দশ বছরের ছেলেকে কুকুর কামড়েছে। তাই ছেলেকে নিয়ে হন্তদন্ত হয়ে হাসপাতালে ঢুকছিলেন রুবি আক্তার। শ্রমজীবী রুবি আক্তার থাকেন মুন্সীগঞ্জ শহরে। কিন্তু হাসপাতালে এসে জানতে পারলেন জলাতঙ্কের কোনো ভ্যাকসিন নেই। কিনতে হবে বাইরে থেকে।
নিরূপায় রুবি আক্তার তখন টিকা কিনতে বাইরে গেলেন। ফিরে আসলেন এক ঘণ্টা পর।
‘ফার্মেসি থেকে বলল টিকার দাম ৯০০ টাকা। কিন্তু আমার কাছে ৯০০ টাকা নেই। আমি তো দিন হাজিরা পাই ৩০০ টাকা করে। পরে বাড়িওয়ালার কাছে গেলাম টাকা ধার করতে। সেই টাকা দিয়ে টিকা কিনলাম।’
কিছুটা ক্ষুব্ধ স্বরে বলেন রুবি আক্তার। প্রেসক্রিপশনে যে টিকার নাম লিখে দেয়া হয়েছে, তিনি সেটাই কিনে এনেছেন।
কিছুক্ষণ পর তার ছেলেকে টিকা দেয়া হয়।
রুবি আক্তার বলেন, ‘রাস্তার কুকুর কামড় দিছে আমার ছেলেকে। খুব টেনশনে ছিলাম। পরে নাকি আরো দুইটা টিকা নিতে হবে। সেই দুইটা কিনতে হবে নাকি ফ্রি দিবে বুঝতে পারছি না।’
দেশে যখন হামের প্রাদুর্ভাবে একের পর এক শিশু মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে, তখন দেশটিতে জলাতঙ্কের টিকার সঙ্কট নিয়ে সেভাবে আলোচনা নেই। কিন্তু জলাতঙ্কও একটি মরণব্যাধি যেখানে মৃত্যুর হার শতভাগ।
একদিকে যখন সরকারি হাসপাতালগুলোতে জলাতঙ্কের টিকার সঙ্কট, তখন সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় থাকা হামসহ অন্যান্য টিকার মজুত কতটা আছে তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
যদিও স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো: সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, দেশে জলাতঙ্কসহ কোনো টিকারই সঙ্কট নেই।
তবে বাস্তবতা ভিন্ন বলেই খবর পাওয়া যাচ্ছে।
‘আমরা টিকার রেশনিং করছি’
জলাতঙ্কের টিকা মূলত দেয়া হয় কুকুর বা বিড়ালের আঁচড় বা কামড় খেলে। জলাতঙ্কের দু’টি টিকা রয়েছে। একটি হচ্ছে এআরভি বা অ্যান্টি র্যাবিস ভ্যাকসিন। এটি শরীরকে নিজস্ব অ্যান্টিবডি তৈরি করতে উদ্দীপিত করে এবং দীর্ঘস্থায়ী সুরক্ষা দেয়।
অন্য ভ্যাকসিনটি হচ্ছে আরআইজি বা র্যাবিস ইমিউনোগ্লোবুলিন। এতে আগে থেকে তৈরি অ্যান্টিবডি থাকে, যা কামড় খাওয়া মানুষের দেহে সরাসরি ভাইরাসের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক সুরক্ষা দেয়।
কুকরের কামড় একটু বেশি ক্ষত তৈরি করলে আরআইজি ভ্যাকসিন দেয়া হয়।
বাংলাদেশে এই দ্বিতীয় ধরনের ভ্যাকসিনেরই তীব্র সঙ্কট রয়েছে। কারণ সরকারিভাবে এটির কোনো সরবরাহ নেই।
মুন্সীগঞ্জের ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে যেমন রুবি আক্তারসহ একাধিক জনকে দেখা গেল এই টিকা না পেয়ে বাইরে থেকে কিনে আনতে।
