ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ (মমেক) হাসপাতালের হাম আইসোলেশন ওয়ার্ড এখন যেন এক নীরব আর্তনাদের জায়গা। প্রতিদিনই সেখানে ভেসে আসছে স্বজন হারানোর কান্না, অসহায় বাবা-মায়ের দীর্ঘশ্বাস আর অসুস্থ শিশুদের কষ্টের চিত্র।
হুমায়ুন-লিজা দম্পতির একমাত্র সন্তান পাঁচ মাস বয়সী আরিয়া মণি- যাকে ঘিরে ছিল তাদের সব স্বপ্ন- সেই স্বপ্নই এখন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। হামে আক্রান্ত হয়ে গত সোমবার হাসপাতালে ভর্তি করা হলেও শেষরক্ষা হয়নি। গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে শিশুটির মৃত্যু হয়। একমাত্র সন্তান হারিয়ে পাগলপ্রায় বাবা-মায়ের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে হাসপাতালের পরিবেশ।
এমন হৃদয়বিদারক দৃশ্য এখন মমেকের হাম ওয়ার্ডে প্রায় প্রতিদিনের ঘটনা। হামে আক্রান্ত হয়ে কিংবা উপসর্গ নিয়ে বাড়ছে শিশু মৃত্যু। উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় দিন কাটছে অভিভাবকদের।
মেঝেতে চিকিৎসা, শয্যা সঙ্কট মারাত্মক
হাসপাতালের হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা গেছে- শয্যার তুলনায় রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি। ৬৪ শয্যার বিপরীতে চিকিৎসা নিচ্ছে প্রায় শতাধিক শিশু। ফলে অনেক শিশুকেই মেঝেতে বা বারান্দায় রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।
ফুলবাড়িয়ার মারাবিয়া খাতুন ছয় মাসের সন্তানকে নিয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে। শিশুটি জ্বরে পুড়ছে, শ্বাসকষ্টে ছটফট করছে। কিন্তু সিট না থাকায় ঠাঁই হয়েছে মেঝেতে।
একই চিত্র ঈশ্বরগঞ্জের ইব্রাহিম ভূঁইয়ার ক্ষেত্রেও- আড়াই বছরের সন্তানকে নিয়ে মেঝেতেই চলছে সেবা।
সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ছে
একই ওয়ার্ডে একাধিক শিশুকে গাদাগাদি করে রাখায় সংক্রমণের ঝুঁকি আরো বেড়ে যাচ্ছে। এক শিশুর সাথে আরেক শিশুর থাকা- এমনকি সুস্থ শিশুরাও আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে।
ইয়ামিন নামের এক শিশুর বাবা জানান, ছোট সন্তানের সাথে বড় সন্তানকেও একই জায়গায় রাখতে হচ্ছে- যা পরিস্থিতিকে আরো ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।
চিকিৎসা নিয়ে অসন্তোষ
অনেক অভিভাবকের অভিযোগ- সময়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক পাওয়া যাচ্ছে না, প্রয়োজনীয় ওষুধও মিলছে না। দীর্ঘদিন হাসপাতালে থাকতে গিয়ে অনেকেই অর্থ সঙ্কটে পড়ছেন। এতে করে চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতি হতাশা বাড়ছে।
পরিস্থিতি উদ্বেগজনক
হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান জানান, গত ১৭ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত ভর্তি হয়েছে ১ হাজার ২৭০ শিশু। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ১ হাজার ১৪৫ জন, আর মৃত্যু হয়েছে অন্তত ২৮ শিশুর।
শুধু গত ২৪ ঘণ্টাতেই নতুন করে ভর্তি হয়েছে ২৬ শিশু, ছাড়পত্র পেয়েছে ১৮ জন। বর্তমানে বিভিন্ন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রয়েছে প্রায় ৯৬ শিশু।
চিকিৎসকরা বলছেন, হাম নিজে যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, তেমনি এর সাথে নিউমোনিয়া বা শ্বাসকষ্ট যুক্ত হলে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
তাদের পরামর্শ- শিশুদের সময়মতো ইপিআই কর্মসূচির আওতায় টিকা দিতে হবে। জ্বরের সাথে লালচে দানা (র্যাশ) দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। অবহেলা করলে ঝুঁকি মারাত্মক হতে পারে।
মানবিক সঙ্কটের প্রতিচ্ছবি
মমেক হাসপাতালের হাম ওয়ার্ড এখন শুধু একটি চিকিৎসা কেন্দ্র নয়- এটি যেন এক চলমান মানবিক সঙ্কটের প্রতিচ্ছবি। যেখানে প্রতিটি বিছানা, প্রতিটি মেঝে আর প্রতিটি করিডোরে লুকিয়ে আছে অসহায়ত্ব, কষ্ট আর বেঁচে থাকার লড়াই।
এই পরিস্থিতি শুধু একটি হাসপাতালের নয়- এটি পুরো জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য এক বড় সতর্কবার্তা। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই সঙ্কট আরো ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।



