ঘরের ছেলে ফিরলেন প্রধানমন্ত্রী হয়ে, আনন্দে মাতোয়ারা বগুড়া

‘হামাকের ছোল প্রধানমন্ত্রী হয়ে আসিচ্চে। এটাই হামাকের জন্য ম্যালা খুশির খবর। এ কতা খালি কয়ে প্রকাশ করা যাবিনে। ছোলের জন্যে হামরা সগলি খুবই খুশি।’

নয়া দিগন্ত অনলাইন

Location :

Bogura
ঘরের ছেলে ফিরলেন প্রধানমন্ত্রী হয়ে
ঘরের ছেলে ফিরলেন প্রধানমন্ত্রী হয়ে |সংগৃহীত

৮৫ বছরের রোকেয়া বেগম। বগুড়ার গাবতলীর বাগবাড়ীতে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের বাপ-দাদার বাড়িঘর আগলে রেখেছেন তিনিই। তার চোখ থেকে আনন্দাশ্রু গড়িয়ে পড়ছে; চেহারায় খুশির ঝিলিক। প্রিয় সন্তান ঘরে ফিরেছেন, তাও আবার প্রধানমন্ত্রী হয়ে।

রোকেয়া বেগমকে বলতে শোনা যায়, ‘হামাকের ছোল প্রধানমন্ত্রী হয়ে আসিচ্চে। এটাই হামাকের জন্য ম্যালা খুশির খবর। এ কতা খালি কয়ে প্রকাশ করা যাবিনে। ছোলের জন্যে হামরা সগলি খুবই খুশি।’

মহব্বত মণ্ডল নামের স্থানীয় এক যুবকের কথাতেও একই সুর। তিনি বলেন, আগে তারেক রহমান যখন আসতেন তখন আমরা অনেক ছোট। সে সময় মানুষের মুখে মুখে শুধু গল্পই শুনেছি তার। কিন্তু এবার সামনাসামনি দেখব। তাই অনেক আনন্দ লাগছে।

২০০৬ সালের পর প্রথমবার স্মৃতির ধুলো মাখা আদি নিবাসে ফিরলেন তারেক রহমান। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর নিজ জেলায় এটিই তার প্রথম সফর।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ছিলেন মণ্ডল পরিবারের সন্তান। তাদের মূল বাড়ি ছিল পাশের মহিষাবান গ্রামে। জিয়াউর রহমানের দাদা কামাল উদ্দিন মণ্ডল বাগবাড়ীতে গিয়ে তৎকালীন জমিদার পরিবারের মেয়ে মিছিরুন নেছাকে বিয়ে করেন। এই সম্ভ্রান্ত নারী পৈতৃকসূত্রে ৫০০ বিঘা জমি পান। পরে তিনি স্বামী কামাল উদ্দিনকে নিয়ে বাবার বাড়িতেই সংসার শুরু করেন।

এই দম্পতির সাত ছেলে ও দুই মেয়ে। ছেলেদের মধ্যে মনসুর রহমান পঞ্চম। তিনি জাহানারা বেগম রানীকে বিয়ে করেন। বর্তমান বাড়িতে তাদের সংসারে জন্ম নেয় চার ছেলে সন্তান। তাদের মধ্যে দ্বিতীয় সন্তান জিয়াউর রহমান।

জিয়াউর রহমানের পূর্বপুরুষরা ১৮৯৫ সালে বাগবাড়ী গ্রামে একতলা পাকা বাড়ি নির্মাণ করেন। ১৩০ বছরের প্রাচীন এই বাড়িটি বর্তমানে ‘জিয়াবাড়ি’ হিসেবে সবার কাছে পরিচিত।

২০০১ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পরের বছর এটি দোতলা করা হয়। সে সময় তারেক রহমান গ্রামে গেলেই সেখানে বিশ্রাম নিতেন।

সর্বশেষ ২০০৬ সালে বগুড়ার বাগবাড়ীতে যান বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এরপর কেটে গেছে প্রায় দুই দশক। এই সময়টাজুড়ে তাকে পোহাতে হয়েছে অমানুষিক নির্যাতন। থেকেছেন নির্বাসনে। তবে দুঃসময়ের সেই কালো অধ্যায় পেরিয়ে আবার আদিপুরুষের ভিটেমাটিতে পা রেখেছেন তারেক রহমান। এবার শুধু দলীয় প্রধান নয়, ফিরেছেন দেশের প্রধানমন্ত্রীর বেশে।