হাসপাতাল সংশ্লিষ্টরা জানাচ্ছেন, প্রতিদিন গড়ে ৩০ জন মানুষে বিড়াল কিংবা কুকুরের কামড় খেয়ে হাসপাতালে আসেন টিকা নিতে। কিন্তু সরকারি টিকা সেভাবে পান না।
বিশেষ করে বিড়ালের ক্ষেত্রে কোনো টিকাই দেয়া হয় না।
হাসপাতালটিতে কারণ খুঁজতে গিয়ে দু’টি তথ্য জানা গেলো।
একটি হচ্ছে ঢাকা থেকেই এখন আর সরকার কোনো টিকা সরবরাহ করছে না। অপরটি হচ্ছে হাসপাতালগুলোকে বলা হয়েছে নিজস্ব ফান্ড থেকে নিজ উদ্যোগে টিকা কিনতে। কিন্তু আলাদা বাজেট না থাকায় হাসপাতালগুলো সেভাবে টিকা কিনতে পারছে না।
মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. আহাম্মদ কবীর পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘আমাদের অন্য ফান্ড থেকে যে সামান্য কিছু টাকা বেঁচে গেছে সেটা দিয়ে কিনতে হচ্ছে। এখন ধরেন আমরা ১২০ ভ্যাকসিন কিনেছি। আমাদের টার্গেট হচ্ছে ১২০ ভ্যাকসিন দিয়ে এক মাস চালানো। যদি আমি সবাইকে দিতে যাই, তাহলে সাত থেকে দশ দিনের মধ্যে ভ্যাকসিন শেষ হয়ে যাবে। বাকি ২০ দিন কেউ ভ্যাকসিন পাবে না।’
তিনি জানান, সঙ্কটের কারণে টিকা সবাইকে দেয়া যাচ্ছে না।
তিনি বলেন, ‘আমরা এখন টিকার রেশনিং করছি। যাদের জরুরি প্রয়োজন, যারা খুবই দরিদ্র তাদেরকে আমরা বিনামূল্যে ভ্যাকসিন দিচ্ছি। আর যারা অ্যাফোর্ড করতে পারে কিংবা বিড়াল বাসায় পালে তাদেরকে বলছি আপনারা ভ্যাকসিনটা কিনে দেন।’
মুন্সীগঞ্জ শহরে কিছু হলেও টিকা পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু শহরের বাইরে উপজেলাগুলোতে কোনো টিকাই নেই।
তবে ঢাকার মহাখালীতে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে আবার টিকার শতভাগ সরবরাহ আছে।
এই হাসপাতালে সাভার থেকে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী সোহেল আহমেদ বলেন, সাভারে টিকা না পাওয়ায় তিনি ঢাকায় এসে টিকা নিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘আরেকজনের পোষা বিড়াল আমাকে আঁচড় দিয়েছে। হাত থেকে রক্ত বের হয়েছে। কিন্তু সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে বলেছে তাদের কাছে টিকা নেই। তারা ঢাকার এই হাসপাতালে রেফার্ড করেছে। এখানে টিকা পেয়েছি।’
টিকার ‘বাফার স্টক’ নেই ঢাকায়
জলাতঙ্কের টিকা থেকে এবার নজর দেয়া যাক সরকারের টিকা কার্যক্রমের মূল উদ্যোগ সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি বা ইপিআইয়ের টিকা পরিস্থিতিতে।
ইপিআইয়ের অধীনে হামের টিকার সঙ্কটের কারণে ইতোমধ্যেই হাম ছড়িয়ে পড়েছে। প্রতিদিনই শিশুমৃত্যুর ঘটনা ঘটছে।
এরমধ্যেই জরুরিভিত্তিতে হামের টিকা আনতে পারায় সারাদেশে বিশেষ ক্যাম্পেইন শুরু করেছে সরকার।
কিন্তু ইপিআইয়ের অধীনে থাকা নয়টি টিকার যে সামগ্রিক মজুত, সেখানে ঘাটতি আছে।
