ্ছে কপিল ভট্টাচার্য। এই কপিল ভট্টাচার্য এটার যে বিরূপ প্রভাব হবে-শুধু বাংলাদেশে নয়, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে- তা নিয়ে বলেছিলেন। এই ফারাক্কা ব্যারেজের কথা, এই গঙ্গার উপর ব্যারেজের কথা অনেক আগে থেকে চলছিল। ব্রিটিশ আমলের শেষ দিক থেকে কথাটা উঠছিল যে গঙ্গার উপর একটা ব্যারেজ করতে হবে। এটা করতে ৫০-এর দশক, ৬০-এর দশক থেকে উদ্যোগ শুরু হয়েছে। তখনই তাদের দেশের চিফ ইঞ্জিনিয়ার কপিল ভট্টাচার্য বলেছেন, ‘এটা সর্বনাশ হবে’ এবং তিনি প্রতিবাদ করেছেন। যেটা জানা যায়, একটা পর্যায়ে শেষের দিকে উনি পদত্যাগ করেছেন- এটা শুনেছি। কিন্তু নীতিনির্ধারকরা এ কথা শোনেননি ‘

“শুধু কি তাই? বিহারের বর্তমান সরকারের আগের সরকার, নীতিশ কুমারের সরকার; তিনি বলেছেন, ‘ফারাক্কা বাঁধ ভেঙে দাও।’ ভারতের ভেতর থেকেই বলা হয়েছে যে এটা শুধু বাংলাদেশের ওপরই বিরূপ প্রভাব ফেলছে না বা ক্ষতি করছে না, এটা ভারতকেও প্রভাবিত করছে, বিরূপ প্রভাব ফেলছে। বিহার ডুবে যাচ্ছে, আসামে বন্যা হচ্ছে, একটা ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। নীতিশ কুমার স্পষ্টভাবে তার সেই বক্তব্য দিয়েছেন, আপনারা এখনো তা বিভিন্ন জায়গায় দেখবেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ‘ফারাক্কা বাঁধ তুলে ফেলো, সরিয়ে ফেলো, ভেঙে ফেলো।’ কিন্তু কেউ কর্ণপাত করেনি।”

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব বলেন, আমাদের একদিকে লবণাক্ততা বাড়ছে। আমরা তো নিজেই ওই অঞ্চলের লোক, আমরা দেখেছি। আমরা কোনোদিন শুনিনি যে বরেন্দ্র এলাকায় মাটির নিচ থেকে যে পানি ওঠে, তার সাথে আর্সেনিক পাওয়া যাবে। আর্সেনিক হচ্ছে একটা বিষাক্ত রাসায়নিক দ্রব্য এবং এই রাসায়নিকের কারণে ভয়ঙ্কর অসুস্থতার জন্ম দিচ্ছে এই অঞ্চলে, এই পদ্মা নদীর দুই পাড়ে। একদিকে কুষ্টিয়া, যশোর- এই অঞ্চল; আর আরেকদিকে হচ্ছে এর যে পূর্ব পাড়-এই রাজশাহী, রংপুর, পাবনা, সিরাজগঞ্জ অঞ্চলে ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। তাহলে, কেবল কলকাতা বন্দরের নাব্যতা রক্ষা করার জন্য আপনারা একটা দেশের নানাভাবে এর যে প্রাণবৈচিত্র্য, এর যে নদীর বৈচিত্র্য, সেটাকে আপনারা ধ্বংস করে দেবেন?

রিজভী বলেন, আপনি যদি একটা সাপের মুখকে চেপে রাখেন, তো সাপ কী হবে? নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে ছটফট করবে। যতই বিষাক্ত হোক, ছটফট করতে করতে সে মারা যাবে। একজন গ্রামীণ লোক এই কথা বলেছে, আমি বিবিসির একটা প্রতিবেদনে যেন পড়েছি। সে বলছে যে, ঠিক তেমনিভাবে নদীর মুখ যদি বন্ধ করে দেন, গতিপথ যদি বন্দি করেন বা ডাইভার্ট করেন, তাহলে নদীটা মরে যাবে আল্টিমেটলি। তাতে কারো কোনো লাভ হবে না, ভারতেরও লাভ হবে না।