রংপুরে শিলাবৃষ্টি ও ঝড়ো হাওয়ায় কৃষিতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি

শনিবার দুপুর ১২টা থেকে আজ রোববার দুপুর ১২টা পর্যন্ত রংপুর বিভাগে শক্তিশালী বৃষ্টি বলয় ‘ঝুমুল’-এর প্রভাবে ভারী বৃষ্টিপাত ও বিক্ষিপ্ত শিলাবৃষ্টি হয়। এ সময় এই বিভাগে ১৩০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।

সরকার মাজহারুল মান্নান, রংপুর ব্যুরো

Location :

Rangpur
রংপুরের ম্যাপ
রংপুরের ম্যাপ |নয়া দিগন্ত

আকস্মিক শিলাবৃষ্টি ও ঝড়ো হাওয়ায় তিস্তা ব্রহ্মপুত্র ধারণার নদীর বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলসহ রংপুর বিভাগের উঠতি আগাম পাকা বোরো ধান, তামাক, ভুট্টা, শাক-সবজির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এতে শেষ মুহূর্তে এসে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষক। টার্গেট অনুযায়ী উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার শঙ্কা প্রকাশ করেছে কৃষি বিভাগ।

শনিবার (২৫ এপ্রিল) দুপুর ১২টা থেকে আজ রোববার দুপুর ১২টা পর্যন্ত রংপুর বিভাগে শক্তিশালী বৃষ্টি বলয় ‘ঝুমুল’-এর প্রভাবে ভারী বৃষ্টিপাত ও বিক্ষিপ্ত শিলাবৃষ্টি হয়। এ সময় এই বিভাগে ১৩০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। সাথে ছিল ঝড়ো ও দমকা হাওয়া এবং শিলা বৃষ্টি। এতে কৃষি এবং গাছ গাছালি ও টিনের চালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

রংপুর আবহাওয়া অফিসের ইনচার্জ মোস্তাফিজার রহমান এ তথ্য নিশ্চিত করেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর এবং মাঠ পর্যায়ে থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, চরাঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকায় বড় বড় শিল বৃষ্টি হওয়ায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে উঠতি আগাম বোরো ধানের। এসব বোরো ধান এক সপ্তাহের মধ্যে গোলায় তুলতেন কৃষক। গোলায় তোলার ঠিক আগমুহূর্তে শিলাবৃষ্টিতে দিশেহারা এখন কৃষক। ধান পড়ে গেছে মাটিতে। কর্দমাক্ত হয়ে গেছে।

বড় আকারের শিলার আঘাতে ভুট্টা গাছ ভেঙে পড়েছে। উঠতি ভুট্টার গাছি মাটিতে পড়ে গেছে। তামাকের পাতা ফুটো হয়ে নষ্ট হয়ে গেছে। দমকা ঝড় ও বাতাস সাথে শিলার আঘাতে ঐতিহ্যবাহী হাড়ি ভাঙ্গাসহ আম এবং লিচুর কচি মুকুল ও ফল ঝরে গেছে। শাকসবজি তছনছ হয়ে গেছে। ফলে কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন না হওয়ার শংকায় চাষী এবং কৃষি বিভাগ।

মাঠ পর্যায় থেকে পাওয়া তথ্য মতে, ঝড়ের তাণ্ডবে অনেক কাঁচা ও আধা-পাকা ঘরবাড়ির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। তীব্র শিলাবৃষ্টিতে শত শত ঘরবাড়ির টিনের চাল ফুটো হয়ে গেছে। ঝোড়ো হাওয়ায় বহু গাছ উপড়ে রাস্তাঘাট বন্ধ হয়েছে এবং বসতবাড়ির ওপর পড়ে ঘর বিধ্বস্ত হয়েছে।

কালবৈশাখী ও বজ্রবৃষ্টির কারণে রংপুর বিভাগের বিভিন্ন উপজেলায় অনেক এলাকার বৈদ্যুতিক লাইনে গাছ পড়ে বিদ্যুৎ সংযোগ দীর্ঘ সময় বিচ্ছিন্ন ছিল।

রংপুরসহ সংশ্লিষ্ট উপজেলা ও জেলা প্রশাসন জেলা এবং কৃষি বিভাগ ক্ষয়ক্ষতির তালিকা প্রণয়ন ও পুনর্বাসন কার্যক্রম পরিচালনার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

