স্বপদে বহাল থেকেই জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির (ইউএনজিএ) দায়িত্ব পালন করতে যাচ্ছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। এক্ষেত্রে সাধারণ পরিষদের গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশন চলাকালে তিনি ছুটিতে থাকবেন।
সেই হিসেবে আগামী সেপ্টেম্বর মাসে নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের বার্ষিক অধিবেশনের সময় কয়েক সপ্তাহের জন্য ছুটিতে যেতে পারেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানতে পেরেছে বিবিসি বাংলা।
তবে বিষয়টি নিয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু না জানালেও একইসাথে দুই দায়িত্ব পালনের বিষয়ে ইঙ্গিত দিয়েছেন খলিলুর রহমান।
বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশে ফিরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, ‘এর প্রিসিডেন্টস (নজির) আছে।’
যদিও এর আগে, জাতিসঙ্ঘ আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে খলিলুর রহমান জানিয়েছিলেন যে, সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হলে তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পদ থেকে এক বছরের জন্য ছুটি নেবেন।
মন্ত্রী থাকা অবস্থায় নজিরবিহীন এমন ছুটির পরিকল্পনা নিয়ে কর্মকর্তাদের অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন।
কিন্তু সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর এখন জানা যাচ্ছে যে, তিনি দু’টি দায়িত্বই পাশাপাশি পালন করবেন।
বৃহস্পতিবার দেশে ফিরে সন্ধ্যায় তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠকেও অংশ নেন।
সেই বৈঠকে জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় খলিলুর রহমানকে অভিনন্দন জানানো হয়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারের মন্ত্রিসভায় থেকে জাতিসঙ্ঘের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে বিধিগতভাবে কোনো বাধা নেই। অতীতে বিভিন্ন দেশে এ ধরনের নজির রয়েছে বলেও জানা যাচ্ছে।
‘এমনকি চার দশক আগে বাংলাদেশ থেকে যিনি প্রথমবার সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন, সেই হুমায়ূন রশিদ চৌধুরী নিজেও এরশাদ সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পদে বহাল থেকেই জাতিসঙ্ঘের দায়িত্ব পালন করেছেন," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন জাতিসঙ্ঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন দফতরের সাবেক পরিচালক ড. সেলিম জাহান।
ফলে বিএনপি সরকারও খলিলুর রহমানকে স্বপদে বহাল রাখার ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা দেখছে না।
‘যদি ডেডিকেটেডলি উনার এই (জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির) কাজটি করতে হয়, তাহলে উনাকে সময়টা দিতেই হবে ওখানে। বাট দ্যাট ডাস নট মিন যে, উনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকতে পারবেন না’, বুধবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের বলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন বলে জানান তিনি।
তবে একইসাথে দুই দায়িত্ব অর্থাৎ মন্ত্রী থাকা অবস্থায় অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে খলিলুর রহমান যদি জাতিসঙ্ঘে কাজ করতে চান, সেক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী আপত্তি করবেন না বলে বিবিসি বাংলাকে ইঙ্গিত দিয়েছেন বিএনপির সিনিয়র নেতারা।
কীভাবে সামলাবেন দুই দায়িত্ব?
গত মঙ্গলবার নিউইয়র্কে জাতিসঙ্ঘ সদরদফতরে আয়োজিত ভোটাভুটিতে সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদে নির্বাচিত হন খলিলুর রহমান।
সাইপ্রাসের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বিশেষ দূত আন্দ্রেয়াস এস কাকোরিসকে আট ভোটে পরাজিত করে এক বছরের জন্য ওই দায়িত্ব পান তিনি।
এই খবর ছড়িয়ে পড়ার পর পররাষ্ট্রমন্ত্রীর খলিলুর রহমানের বহাল থাকা-না থাকা নিয়ে নানান আলোচনা ও জল্পনা-কল্পনা হতে দেখা যায়।
নতুন দায়িত্ব পালনে তিনি এক বছরের জন্য ছুটিতে যেতে পারেন বলে খবরও ছড়িয়ে পড়ে।
মূলত গত মে মাসে জাতিসঙ্ঘের এক মতবিনিময় অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছুটি নেয়ার পরিকল্পনা জানানোর পর থেকেই বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা ও কৌতুহল লক্ষ্য করা যাচ্ছিলো।
কিন্তু পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানাচ্ছেন যে, সেই পরিকল্পনা থেকে সরে এসে খলিলুর রহমান এখন একইসাথে দুই দায়িত্ব পালন করবেন।
কিন্তু সেটি কীভাবে সম্ভব হবে?