পরিস্থিতি বুঝতে মঙ্গলবার ঢাকার মহাখালীতে ইপিআই অফিসে গিয়ে দেখা যায়, অফিস প্রাঙ্গণে বেশ কয়েকটি টিকা পরিবহনের ট্রাক ঠাঁয় দাড়িয়ে আছে।
পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক পরিবহন সংশ্লিষ্ট একজন কর্মী জানালেন, এই কেন্দ্রীয় গুদামে ‘টিকার স্টক নেই’।
বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে চাইলে ইপিআই কার্যালয়ের কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি।
তবে নাম-পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে একজন কর্মকর্তা স্বীকার করেন, টিকার মজুত শেষ।
তিনি বলেন, ‘নিয়ম হচ্ছে, সারাদেশে টিকার যে চাহিদা আছে সেগুলো সরবরাহ করতে হবে। কিন্তু এগুলো বাদ দিয়েও অন্তত তিন মাসের আলাদা স্টক রাখতে হবে। এটাকে আমরা বলি বাফার স্টক। এই বাফার স্টকটা নেই।’
টেলিফোনে জানতে চাইলে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) সহকারী পরিচালক হাসানুল মাহমুদ অবশ্য বিস্তারিত বলতে চাননি।
তিনি বলেলন, ‘সমস্যা আছে। কিন্তু এই সমস্যা থাকবে না। আমরা প্রকিউরমেন্টে চলে গিয়েছি। আশা করছি আগামী মাসেই টিকা চলে আসবে।’
ইপিআইয়ের অধীনে নংটি টিকা দেয়া হয়। এর মধ্যে যক্ষ্মা প্রতিরোধে দেয়া হয় বিসিজি টিকা, ওপিভি টিকা দেয়া হয় পোলিও প্রতিরোধে, নিউমোনিয়া প্রতিরোধে দেয়া হয় পিসিভি টিকা, হাম ও রুবেলা রোগ প্রতিরোধে এমআর টিকা এবং টাইফয়েড প্রতিরোধে দেয়া হয় টিসিভি টিকা।
সব মিলিয়ে নয়টি টিকার মধ্যে বেশ কয়েকটি টিকার মজুত একেবারে শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।
একটি মাত্র টিকার মজুত আছে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত।
কিন্তু সামগ্রিকভাবে টিকার বিশেষ মজুত না থাকার অর্থ কী? এটা কি কোনো ঝুঁকির কারণ?
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. বে-নজীর আহমেদ বলছেন, বাফার স্টক না থাকাটা অবশ্যই ঝুঁকির।
তিনি বলেন, ‘বাফার স্টকটা এজন্য দরকার যে ইপিআই কর্মসূচি যদি যে কোনো কারণে কখনো বাধাগ্রস্ত হয়, তাহলে এখন যেমন হামের মহামারি হলো, এরকম অন্য রোগেরও মহামারি হতে পারে। সেজন্য বাফার স্টকটা রাখতে হয়। এটা না থাকা হলো একটা ঝুঁকি।’
ছয় মাসের স্টক আছে : স্বাস্থ্যমন্ত্রী
ইপিআই অফিস সূত্রে যখন বাফার স্টক না থাকার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তখন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো: সাখাওয়াত হোসেন অবশ্য সেটি নাকচ করছেন।
বুধবার ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে গণমাধ্যমকর্মীদের সাথে কথা বলার সময় এ সংক্রান্ত প্রশ্নে তিনি দাবি করেন, টিকার কোনো সঙ্কট নেই।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের ছয় মাসের স্টক আছে। নয়টা ভ্যাকসিনের সবগুলোই আমাদের হাতে আছে। যক্ষ্মার বিসিজি টিকাসহ সব টিকা আমাদের হাতে আছে। কোনো সমস্যা নেই।’
