অ্যান্টিবায়োটিক-উত্তর বিশ্ব : মহাবিপর্যয়ের মুখে সভ্যতা!

১৯২৮ সালে আলেকজান্ডার ফ্লেমিং যখন পেনিসিলিন আবিষ্কার করলেন, তখন থেকেই আধুনিক চিকিৎসার বৈপ্লবিক পরিবর্তন শুরু হয়।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধের কার্যকারিতা দিন দিন নষ্ট হচ্ছে
অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধের কার্যকারিতা দিন দিন নষ্ট হচ্ছে |সংগৃহীত

মানুষের চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে অন্যতম শ্রেষ্ঠ আবিষ্কার ছিল অ্যান্টিবায়োটিক। এক সময় যেসব অসুখে মানুষের মৃত্যু ছিল অবধারিত, সেইসব মরণব্যাধিকে খুব সহজে নিরাময়যোগ্য করে তুলেছিল এই ম্যাজিক ওষুধ। কিন্তু দিন বদলাচ্ছে, আর সাথে সাথে বদলে যাচ্ছে ব্যাকটেরিয়ার চরিত্রও। দশকের পর দশক ধরে আমরা যেসব ওষুধের ওপর নির্ভর করে বেঁচে আছি, সেগুলোর কার্যকারিতা এখন ফুরিয়ে আসছে।

বিশ্বজুড়ে সংক্রমণগুলোর চিকিৎসা করা দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে। একে বলা হচ্ছে ‘অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স’। সহজ কথায়, ব্যাকটেরিয়ারা এখন ওষুধের বিরুদ্ধে লড়াই করার ক্ষমতা অর্জন করে ফেলেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, প্রতি বছর প্রায় ১২.৭ লাখ মানুষ এই ওষুধ প্রতিরোধী সংক্রমণের কারণে প্রাণ হারাচ্ছে। আমরা কি তবে এমন এক ‘পোস্ট-অ্যান্টিবায়োটিক’ বা ‘অ্যান্টিবায়োটিক-পরবর্তী’ যুগে প্রবেশ করছি? এই যুগটি কি সামান্য ক্ষত কিংবা সাধারণ জ্বর আবারো অতীতের মতোই প্রাণসংহারী হয়ে উঠবে?

লিভারপুল স্কুল অফ ট্রপিক্যাল মেডিসিনের মলিকুলার মাইক্রোবায়োলজি বিষয়ের রিডার ডক্টর অ্যাডাম রবার্টস দ্য কনভারসেশনে এসব বিষয় তুলে ধরেছেন।

তিনি আরো লিখেছেন, এক শতাব্দী আগেও পৃথিবীর দশা ঠিক এমন ছিল। বাগান বা কৃষিকাজ করতে গিয়ে হাত কেটে যাওয়া, গলার ব্যথা কিংবা সন্তান জন্মদানের মতো সাধারণ ঘটনা থেকেও মারাত্মক সংক্রমণ ছড়িয়ে মানুষ মারা যেত। ১৯২৮ সালে আলেকজান্ডার ফ্লেমিং যখন পেনিসিলিন আবিষ্কার করলেন, তখন থেকেই আধুনিক চিকিৎসার বৈপ্লবিক পরিবর্তন শুরু হয়। তার আগে নিউমোনিয়া বা যক্ষ্মার মতো রোগ ছিল এক আতঙ্কের নাম। অ্যান্টিবায়োটিক আসার পর সেই দৃশ্যপট পাল্টে গেল। শুধু নিরাময় নয়, সিজারিয়ান অপারেশন, অঙ্গ প্রতিস্থাপন কিংবা ক্যান্সারের কেমোথেরাপির মতো জটিল চিকিৎসাগুলোও এই ওষুধের কারণে নিরাপদ করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু ফ্লেমিং ১৯৪৫ সালে নোবেল পুরস্কার নেয়ার সময় সাবধান করেছিলেন যে, এই ওষুধের ভুল ব্যবহার ব্যাকটেরিয়াকে শক্তিশালী করে তুলবে। আজ সেই আশঙ্কাই সত্যি হচ্ছে।

