অবশেষে চট্টগ্রামবাসীর বহুল প্রত্যাশিত কালুরঘাটে কর্ণফুলী নদীর ওপরে রেলওয়ের নতুন সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর করা হবে আগামীকাল বুধবার।
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস প্রত্যাশিত এই রেল-কাম-রোড সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর উন্মোচন করবেন বলে নিশ্চিত করেন ওই প্রকল্পের পিডি প্রকৌশলী আবুল কালাম চৌধুরী।
দু’দেশের যৌথ অর্থায়নের এই সেতু বাস্তবায়নে ব্যয় হবে ১১ হাজার ৫৬০ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। এতে সরকারি অর্থায়ন রয়েছে চার হাজার ৪৩৫ কেটি ৬৩ লাখ টাকা এবং প্রকল্প ঋণ রয়েছে সাত হাজার ১২৫ কোটি ১৪ লাখ টাকা। (প্রকল্পের অনুকূলে ইডিসিএফ ও ইডিপিএফ ঋণের পরিমাণ যথাক্রমে ৭২৪ দশমিক ৭২৯ মিলিয়ন ইউএস ডলার ও ৯০ দশমিক ১৭৫ মিলিয়ন ইউএস ডলার। যা গত বছরের ২৭ জুন ঋণচুক্তি স্বাক্ষর সম্পনন্ন হয়)।
জানা গেছে, কালুরঘাটের পুরোনো সেতুর ৭০ মিটার উজানে এই নতুন রেল-কাম-সেতু নির্মিত হবে। সেতুর দৈর্ঘ্য হবে ৭০০ মিটার, ৬ দশমিক ২০ কিলোমিটার। ভায়াডাক্ট নির্মাণ, ৪ দশমিক ৫৪ কিলোমিটার অ্যামব্যাকমেন্ট নির্মাণ, ২ দশমিক ৪০ কিলোমিটার সড়ক ভায়াডাক্ট নির্মাণ এবং ১১ দশমিক ৪৪ কিলোমিটার রেল ট্রাক নির্মাণসহ আনুষঙ্গিক কাজ। এই সেতুর হাইট বা নেভিগেশন ক্লিয়ারেন্স হবে ১২ দশমিক ২ মিটার। ৫০ মিটার রেল পথ হবে ডবল গেজ ও মিটার গেজ (এমজি ও বিজি) ডবল ট্র্যাক। ২০ মিটার দু’লেনের সড়ক পথ তৈরি করা হবে বলে জানা গেছে।
নতুন রেল সেতু প্রকল্পের উদ্দেশ্য
চট্টগ্রামের কালুরঘাট পয়েন্টে কর্ণফুলী নদীর উপর বিদ্যমান পুরাতন ও সংকীর্ণ রেল সেতুর পাশে একটি নতুন রেল-কাম-রোড সেতু নির্মাণের মাধ্যমে চট্টগ্রাম-কক্সবাজারের মধ্যে নিরবচ্ছিন্ন রেল পরিবহন সেবা নিশ্চিত করা। এ সেতু নির্মাণের মাধ্যমে ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্কের সাথে সংযুক্ত করে চীন, ভারত, ও মায়ানমারের সাথে রেলপথে যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি করা। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্র বন্দর থেকে পণ্য পরিবহনের জন্য নিরবচ্ছিন্ন রেল করিডোর তৈরি করা। আন্তঃআঞ্চলিক বাণিজ্যিক সুবিধা বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশের সকল অঞ্চলের ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও স্থানীয় জনগণের জীবনমান উন্নয়ন, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার করিডোরে দ্রুততম সময়ে ও নিরাপদে অধিক সংখ্যক যাত্রী ও মালামাল পরিবহন নিশ্চিতকরণ।
প্রকল্প গ্রহণের যৌক্তিকতা : প্রসঙ্গে বলা হয়েছে