একজন সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, ‘ইপিআই থেকে যে তথ্য আমরা পাচ্ছি তাতে তো টিকার সঙ্কট আছে।’
জবাবে মন্ত্রী বলেন, ‘আপনি বললে তো হবে না। একটা টিকারও সঙ্কট নেই।’
এ সময় জলাতঙ্কের টিকার ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সেটিও নাকচ করেন। তিনি বলেন, ‘জলাতঙ্কের টিকার একটা ক্রাইসিস হয়েছিল। এটা আমরা মোকাবেলা করেছি।’
কিন্তু ঢাকার বাইরে তো এই টিকার সাপ্লাই নেই- এমন প্রশ্নে মন্ত্রী সরদার মো: সাখাওয়াত হোসেন বলেন, সবখানে সাপ্লাই আছে।
তিনি বলেন, ‘এমএসআর ফান্ড থেকে তারা সবাই (হাসপাতালগুলো) লোকালি কিনছে। কোথাও কোনো অভাব নেই। এডিবি ফান্ড থেকেও কেনা হচ্ছে। টিকা নিতে এসে কেউ আমাদের কাছ থেকে ফেরত যাচ্ছে না, দেয়া হচ্ছে।’
এমন পরিস্থিতি কেন হলো?
বাংলাদেশে সমস্যা যে শুধু টিকা নিয়ে হয়েছে তা নয়। এই টিকা কার্যক্রমে টাকার সঙ্কট এমন পর্যায়ে গিয়েছে যে সারাদেশে যারা টিকা পরিবহন করেন, তাদের বেতনও বন্ধ প্রায় ১০ মাস।
কিন্তু এমন পরিস্থিতি কেন হলো? এর পেছনে মূল কারণ হিসেবে উঠে আসছে, স্বাস্থ্যখাতে ওপি বা অপারেশন প্ল্যান বন্ধ হয়ে যাওয়া।
অপারেশন প্ল্যান মূলত স্বাস্থ্যখাতে টিকা কার্যক্রমসহ বিভিন্ন কর্মর্সূচির পাঁচবছর মেয়াদি পরিকল্পনা। যেখানে পাঁচ বছরের কেনা-কাটাসহ সকল কার্যক্রমের পরিকল্পনা এবং এর জন্য কত টাকা লাগবে সেটি পাশ করা থাকে।
এখানে টাকার একটা অংশ দেয় সরকার, বাকিটা আসে বিদেশী সাহায্য সংস্থা থেকে।
পরিকল্পনা পাশ করা থাকায় ওপির মাধ্যমে দ্রুত কেনাকাটা করা যায়। কিন্তু এই অপারেশন প্ল্যান নিয়ে অতীতে নানা বিতর্কও ওঠে। দুর্নীতি যার মধ্যে সবচেয়ে বড়।
ফলে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ই ওপি থেকে বেরিয়ে আসার পরিকল্পনা শুরু হয় বলে জানাচ্ছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা: বে-নজীর আহমেদ।
তিনি বলেন, ‘এটা বাদ দেয়া নিয়ে কথা হচ্ছিল। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ২০২৫ সালে সরকার কোনো এক্সিট প্লান ছাড়াই ওপি থেকে সরকার বেরিয়ে আসে। ফলে ওপি-তে যতগুলো কর্মসূচি ছিল, সবগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। এরমধ্যে টিকাও একটা। কালাজ্বর বলেন, ম্যালেরিয়া বলেন, জলাতঙ্ক বলেন- সব বন্ধ।’
তার মতে, ওপির বিকল্প কী হবে সেটি এখন সরকারকে ঠিক করতে হবে। এটা না হলে আগামী অর্থবছরেও দেখা যাবে 'টাকা থাকবে না, প্রয়োজনের সময় কেনাকাটা করা সম্ভব হবে না, সংকট থেকেই যাবে।"
সূত্র : বিবিসি