ড. সেলিম জাহান বলেন, এটা অসম্ভব কিছু নয়, কারণ জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্বটি সার্বক্ষণিক কোনো দায়িত্ব নয়। মূলত সভাপতির দায়িত্বটা বর্তায় যখন সাধারণ পরিষদ অধিবেশন হয়।
অতীতের ধারাবাহিকতায়, এ বছরের সেপ্টেম্বরে জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের বার্ষিক অধিবেশন শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
সেখানে সভাপতির প্রধান কাজ হবে সাধারণ পরিষদের অধিবেশন পরিচালনা করা এবং নির্মোহ ও নিরপেক্ষভাবে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আলোচনায় সমন্বয় করা।
‘প্রথম অধিবেশন চলাকালে সভাপতিকে অবশ্যই উপস্থিত থাকতে হয়। ফলে খলিলুর রহমানকেও সেসময় কয়েক সপ্তাহের জন্য নিউইয়র্কে অবস্থান করতে হবে।’
সভাপতির পাশাপাশি জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদের প্রতিটি অধিবেশনের জন্য ডজনেরও বেশি সহ-সভাপতি নির্বাচন করা হয়।
সভাপতির অনুপস্থিতিতে তাদের মধ্য থেকে একজন অধিবেশনে সভাপতিত্ব করতে পারেন।
‘এটা অনেকটা আমাদের সংসদের মতো ব্যাপার। স্পিকার অনুপস্থিত থাকলে ডেপুটি স্পিকার যেভাবে কাজ চালিয়ে নেন, ওইখানেও সেটা করা হয়।’
ফলে পরের অধিবেশনগুলোতে খলিলুর রহমান চাইলে যোগ নাও দিতে পারেন বলে জানান জাতিসঙ্ঘের সাবেক এই কর্মকর্তা।
এদিকে, সাধারণ পরিষদের অধিবেশন চলাকালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী যখন ছুটিতে থাকবেন, তখন প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত কাজকর্ম চালিয়ে নিবেন বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
এক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির তাকে সহযোগিতা করবেন বলেও জানান তারা।
বেতন দিতে হবে বাংলাদেশকেই
সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে জাতিসঙ্ঘের পক্ষ থেকে বিশেষ কিছু কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক সুযোগ-সুবিধা ভোগ করবেন খলিলুর রহমান।
সেগুলোর মধ্যে রয়েছে নিউইয়র্ক সিটিতে জাতিসঙ্ঘ সদরদফতরে একটি নির্দিষ্ট কার্যালয়।
ড. জাহান বলেন, ‘এটা জিএ বা সাধারণ পরিষদের প্রেসিডেন্টের অফিস নামে পরিচিত। সেখানে কাজকর্ম পরিচালনার জন্য বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারি থাকবেন। উনার একজন একান্ত সচিবও থাকবেন।’
জাতিসঙ্ঘের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা হিসেবে খলিলুর রহমান কোথাও সফরে গেলে সেখানে বিশেষ কূটনৈতিক প্রোটোকল এবং নিরাপত্তা পাবেন।
সেইসাথে, দাফতরিক কাজে ব্যবহারের জন্য গাড়িসহ যোগাযোগের আরো কিছু সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান।
তবে জাতিসঙ্ঘ মহাসচিবের মতো করে আলাদা বাসভবন বা আবাসন সুবিধা পাবেন না বলে জানা যাচ্ছে। এক্ষেত্রে জাতিসঙ্ঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনের কূটনৈতিক বাসভবন ব্যবহার করতে হবে খলিলুর রহমানকে।
এছাড়া দায়িত্ব পালনের জন্য জাতিসঙ্ঘের পক্ষ থেকে কোনো বেতনও পাবেন না তিনি। এক্ষেত্রে জাতিসঙ্ঘের নিয়ম হচ্ছে, সাধারণ পরিষদের সভাপতি যে দেশের নাগরিক, ওই দেশ তাকে একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের বেতন প্রদান করবে।
ফলে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে খলিলুর রহমানও সেই বেতন পাওয়ার কথা।
গত প্রায় এক বছর ধরে জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন জার্মানির সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যানালেনা বেয়ারবক।
এ কাজের জন্য তিনি জার্মান সরকারের কাছ থেকে প্রতিমাসে ১৩ হাজার ইউরোর মতো বেতন পান বলে গত বছরের সাংবাদিকদের জানায় দেশটির পররাষ্ট্র দফতর।
কতখানি গুরুত্বপূর্ণ এই পদ?