চট্টগ্রাম বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর। দেশের বৃহত্তম সমুদ্র বন্দর চট্টগ্রামে অবস্থিত। এ বন্দরের মাধ্যমে দেশের আমদানি ও রফতানি প্রায় ৭০ ভাগ সম্পন্ন হয়। এছাড়া এ জেলায় রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলসহ বিভিন্ন শিল্প কারখানা গড়ে উঠেছে। চট্টগ্রাম হতে দক্ষিণাঞ্চলে যাওয়ার জন্য কর্ণফুলী নদীর উপর একটি সড়ক সেতু ও কালুরঘাটে একটি রেল-কাম-রোড সেতু বিদ্যমান রয়েছে।
চট্টগ্রাম-দোহাজারী বিদ্যমান রেল সেকশনে ১৯৩১ সালে মিটারগেজ লাইন বিশিষ্ট কালুরঘাট সেতু নির্মাণ করা হয়। যা পরে ১৯৬২ সালে ডেক পরিবর্তন করে রেল-কাম-রোড সেতুতে রূপান্তর করা হয়েছিল কালুরঘাটে বিদ্যমান রেল-কাম-রোড সেতু অত্যন্ত পুরাতন ও জরাজীর্ণ হওয়ায় এর ওপর দিয়ে ঘণ্টায় ১০ কিলোমিটার বেগের বেশি ট্রেন চলাচল করতে পারে না। ট্রেন চলাচলের সময় সড়ক পথের যান চলাচল বন্ধ রাখা হয়।
এছাড়া মাতারবাড়ীতে গভীর সমুদ্র বন্দর চালু হলে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসারের সাথে সাথে এ রেলপথের গুরুত্ব বৃদ্ধি পাবে। ইতোমধ্যে দোহাজারী-কক্সবাজার রেল লাইন নির্মিত হওয়ায় ঢাকার সাথে কক্সবাজারের সরাসরি রেল যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছে। ফলে পর্যটন নগরী কক্সবাজারে যাতায়াতের সুবিধার জন্য কালুরঘাটে বিদ্যমান পুরাতন জরাজীর্ণ রেল-কাম-রোড সেতুর পাশাপাশি একটি নতুন রেল-কাম-রোড সেতু নির্মাণ আবশ্যক হয়ে পড়ে। এ পরিপ্রেক্ষিতে প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়েছে বলে প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে।
গত ৯ জানুয়ারি কালুরঘাটে রেলওয়ে নতুন সেতু নির্মাণ প্রকল্প আলোর পথে শিরোনামে দৈনিক নয়া দিগন্তে প্রথম সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, এই রেলপথ যোগাযোগ ও দেশের অর্থনীতিতে বিশেষ ভূমিকা রাখবে। তাছাড়া কক্সবাজারে গড়ে উঠছে মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র বন্দর। ওই বন্দর দিয়ে প্রতিবছর দেশী-বিদেশী লাখ লাখ মেট্রিকটন ভারী মালামাল উঠানামা করবে। আবার ওই সমস্ত মালামাল দেশের বিভিন্ন স্থানে পৌঁছানো হবে আবার দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে লাখ লাখ মেট্রিকটন মালামাল বন্দরে পৌঁছানো হবে। তাছাড়া মহাসড়কের ট্রাফিক ভলিউম নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি চিন্তাভাবনা করেই কক্সবাজার চট্টগ্রাম রেলপথকে ডুয়েল গেজ( মিটার গেজ ও ব্রডগেজ) করে তৈরি করা হয়েছে। আর যেহেতু পুরোনো সেতুটি মিটার গেজ উপযোগী সে সেজন্য সঙ্গত কারণেই নতুন সেতু নির্মাণ যুক্তিসংগত কারণেই বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