রংপুরের গংগাচড়ার মরনেয়ার চাষি মেহেরুল ইসলাম বলেন, ‘আমার চার বিঘা জমির ধান প্রায় ৬০ ভাগ শিলাবৃষ্টির কারণে মাটির সাথে শুয়ে গেছে। অনেক ধান মাটিতে পড়ে গেছে। ধার দেনা করে আমরা ধান ফলাই। সেই ধান বিক্রি করে, ধার দেনা শোধ করি এবং ছয় মাস ভাত খাই। কিন্তু এবার যে পরিস্থিতি নিয়ে যেতে পারবো না। খুব দুশ্চিন্তায় আছি।’

কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার রমনা ইউনিয়নের চর পাত্রখাতা গ্রামের হামিদুল ইসলাম বলেন, ‘প্রায় পাঁচ বিঘা জমিতে লাগিয়েছিলাম ভুট্টা। কিন্তু শিলাবৃষ্টিতে অর্ধেকেরও বেশি জমির ভুট্টা মাটিতে হেলে পড়েছে। কিছুদিনের মধ্যেই সব ভুট্টা আমি মাড়াই করতাম। একেবারে ফসল তোলার মুহূর্তে এই অবস্থায় খুবই বিপদে পড়ে গেছি।’

রংপুরের ঘোড়াগাছ ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী হাড়িভাঙ্গা আমের মাতৃগাছের বর্তমান মালিক আমজাদ পাইকার জানান, এবার শিলাবৃষ্টির কারণে বড় হয়ে আসা আমের গুটি আমার বাগান থেকে ঝরে গেছে। পুরো এলাকার সবার বাগানেরই প্রায় ২০ থেকে ৩০ ভাগ আম ঝরে গেছে। এতেকাঙ্ক্ষিত উৎপাদন হবে না।

লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার রুদ্রদাস এলাকার তামাক চাষি রহমান বলেন, ‘শিলাবৃষ্টির কারণে তামাকের পাতা বড় বড় ফুটো হয়ে গেছে। মাটির সাথে লেলিয়ে পড়েছে। আমি প্রায় পাঁচদন জমি আবাদ করেছি। দুই দল জমিরই ফসল নিতে পারব না ঘরে। কিন্তু টাকা তো আগে নিয়ে খেয়ে ফেলেছি। কি যে হবে এবার।’

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর কুড়িগ্রামের উপ-পরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, জেলার অনেক এলাকায় আগাম ধান আবাদ হওয়ায় চলতি সপ্তাহে সেখানে ধান কাটা মারাই শুরু হতো। কিন্তু ধান কাটার ঠিক আগ মুহূর্তে শিলাবৃষ্টি হওয়ায় অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। মাঠপর্যায়ে কর্মকর্তারা বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করে ক্ষয়ক্ষতির হিসাব সংগ্রহ করছেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর রংপুরের অতিরিক্ত পরিচালকের কার্যালয়ের উপ-পরিচালক সিনথিয়া জাহান জানান, শনিবার থেকে বৃষ্টি সাথে শিলাবৃষ্টি ও ঝরো হওয়া অব্যাহত রয়েছে। সে কারণে এই কৃষি অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে ধান ভুট্টা তামাকসহ শাকসবজির বিভিন্ন আবাদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইউনিয়ন পর্যায়ে থেকে তালিকা তৈরীর কার্যক্রম চলছে। তালিকা তৈরি শেষে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বলা যাবে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর রংপুরের অতিরিক্ত অতিরিক্ত পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) সিরাজুল ইসলাম জানান, ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের কাজ করছেন মাঠকর্মীরা। যদি ক্ষতির পরিমাণ বেশি হয় তাহলে টার্গেট অনুযায়ী এবার উৎপাদন নাও হতে পারে। তবে আর যদি নতুন করে বৃষ্টিপাত বা শিলা বৃষ্টি না হয়। রোদ ওঠে। তাহলে উৎপাদনে কোনো প্রভাব পড়বে না।

রংপুর বিভাগীয় কমিশনার শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘শিলা বৃষ্টিতে ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের জন্য কৃষি বিভাগকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। কৃষি বিভাগের কর্মীরা মাঠে কৃষকদের ক্ষয়ক্ষতির তালিকা করবেন এবং তাদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ এবং কৃষি সহায়তা দেয়া হবে।’