আমাদের শরীরে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ব্যাকটেরিয়া বসবাস করে, যাদের বলা হয় মাইক্রোবায়োম। এরা মূলত আমাদের হজম বা রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে। কিন্তু ব্যাকটেরিয়ারা অদ্ভুত রকমের অভিযোজন ক্ষমতায় পারদর্শী। সাড়ে তিন শ’ কোটি বছর ধরে পৃথিবীতে টিকে থাকা এই ক্ষুদ্র জীবগুলো খুব দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে এবং একে অপরের সাথে জিনের তথ্য আদান-প্রদান করতে পারে। ফলে কোনো একটি ব্যাকটেরিয়া যদি ওষুধের বিরুদ্ধে টিকে থাকার কৌশল শিখে নেয়, তবে সে সেই তথ্য বাকিদের মাঝে ছড়িয়ে দেয়। কিছু ব্যাকটেরিয়া আবার ওষুধের বিরুদ্ধে লড়াই করতে নিজেদের কোষের গঠন বদলে ফেলে কিংবা বিশেষ পাম্পের সাহায্যে ওষুধকে কোষ থেকে বের করে দেয়। এভাবে তারা তৈরি করে এক ‘সুপারবাগ’, যার বিরুদ্ধে সাধারণ অ্যান্টিবায়োটিক আর কাজ করে না।

এই বিপদের মূলে রয়েছে মানুষের অবিবেচনা আর রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সদিচ্ছার অভাব। অ্যান্টিবায়োটিক এখন মুড়ি-মুড়কির মতো ব্যবহৃত হচ্ছে। অনেক দেশে সামান্য সর্দি-কাশিতেও এসব ওষুধ দেয়া হয়, যদিও ভাইরাসজনিত রোগে অ্যান্টিবায়োটিকের কোনো ভূমিকা নেই। শুধু মানুষ নয়, গবাদি পশু এবং কৃষি খাতেও বিপুল পরিমাণ অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হচ্ছে, যা সরাসরি ব্যাকটেরিয়াকে শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে। ইউরোপের দেশগুলোতেই প্রতিবছর এ কারণে ৩৫ হাজার মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। ডাক্তাররা এখন এমআরএসএ বা সিআরই’র মতো এমন সব ব্যাকটেরিয়ার মুখোমুখি হচ্ছেন, যাদের দমানোর জন্য হাতে থাকা সবশেষ শক্তিশালী ওষুধগুলোও হার মেনে যাচ্ছে।

যদি এই পরিস্থিতি চলতেই থাকে, তবে আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়বে। সাধারণ একটা মূত্রনালীর সংক্রমণ রক্তে ছড়িয়ে গিয়ে প্রাণ কেড়ে নিতে পারে। সেপসিসের মতো জটিল অবস্থায় ডাক্তারদের করার কিছুই থাকবে না। সামান্য হাড়ের অপারেশন বা শরীরের কোনো ছোটখাটো অস্ত্রোপচার করাও হয়ে পড়বে অসম্ভব ঝুঁকির কাজ। পরিস্থিতি হবে অনেকটা অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কারের আগের যুগের মতো।

তবে সব আশাই এখনো ফুরিয়ে যায়নি। বিজ্ঞানীরা এখন ব্যাকটেরিওফেজ বা ব্যাকটেরিয়াকে গিলে খায় এমন সব বিশেষ ভাইরাস ব্যবহার করে ব্যাকটেরিয়া মারার উপায় খুঁজছেন। আবার সরাসরি ব্যাকটেরিয়াকে না মেরে তাদের আক্রমণ করার হাতিয়ারগুলো ভোঁতা করে দেয়ার চিকিৎসা নিয়েও গবেষণা চলছে। কিন্তু শুধু নতুন ওষুধ আবিষ্কার করলেই হবে না, হাতে থাকা ওষুধগুলোকে রক্ষা করাই হবে আসল রাজনৈতিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জ।

সূত্র : দ্য কনভারসেশন