এর আগে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর ওপর পুরোনো সেতু প্রায় ১৪ মাস ধরে সংস্কার কাজ করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড। সংস্কার কাজ শুরুর তিন মাসের মধ্যেই সেতুটি ট্রেন চলাচলের উপযোগী করে তোলা হয়। এরপর গত বছর ২০২৩ সালের ১২ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে ট্রেন চলাচল শুরু হয়।
জানা গেছে, পুরোনো সেতুর লোড ক্যাপাসিটি বৃদ্ধি, ওয়াকওয়েসহ সার্বিক কাজ করা হয়। ষাটের দশকের নির্মিত রেলওয়ে পুরোনো সেতুটির দৈর্ঘ্য ৬২০ মিটার এবং সেতুটিতে নয়টি স্পেন রয়েছে। কালুরঘাট রেলওয়ের পুরোনো সেতুতে স্থাপিত মিটার গেজ রেলওয়ে লাইনের (সেতুর ওপর) লোড ক্যাপাসিটি ছিল প্রতি এক্সেলে ১২ মেট্রিকটন। অপরদিকে দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত নতুন লাইনটি সিঙ্গেল ট্রাক এবং ডবল গ্যাজের (এমজি বা মিটার গ্যাজ বিজি বা ব্রডগ্যাজ) এবং এর সার্বিক লোড ক্যাপাসিটি প্রতি এক্সেলে প্রায় ১৫ মেট্রিক টনের বেশি (মিটার গেজে) এবং ব্রডগেজ এ লোড ক্যাপাসিটি রয়েছে প্রতি এক্সেলে ২৫ থেকে ৩০ মেট্রিক টন।
বর্তমানে মিটারগেজ ট্রেন চলাচল করছে যার ইঞ্জিনের প্রতি এক্সেলে লোড ক্যাপাসিটি প্রায় ১৫ মেট্রিক টনের মত। সঙ্গত কারণে রেলওয়ে পুরোনো সেতুটির লোড ক্যাপাসিটি ১২ মেট্রিক টন থেকে বাড়িয়ে অন্তত ১৫ মেট্রিক টন করার পরেই ট্রেন চলাচল শুরু হয়। কালুরঘাট রেলওয়ে পুরোনো সেতু উন্নতকারণ কাজে ব্যয় হয়েছিল ৪৩ কোটি টাকা বলে জানা গেছে।
উল্লেখ্য, কর্ণফুলী নদীর উপর কালুরঘাট রেল-কাম-রোড সেতু নির্মাণ প্রকল্পটি ২০১৮ সালে একনেকে উপস্থাপন করা হয়। ২০১১ সালে বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃক প্রদত্ত সেতুর নেভিগেশন ক্লিয়ারেন্স ৭ দশমিক ৬২ মিটার বিবেচনায় নিয়ে নিয়োজিত পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ২০১৬ সালে সেতুর ফিজিবিলিটি স্টাডি ও কনসেপচুয়াল ডিজাইন প্রণয়ন করে, যার ভিত্তিতে ২০১৮ সালে প্রকল্পের ডিপিপি প্রণয়ন করা হয়েছিল। পরে ২০১৯ সালে বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃক সেতুর নেভিগেশন ক্লিয়ারেন্স ১২ দশমিক ২ মিটার করা হয়। সেতুর নেভিগেশন ক্লিয়ারেন্স বৃদ্ধির কারণে নিয়োজিত পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ২০২৩ সালে পুনরায় সেতুর ফিজিবিলিটি স্টাডি ও কনসেপচুয়াল ডিজাইন প্রণয়ন করে, যার ভিত্তিতে ২০২৪ সালে প্রকল্পের ডিপিপি পুনরায় প্রণয়ন ও অনুমোদিত হয়। সেতুর নেভিগেশন ক্লিয়ারেন্স বৃদ্ধির কারণে সেতুটি বর্তমান অবস্থান থেকে প্রায় ২৫ ফুট উঁচু করতে হচ্ছে। এ কারণেই মূলত সেতু নির্মাণ ব্যয় বহুগুণে বৃদ্ধি পায়।



