নীলফামারীর সৈয়দপুরে গৃহবধূ সিমু আক্তার হত্যার ঘটনায় তিন আসামিকে গ্রেফতার করেছে যৌথবাহিনী। রোববার (১৯ এপ্রিল) সন্ধ্যা ৬টার সৈয়দপুর থানা পুলিশ ও র্যাব-১৩ (নীলফামারী সিপিসি-২) যৌথ অভিযান চালিয়ে সৈয়দপুর শহরের ড্রিম প্লাস হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট থেকে তাদের গ্রেফতার করে।
গ্রেফতার তিনজন হলেন— মামলার ১ নম্বর আসামি গৃহবধূর স্বামী রায়হান আহমেদ রিতু (৩৫), ৩ নম্বর আসামি রিতুর সহযোগী মো: জসিম (৩২) ও ৪ নম্বর আসামি রিতুর ছোট ভাই নুরে ইমাম আহমেদ জিতু (৩৪)।
রিতু ও জিতু শহরের গোলাহাট রেলওয়ে কলোনীর মরহুম মোরশেদ আহমেদের ছেলে এবং জসিম পার্শ্ববর্তী ইসলামবাগ এলাকার সেলিমের ছেলে। এজাহারে উল্লেখিত ২ নম্বর আসামি গৃহবধূর সতিন ফজিলা বেগম (৩২) এখনো পলাতক রয়েছেন। তার বাবার বাড়ি পাবনা জেলায়।
নিহত সিমু আক্তার সৈয়দপুর উপজেলার কাশিরাম বেলপুকুর ইউনিয়নের ব্রক্ষ্মোত্তর কেরানীপাড়ার মো: শাহির উদ্দিনের মেয়ে।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, ১৩ বছর আগে সিমু আক্তারের সাথে রায়হান আহমেদ রিতুর বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকেই যৌতুকের জন্য সিমুকে নানাভাবে নির্যাতন করে আসছিল রিতু। একপর্যায়ে নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় সিমুর দরিদ্র বাবা অনেক কষ্টে জামাইকে একটা মোটরসাইকেল কিনে দেন। কিন্তু কিছুদিন পর সেই মোটরসাইকেল বিক্রি করে টাকা অযথা খরচ করে ফেলে রিতু। বেকার ছেলে রিতু আবারো শুরু করে নির্যাতন। এবার দাবি দুই লাখ টাকা। টাকা দিতে রাজি না হওয়ায় গত ছয় মাস আগে স্ত্রীর অনুমতি ছাড়াই দ্বিতীয় বিয়ে করে রিতু।
এরপর থেকে রিতু ও দ্বিতীয় স্ত্রী ফজিলা বেগম মিলে নির্যাতন করতে থাকে সিমুকে। এমনকি একমাত্র ছেলে চার বছরের ইফাতও তাদের নির্যাতনের শিকার হয়। এরই ধারাবাহিকতায় বুধবার (৮ এপ্রিল) অমানবিক নির্যাতন করে অসুস্থ অবস্থায় নিজ বাড়িতেই আটকে রাখে সিমুকে। পরদিন বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) দুপুরে সিমুর বাবাকে মামলার ৩ নম্বর আসামি জসিম মোবাইল করে জানায়, সিমু বিষ খেয়েছে এবং রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
ওইদিন বিকেলে হাসপাতালে গেলে অসুস্থ সিমু তার বাবা শাহির উদ্দিন, আত্মীয় শামসুন্নাহার ও রফিকা বেগমকে জানায়, রিতু ও ফজিলাসহ অজ্ঞাত আরো কয়েকজন মিলে যৌতুকের জন্য তাকে বেধড়ক মারপিট করেছে। শারীরিক অবস্থা আশঙ্কাজনক হলে নির্যাতনের ঘটনা ধামাচাপা দিতে বাড়িতে রাখা জমিতে দেয়া বিষ মুখে জোর করে ঢেলে দিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করেছে। এ সময় সিমুর শরীরে আঘাতের চিহ্ন দেখে উপস্থিত স্বামী ও সতিনকে জিজ্ঞাসা করেও কোনো সদুত্তর পাননি তারা।
পরদিন শুক্রবার (১০ এপ্রিল) বিকেলে মেয়েকে হাসপাতালে রেখে বাড়ি যান শাহির উদ্দিন। রাত পৌনে ৯টার দিকে মেয়ের জামাই রিতুর ফুফা বেলাল মোবাইল করে শাহির উদ্দিনকে জানান সিমু মারা গেছে। তাৎক্ষণিক তিনি হাসপাতালে গিয়ে দেখেন লাশ বিছানায় পড়ে আছে আর স্বামী-সতিনসহ পরিবারের লোকজন পালিয়েছে। এরপর দুই দিন লাশ হাসপাতালের মর্গে পড়ে ছিল। ১২ এপ্রিল সৈয়দপুর থানায় মামলা করার পর ময়নাতদন্ত করে লাশ বাবার বাড়িতে দাফন করা হয়।
