ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের অন্যতম প্রতীকী স্থাপনা আইফেল টাওয়ারে ফিলিস্তিনি পতাকা ঝুলিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শনের ঘটনায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। পরিবেশবাদী ও সামাজিক আন্দোলন সংগঠন ‘এক্সটিঙ্কশন রেবেলিয়ন ফ্রান্স’-এর সদস্যদের পরিচালিত এ কর্মসূচির পর কমপক্ষে ছয়জনকে আটক করেছে ফরাসি পুলিশ।
শুক্রবার (১৫ মে) স্থানীয় সময় দুপুরের দিকে আন্দোলনকারীরা নিরাপত্তাব্যবস্থাকে পাশ কাটিয়ে আইফেল টাওয়ারের প্রথম তলায় প্রবেশ করেন। পরে তারা সেখানে বড় আকারের একটি ফিলিস্তিনি পতাকা ঝুলিয়ে দেন। ঘটনাটির পর পর্যটকদের মধ্যে সাময়িক আতঙ্ক ও কৌতূহলের সৃষ্টি হয়। নিরাপত্তার স্বার্থে কিছু সময়ের জন্য টাওয়ারের নির্দিষ্ট অংশে দর্শনার্থীদের চলাচল সীমিত করা হয়।
ফরাসি পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছে অভিযান চালায় এবং সংশ্লিষ্টদের আটক করে। স্থানীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অনুমতি ছাড়া সংরক্ষিত এলাকায় প্রবেশ, নিরাপত্তা বিধি লঙ্ঘন এবং জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করার অভিযোগ আনা হতে পারে।
প্যারিস পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার পূর্ণ তদন্ত শুরু হয়েছে এবং আইফেল টাওয়ারের নিরাপত্তাব্যবস্থায় কোনো দুর্বলতা ছিল কি-না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কারণ বিশ্বখ্যাত এ স্থাপনায় কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও আন্দোলনকারীরা কিভাবে প্রথম তলায় প্রবেশ করতে সক্ষম হলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
আন্দোলনকারীদের দাবি, এটি ছিল একটি ‘প্রতীকী ও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ’। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ফিলিস্তিনে চলমান যুদ্ধ, মানবিক সঙ্কট এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নীরবতার প্রতিবাদ জানাতেই এ কর্মসূচি পালন করা হয়। একইসাথে তারা ‘নাকবা দিবস’-এর কথাও উল্লেখ করেন।
উল্লেখ্য, ১৯৪৮ সালে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর লাখো ফিলিস্তিনির বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঘটনাকে ফিলিস্তিনিরা ‘নাকবা’ বা ‘মহাবিপর্যয়’ হিসেবে স্মরণ করে থাকেন। প্রতি বছর ১৫ মে দিবসটি পালন করা হয়।
আন্দোলনকারীরা জানান, এ কর্মসূচির মাধ্যমে তারা নাকবার স্মৃতি এবং বর্তমান ফিলিস্তিনি সঙ্কটের বিষয়টি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে তুলে ধরতে চেয়েছেন।
ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকে একে মানবাধিকার ও রাজনৈতিক প্রতিবাদের অংশ হিসেবে সমর্থন জানিয়েছেন।
অন্যদিকে সমালোচকরা বলছেন, বিশ্বখ্যাত পর্যটন স্থাপনার নিরাপত্তা ভেঙে এ ধরনের কর্মসূচি বিপজ্জনক নজির তৈরি করতে পারে।
এদিকে, ফ্রান্সে ফিলিস্তিন প্রশ্নে রাজনৈতিক আলোচনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। সম্প্রতি প্যারিস সিটি হলের উদ্যোগে আইফেল টাওয়ারে ফিলিস্তিন ও ইসরাইলের পতাকা এবং শান্তির প্রতীক কবুতরের ছবি প্রদর্শন করা হয়।
প্যারিসের মেয়র অ্যান হিদালগো জানান, ফ্রান্সের পক্ষ থেকে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়ার উদ্যোগ এবং ‘দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান’-এর প্রতি সমর্থন জানাতেই এ প্রদর্শনী করা হয়েছিল।
তবে দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রুনো রেতাইয়ো ফরাসি বিভিন্ন শহরের সরকারি ভবনে ফিলিস্তিনি পতাকা উত্তোলনের পরিকল্পনা নিয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। তিনি প্রিফেক্টদের নির্দেশ দিয়েছেন, আইন লঙ্ঘনের আশঙ্কা থাকলে প্রশাসনিক আদালতের মাধ্যমে ব্যবস্থা নিতে।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সঙ্ঘাত এখন ইউরোপের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরেও গভীর প্রভাব ফেলছে। প্যারিসের আইফেল টাওয়ারে সাম্প্রতিক এ প্রতিবাদ সেই উত্তেজনাকেই আরো স্পষ্টভাবে সামনে নিয়ে এসেছে।