তার আগমনের খবরে বগুড়া শহর থেকে শুরু করে বাগবাড়ীর পাড়ামহল্লায় এখন সাজ সাজ রব। এলাকাবাসীর উচ্ছ্বাসে যেন কমতি নেই। তারেক রহমান দীর্ঘদিন নির্বাসনে থাকলেও বগুড়ার গাবতলী উপজেলা ও পৈতৃক ভিটার সাথে তার আত্মার সম্পর্ক কখনো কমেনি।

কিশোর বয়সে ১৯৮১ সালে বাবাকে হারান তিনি। ছাত্রাবস্থায় স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনে মায়ের সহচর হিসেবে ছিলেন। অবশ্য তার রাজনৈতিক জীবনের সূচনা বগুড়ার গাবতলীর মাটি থেকে।

সে সময় বাবা জিয়াউর রহমানের গড়া বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের সদস্য হন তারেক রহমান। মাত্র ২১ বছর বয়সে ১৯৮৮ সালে তিনি বগুড়ার গাবতলী থানা বিএনপির সদস্য হন। তখন থেকে পৈতৃক ভিটার সাথে তার যোগাযোগ আরো বাড়তে থাকে।

গাবতলী নশিপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার রোকনুজ্জামান রোকন তালুকদার বলেন, দিনতারিখ মনে না থাকলেও তারেক রহমান সর্বশেষ ২০০৬ সালে এসেছিলেন। মোট যে কতবার এসেছেন তার কোনো হিসাব নেই।

তবে বগুড়ায় এলেই বাগবাড়ী আসতেন। লন্ডনে থাকাকালীনও তিনি এখানকার মানুষের খোঁজ নিয়েছেন। বাগবাড়ীর হাসপাতালটির খোঁজখবর রাখতেন।

দীর্ঘ ২০ বছর পর ঘরের ছেলে ফিরেছেন প্রধানমন্ত্রী হয়ে। তার বগুড়া আগমনের বসন্তের ফুলের মতো নতুন রূপে সেজেছে পুরো জেলা।

দীর্ঘদিন উন্নয়নবঞ্চিত বগুড়াকে আধুনিক ও স্বপ্নের নগরী হিসেবে গড়ে তোলার এক নতুন সূচনা হিসেবেই দেখা হচ্ছে এবারের সফরকে। আর সেই নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে যাচ্ছে প্রায় দেড়শ বছরের পুরোনো বগুড়া পৌরসভাকে দেশের ১৩তম সিটি করপোরেশনে উন্নীত করার ঘোষণার মধ্য দিয়ে।

পাশাপাশি ই-বেইলবন্ড কার্যক্রমের সূচনা, ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ এবং আলতাফুন্নেছা খেলার মাঠে জনসভাসহ দিনব্যাপী নানা কর্মসূচি রয়েছে তার সফরে। স্থানীয় প্রশাসন নিরাপত্তাসহ সার্বিক প্রস্তুতি জোরদার করেছে।

প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন জানান, প্রধানমন্ত্রী একজন জনবান্ধব মানুষ। তিনি বগুড়ার কৃতী সন্তান। তার সফরে সরকারি কর্মসূচি শেষে বগুড়ার মানুষের সাথে আলাদা করে দেখা এবং কথা বলার জন্য জনসভায় অংশ নেবেন। প্রধানমন্ত্রী বগুড়ায় সফর উপলক্ষ্যে আমরা সবাই ঐকমত্য পোষণ করব এবং এক সুরে কথা বলব। আগামীতে বগুড়ার উন্নয়ন হবে এটাই প্রত্যাশা সবার।

অন্যদিকে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানান, প্রধানমন্ত্রীর সফরকে ঘিরে স্থানীয় প্রশাসনের নিরাপত্তাসহ সার্বিক প্রস্তুতি জোরদার করা হয়েছে। এই সফর বগুড়াবাসীর স্বপ্ন বাস্তবায়নের সফর।

দৈনিক করতোয়ার সম্পাদক মোজাম্মেল হক লালু বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আমাদের ঘরের ছেলে। তিনি ঘরে ফিরছেন, বিষয়টি আমাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দের। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথমবারের মতো আসছেন তিনি। তার কাছে আমাদের অনেক প্রত্যাশা। এবার তারেক রহমান আসছেন বগুড়ার মানুষের স্বপ্ন বাস্তবায়নের উপলক্ষ হয়ে।

তিনি আরো বলেন, গত ১৭ বছর উন্নয়নবঞ্চিত হয়েছে বগুড়া। সেই বঞ্চনা কাটাতেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এ সফর। এবার বগুড়ার উন্নয়ন বাস্তবতার মুখ দেখবে বলে প্রত্যাশা রাখি। প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে জেলাজুড়ে যে উৎসব ছড়িয়ে পড়েছে তা দেখেও অনেক ভালো লাগছে। সূত্র : বাসস