নিহতের বাবা শাহির উদ্দিন বলেন, জামাই রায়হান আহমেদ রিতু মূলত একজন বেকার। যা আগে জানতে পারিনি তাই বিয়ের পরও মেয়েকে সেখানে রাখতে বাধ্য হয়েছি। তাছাড়া তাদের একটা ছেলেসন্তানও আছে। আমার মেয়ে উত্তরা ইপিজেডে চাকরি করে সংসার চালাত। কিন্তু তারপরও যৌতুকের জন্য নির্যাতন করত। গরীব মানুষ হয়েও মেয়ের সুখের কথা চিন্তা করে অনেক কষ্টে জামাইকে একটা মোটরসাইকেল কিনে দেই। সেটাও বিক্রি করে টাকা নষ্ট করেছে।
তিনি আরো বলেন, মাঝে মধ্যেই শুনতাম টাকার জন্য মেয়েকে নির্যাতন করে। কিন্তু ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে সহ্য করে দিন কাটাত সিমু। এমতাবস্থায় দ্বিতীয় বিয়ে করে রিতু। আর তারা স্বামী-স্ত্রী মিলে আমার মেয়েকে নির্যাতন করে শেষে মেরেই ফেলল। গরম ইলেকট্রিক ইস্ত্রি দিয়ে ছ্যাক দেয়াসহ স্টিলের পাইপ দিয়ে পিটিয়েছে। যা সিমুর ছেলে ইফাত (৫) দেখেছে।
শাহির উদ্দিন বলেন, আমি এই হত্যার সঠিক ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই। আমাকে ১০ লাখ টাকার লোভ দেখিয়ে মামলা তুলে নেয়ার জন্য নানা দিক থেকে চাপ দেয়া হচ্ছে। এত বড় ঘটনা অথচ সেদিন থেকে আজ পর্যন্ত কোনো সাংবাদিক খবর করল না। জিতুর একজন সাংবাদিক আত্মীয়কে দিয়ে টাকার মাধ্যমে সবাইকে মনে হয় কিনে নিয়েছে।
এদিকে গোলাহাট এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, গোলাহাট রেলওয়ে কলোনীর প্রায় চারটি কোয়ার্টার দখল করে অভিযুক্ত রিতুর পুরো পরিবার বাস করত। কোয়ার্টার ও রেলওয়ের জায়গা দখল ও কেনা-বেচা করাই ছিল তাদের পেশা। পাশাপাশি মাদক বিক্রির সাথেও জড়িত ছিল রিতু ও জিতু দুই ভাই। আওয়ামী লীগ নেতার ছত্রছায়ায় এলাকায় জমি জবর-দখলেও তারা তৎপর। কয়েক মাস আগে ইয়াবা বিক্রির মামলায় মাস খানেক কারাগারে ছিল জিতু।
এলাকাবাসী জানান, বিয়ের পর থেকেই সিমুকে নির্যাতন করাসহ ইপিজেডে চাকরি করতে বাধ্য করে বেতনের টাকা হাতিয়ে নিতো তারা। সম্প্রতি বিভিন্ন জনের জমির নকল দলিলপত্র তৈরি করে দখল ও বিক্রির মাধ্যমে অবৈধ টাকা করেছে রিতু। এমনকি নিজ চাচা ও ফুপুর পৈত্রিক সূত্রে প্রাপ্ত জমিও গোপনে বিক্রি করে দিয়েছে। কাউকে কোনো অংশ দেয়নি। প্রায় ৩০ লাখ টাকায় একটা বিল্ডিং কিনেছে। টাকার গরমে দ্বিতীয় বিয়েও করেছে। রিতুর এই অর্থের উৎস নিয়ে তদন্তের দাবিও জানিয়েছেন তারা। সেইসাথে স্বামী ও সতিন মিলে গৃহবধূকে হত্যার উপযুক্ত শাস্তি দাবি করেছেন এলাকার লোকজন।
সৈয়দপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) রেজাউল করিম রেজা বলেন, ঘটনার পর থেকেই আসামিরা পলাতক ছিল। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই আমির হোসেন র্যাবের সাথে যৌথ অভিযান চালিয়ে তিনজনকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে। তাদের সোমবার (২০ এপ্রিল) সকালে আদালতে পাঠানো হয়েছে। পলাতক ২ নম্বর আসামিকেও দ্রুত গ্রেফতার করা হবে।



