যথাযোগ্য মর্যাদা, বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা ও আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে আগামীকাল মঙ্গলবার আগারগাঁওস্থ কোস্ট গার্ড সদর দফতরে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের ৩১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপিত হবে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি থাকবেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। এছাড়াও আমন্ত্রিত অতিথিদের মধ্যে উচ্চপদস্থ সামরিক ও অসামরিক অতিথিবৃন্দ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের কর্মকর্তা, নাবিক এবং অসামরিক ব্যক্তিবর্গের বীরত্ব ও সাহসিকতাপূর্ণ কাজের জন্য চারজনকে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড পদক, চারজনকে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড (সেবা) পদক, তিনজনকে প্রেসিডেন্ট কোস্ট গার্ড পদক এবং তিনজনকে প্রেসিডেন্ট কোস্ট গার্ড (সেবা) পদক পদক প্রদান করবেন।
সোমবার (২৭ এপ্রিল) কোর্ড গার্ডের এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে একথা জানানো হয়েছে।
এতে আরো বলা হয়েছে, ১৯৯৪ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া দেশের সুবিশাল উপকূলীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা ও সম্ভাবনাকে সুরক্ষিত করতে আলাদা বাহিনী গঠনের প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করে এই বাহিনীর ‘আইনি ভিত্তি’ প্রণয়ন করেন। তার ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও দূরদর্শী নেতৃত্বের মাধ্যমে ১৯৯৫ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি এ বাহিনীর গোড়াপত্তন হয় এবং তার প্রত্যক্ষ উপস্থিতিতে ১৯৯৫ সালের ১৯ ডিসেম্বর শুভ উদ্বোধনের মাধ্যমে এ বাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে। জনগণের প্রত্যাশা ও দূরদর্শী নেতৃত্বের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এ বাহিনী, প্রায় তিন দশক ধরে অদম্য দেশপ্রেম, অটুট নিষ্ঠা, প্রশ্নাতীত পেশাদারিত্ব ও অসীম সাহসিকতায় উপকূল ও নদীতীরবর্তী মানুষের নিরাপত্তা ও আস্থার প্রতীক হিসেবে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে।
ঐতিহাসিক এই পথচলায় বর্তমানে চারটি জোনে বিভক্ত হয়ে এই বাহিনী- ৬৩টি স্টেশন/আউটপোস্ট, ২৮টি জাহাজ এবং ১৩৮টি দ্রুতগামী বোটের মাধ্যমে দেশের বিস্তীর্ণ সমুদ্র ও ২১ জেলার উপকূল ও নদীতীরবর্তী অঞ্চলে নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ সংরক্ষণ, বন্দরসমূহের নিরাপত্তা, ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের সুরক্ষা, মাদক ও চোরাচালান প্রতিরোধ, মানবপাচার রোধ, দুর্যোগকালীন উদ্ধার ও সহায়তা এবং দস্যুতা দমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণে ধারাবাহিক অভিযানের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড বিগত বছরে ২০ হাজার ১৫২ কোটি টাকা মূল্যের অবৈধ জাল ও জাটকা জব্দ করেছে এবং উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অবৈধ জালের কারখানা সমূলে ধ্বংস করছে। এর ফলে প্রায় ১২০ কোটি ৯১ লাখ কেজি মাছ রক্ষা পেয়েছে, যার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৬০ হাজার ৪৫৮ কোটি টাকা। এছাড়া, উপকূলীয় অগভীর পানিতে সামুদ্রিক ইকোসিস্টেম বিনষ্টকারী অবৈধ আর্টিসনাল ট্রলিং বোটের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড কার্যকর, দৃঢ় ও অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে। মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণে ধারাবাহিক সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড দ্বিতীয়বারের মতো ‘মৎস্য পদক (রৌপ্য)’ অর্জন করেছে।
দেশের অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত চট্টগ্রাম বন্দরসহ দেশের সকল বন্দর ও তৎসংলগ্ন বহির্নোঙ্গর এলাকায় কোস্ট গার্ডের সক্রিয় উপস্থিতি বন্দরের কার্যক্রমকে ত্বরান্বিত করেছে এবং আন্তর্জাতিক রেটিং উন্নত করেছে। এর পাশাপাশি বহির্নোঙ্গরে সংঘটিত অগ্নিকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে কোস্ট গার্ডের দক্ষতা ও সাহসিকতার স্বীকৃতিস্বরূপ, আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশন (আইএমও) থেকে বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একমাত্র সংস্থা হিসেবে ‘লেটার অফ কমেনডেশন’ অর্জিত হয়েছে। এছাড়াও আধুনিকতা, পেশাদারিত্ব ও আন্তর্জাতিক মানসম্মত প্রশিক্ষণ প্রদানের স্বীকৃতিস্বরূপ কোস্ট গার্ড প্রশিক্ষণ ঘাঁটি ‘অগ্রযাত্রা’ আইএসও সনদ অর্জন করেছে। ফলশ্রুতিতে বহির্বিশ্বে বিভিন্ন দেশ ও সংস্থার সাথে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের পারস্পরিক বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক পেয়েছে অনন্য মাত্রা। পারস্পরিক সম্পর্কের প্রতিফলনস্বরূপ ইতোমধ্যে অস্ট্রেলিয়া, ভারত, ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া, মিয়ানমার ও শ্রীলঙ্কার সাথে পারস্পরিক দ্বিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।
বিগত বছরে পরিচালিত সর্বমোট ৫৫ হাজার ৮৪১টি অভিযানের মাধ্যমে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড ২৪৯টি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র ও ৬ হাজার ৮০২টি গোলাবারুদসহ ৫৯০ জন দুষ্কৃতিকারী আটক এবং ২৯৫ কোটি টাকার মাদকদ্রব্য জব্দসহ, ৬৭০ জন মাদক পাচারকারীদের গ্রেফতার করা হয়েছে। চোরাচালান ও পরিবেশবিরোধী কার্যক্রম প্রতিরোধে ২১৫ কোটি টাকার অবৈধ পণ্য জব্দ, ২৭৬টি ড্রেজার ও বাল্কহেড জব্দ করা হয়েছে। এসব অভিযানে ৪ কোটি টাকার অধিক জরিমানা আদায়পূর্বক রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা প্রদান করা হয়েছে। একইসাথে উদ্ধার অভিযানে ১ হাজার ৬২২ জনকে জীবিত উদ্ধার, মানবপাচারের ভুক্তভোগীদের উদ্ধার ও পাচারকারী আটক এবং পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে বাংলাদেশী জেলেদের নিরাপদে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করা হয়েছে।
এছাড়া, বর্তমান সরকারের প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় সুন্দরবনে ডাকাত নির্মূলে ‘অপারেশন রিস্টোর পিস ইন সুন্দরবন’ ও ‘অপারেশন ম্যানগ্রোভ শিল্ড’ নামে দুটি পৃথক অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুদসহ, চোরাচালানের বিরুদ্ধে কোস্ট গার্ড অবিরাম অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। কোস্ট গার্ড জরুরি সেবা নম্বর ১৬১১১-এর মাধ্যমে, উপকূলবাসী, পর্যটক ও বিপদ্গ্রস্ত নৌযান নিয়মিত ও অতিদ্রুত সহায়তা পাচ্ছে।
সময়ের পরিক্রমায় ও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার নিপুণ বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডকে কার্যকর, শক্তিশালী ও সুদক্ষ বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলে দেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রা এগিয়ে নিতে এ বাহিনীর প্রতিটি সদস্য উজ্জীবিত ও বদ্ধপরিকর।