জাতিসঙ্ঘের মানব উন্নয়ন প্রতিবেদনের সাবেক মূখ্য লেখক ও পরিচালক ড. সেলিম জাহান বলছেন, আপাতদৃষ্টিতে এই পদের ভূমিকা আলঙ্করিক মনে হলেও এই পদের কতগুলো বৈশিষ্ট্য আছে।
‘মোটামুটিভাবে ১৯৩টি দেশ যেখানে সাধারণ পরিষদের সদস্য, যেখানে বিভিন্ন বিষয়ে বিতর্ক-আলোচনা হয়, কিন্তু সেটাকে একটা পথের দিকে বা একটা উপসংহারের দিকে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সভাপতির একটা বিশেষ ভূমিকা থাকে।’
বাংলাদেশের একজন নাগরিকের এই পদে বসাকে ‘গণতন্ত্রের বিজয়’ হিসেবে বর্ণনা করছে দেশটির সরকার।
‘এই বিজয় আমাদের যে অভূতপূর্ব গণতান্ত্রিক উত্তরণ হয়েছে, তার বিজয়’, বৃহস্পতিবার নিজ মন্ত্রণালয়ে ব্রিফিংয়ে বলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই পদ অত্যন্ত সম্মানের ও গুরুত্বপূর্ণ।
ড. জাহান বলেন, ‘এই পদ অত্যন্ত মর্যাদামূলক, কারণ মনে রাখতে হবে যে, ১৯০টি সদস্যের মধ্যে বেশিরভাগ দেশ বাংলাদেশের ওপর আস্থা রেখেছে...আমি মনে করি যে বাংলাদেশের যে অবস্থান এবং বাংলাদেশের নীতি-নেতৃত্ব সেটারই একটা প্রতিফলন।’
একই ধরনের মন্তব্য করেছেন সাবেক কূটনীতিক এম হুমায়ুন কবির।
হুমায়ুন কবির বলেন, ‘ভাবমূর্তির দিক থেকে অবশ্যই এটা প্রেস্টিজিয়াস (মর্যাদাপূর্ণ)। এটার জন্য হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়। কাজেই এটার একটা ভাবমূর্তিগত ইতিবাচকতা আছে, দেশের সম্মান রক্ষার্থে এটা গুরুত্বপূর্ণ।’
সভাপতি পদে প্রার্থিতার সময় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান তার ভিশন স্টেটমেন্টে ছয়টি লক্ষ্যের কথা জানিয়েছেন।
তার এই ভিশন স্টেটমেন্টের শিরোনাম, ‘রিস্টোরিং ট্রাস্ট, ম্যানেজিং ট্রান্সফরমেশন : এ ইউনাইটেড ন্যাশনস দ্যাট ডেলিভারস ফর অল।’
সভাপতি নির্বাচনের আগে দেয়া এই স্টেটমেন্টে খলিলুর রহমান জানিয়েছেন, শান্তি, নিরাপত্তা ও সকলের জন্য ন্যায়বিচার, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার(এসডিজিএস) অগ্রগতি ত্বরান্বিত করা এবং জলবায়ু পদক্ষেপ ও পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়ে কাজ করবেন তিনি।
একইসাথে, মানবিক সহায়তা কার্যক্রম, অভিবাসী ও শরণার্থী এবং মানবাধিকার, অন্তর্ভূক্তিমূলক উদ্ভাবনের আওতায় ডিজিটাল গভর্নেন্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ উদীয়মান প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ এবং জাতিসঙ্ঘের সংস্কার করার কথাও জানিয়েছিলেন।
শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে প্রতিরোধমূলক কূটনীতি, শান্তি বিনির্মাণ এবং বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষায় সমর্থন দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। বিবিসি



