ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে পরিবর্তন এলেও শ্রমজীবী মানুষের জীবনমানের কোনো উন্নতি হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য সচিব ও রংপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আখতার হোসেন।
তিনি বলেন, দেশের অধিকাংশ মানুষ শ্রমের সাথে যুক্ত থাকলেও তারা এখনো ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত।
শুক্রবার (১ মে) শাহবাগে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস উপলক্ষে আয়োজিত জাতীয় শ্রমিক শক্তির সমাবেশে এসব কথা বলেন তিনি। সমাবেশটি আয়োজন করে এনসিপির শ্রমিক উইং জাতীয় শ্রমিক শক্তি।
আখতার হোসেন বলেন, ‘বর্তমানে শ্রমিকদের মজুরি এতটাই কম যে এই দুর্মূল্যের বাজারে তারা পরিবার নিয়ে ঠিকভাবে চলতে পারছেন না। ফলে তাদের সন্তানরা শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম শ্রমের চক্রে আবদ্ধ হয়ে পড়ছে।’
তিনি বলেন, ‘রিকশাচালক বা হকারদের মতো অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকরা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে না থাকায় তাদের অধিকার নিশ্চিত হচ্ছে না।’
দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন নাজুক অবস্থায় রয়েছে। ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম ও লুটপাট এর অন্যতম কারণ। ব্যাংক রেজুলেশন আইনের মাধ্যমে ঋণখেলাপিরা অল্প পরিমাণ অর্থ ফেরত দিয়েই পুনরায় মালিকানা ফিরে পাচ্ছে, যা কার্যত দুর্নীতিকে বৈধতা দিচ্ছে।
তিনি বলেন, এই অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ছে শ্রমিক ও নিম্নআয়ের মানুষের ওপর। বিদেশে অর্থ পাচারের ফলে বিনিয়োগ কমছে, কর্মসংস্থান সঙ্কুচিত হচ্ছে এবং দ্রব্যমূল্য বাড়ছে। এতে শ্রমিকরা ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
শ্রমিকদের সামাজিক মর্যাদার বিষয়টিও তুলে ধরে আখতার বলেন, অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিকদের সম্মান দিয়ে কথা বলা হয় না। এখনো কিছু পেশাজীবী মানুষ সামাজিক বৈষম্যের শিকার হন, যা একটি সভ্য সমাজে গ্রহণযোগ্য নয়।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রশাসনিক, আইনগত ও সাংবিধানিক কাঠামোর পরিবর্তনের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। আখতার বলেন, শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, মর্যাদা ও অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
সদ্য এনসিপিতে যোগদানকৃত আপ বাংলাদেশের সাবেক আহ্বায়ক আলী আহসান জুনায়েদ বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শ্রমিকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকলেও তাদের ভাগ্যের উন্নয়ন হয়নি, বরং আরও অবনতি হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, শহীদ শ্রমিকদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে বর্তমান সরকার কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়নি।
তিনি বলেন, জুলাইয়ে রিকশাচালকরা আহতদের হাসপাতালে পৌঁছে দিয়েছেন, ট্রাকচালকরা সড়ক অবরোধ করেছেন। অথচ আজ তাদের ন্যায্য দাবি পূরণে কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। সরকারকে শ্রমিকদের সাথে সরাসরি আলোচনা করে যুগোপযোগী পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানান তিনি।
এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক ও নোয়াখালী-৬ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল হান্নান মাসুদ বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় যাওয়ার সময় শ্রমিক-ছাত্রদের ব্যবহার করে, কিন্তু ক্ষমতায় যাওয়ার পর তাদের ভুলে যায়।
তিনি দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর আইন প্রণয়নে ব্যর্থতার সমালোচনা করে বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে মানুষকে ভালো আইনের স্বপ্ন দেখানো হলেও বাস্তবে তা প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
তিনি আরো বলেন, দেশের ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ মানুষ সরাসরি শ্রমের সাথে যুক্ত এবং তাদের মর্যাদা নিশ্চিত না করলে রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। বক্তব্যের শেষে তিনি জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহত শ্রমজীবী মানুষদের স্মরণ করেন।
সমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে জাতীয় শ্রমিক শক্তির আহ্বায়ক মাজহারুল ইসলাম ফকির বলেন, শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, সামাজিক মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত না হলে কোনো গণআন্দোলনের লক্ষ্য পূরণ হবে না। এজন্য রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক দলগুলোকে কার্যকর ও আন্তরিক পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানান তিনি।



