নীলফামারীর কিশোরগঞ্জে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে স্ক্যাবিস রোগে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা। গত একমাসে একলাখ পাঁচ হাজার শিশু এ রোগে আক্রান্ত হয়েছে। এসব শিশুর বয়স এক থেকে ১০ বছরের মধ্যে।
মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) সকালে কিশোরগঞ্জ হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালটির আউটডোরের জরুরি বিভাগে শত শত মা-বাবা তাদের শিশুদের নিয়ে এসে ডাক্তারের কাছে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কিশোরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়। এ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে শিশু ও চর্ম বিশেষঞ্জ চিকিৎসক না থাকায় মেডিক্যাল অফিসাররা প্রাথমিকভাবে চিকিৎসা দিচ্ছেন। ফলে সঠিক চিকিৎসাসেবা ব্যহত হওয়ার পাশাপাশি রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এ রোগের বিস্তার রোধে দ্রুত শিশু ও চর্ম বিশেষঞ্জ ডাক্তার পদায়নের দাবি জানিয়েছেন।
সরেজমিনে হাসপাতালটির ইনডোরে গিয়ে দেখা যায়, ৫০ শয্যার হাসপাতালটিতে ১১৮ জন রোগী ভর্তি রয়েছে। এদের মধ্যে বেশির ভাগ শিশু স্ক্যাবিসে আক্রান্ত।
ইনডোরে চিকিৎসা নিতে আসা উত্তর দুরাকুটি রওজাতুল উলুম মাদরাসার মোহতামিম হাফেজ মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমার মাদরাসায় ৩৯ জন ছাত্রের মধ্যে ১৮ জন ছাত্র গত তিনদিন ধরে সর্দি, জ্বর,কাশি, মাথাব্যাথা ও চুলকানি রোগে আক্লান্ত হয়। আমি বাচ্চাদের নিয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার কাছে গেলে তিনি বাচ্চাদের আউটডোরে টিকেট নিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান করার পাশাপাশি বাচ্চাদের কাপড় পরিস্কার-পরিছন্ন রাখা, থাকার জায়গা পরিস্কার রাখাসহ বিভিন্ন সর্তকতামুলক পরামর্শ প্রদান করে।’
হাসপাতালে ভর্তি শিশু পলকের মা শেফালী রানী বলেন, ‘গত দুইদিন ধরে আমার বাচ্চার জ্বর, পেটে ব্যাথা ও চুলকানি হলে আমি দ্রত হাসপাতালে নিয়ে আসি। ডাক্তার আমার বাচ্চাকে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা দিচ্ছেন।’
আউটডোরে চিকিৎসা নিতে আসা মাগুড়া ইউনিয়নের শিশুর মা হামিদা বেগম, রণচন্ডি অবিলের বাজারের শিশুর মা শাহানা, ছিটরাজীবের শিশুর বাবা তোফাজ্জল হোসেন বলেন, প্রথমে বাচ্চাদের ত্বকের নানা জায়গায় পানিযুক্ত দানা বা বিচি দেখা দেয় এবং যখন চুলকানি হয় তখন দ্রুত শরীরের অন্য জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। সারারাত বাচ্চা ঘুমাতে পারেনা। রাতে বেশি চুলকায় দ্রুত একজনের শরীর থেকে অন্যজনের শরীরে ছড়িয়ে পড়ে।
হাসপাতালের জরুরি বিভাগের দায়িপ্রাপ্ত আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার মাসুমা আক্তার বলেন, ‘হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা বেশির ভাগ রোগী শিশু। এসব শিশু জ্বর, সর্দি ,কাশি, ডায়রিয়া ও স্ক্যাবিস রোগে আক্রান্ত। আমরা শিশুদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়ার পাশাপাশি রোগটি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিভিন্ন পরামর্শ প্রদান করছি। এর মধ্যে যাদের অবস্থা বেশি খারাপ তাদেরকে হাসপাতালে ভর্তি করে নিচ্ছি।’
এসময় তিনি আরো বলেন, ‘যেসব রোগী আউটডোরে চিকিৎসা নিচ্ছে তাদের মধ্যে শতকরা ২৫ থেকে ৩০ ভাগ রোগী শিশু।’
আউটডোরের টিকিট কাউন্টারের দায়িত্বরত মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট ডেন্টাল জুয়েল মিয়া বলেন, ‘আউটডোরে প্রতিদিন ৭০০ থেকে এক হাজার রোগী বর্হিবিভাগের টিকিট নিয়ে জরুরি চিকিৎসেবা গ্রহণ করছেন। এর মধ্যে শিশু রোগী ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ। তাদের মধ্যে অধিকাংশ শিশু জ্বর, সর্দি কাশি ও স্ক্যাবিশ রোগে আক্লান্ত হয়েছে।’
ইনডোরে দায়িত্বপ্রাপ্ত নার্সিং সুপার ভাইজার ফেরদৌসী আরা খানম বলেন, ‘৫০ শয্যার হাসপাতালটিতে আজকে ১১৮ জন রোগী ভর্তি রয়েছে। জায়গা না থাকায় বেশির ভাগ রোগী মেঝেতে থেকে চিকিৎসা গ্রহণ করছেন। এর মধ্যে যে সকল রোগীর অবস্থা সংকটাপন্ন তাদের উন্নত চিকিৎসার জন্য রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা হচ্ছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘গত ১৫ থেকে ২০ দিন ধরে প্রতিনিয়ত রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছি।’
উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা: নীল রতন দেবের সাথে কথা বললে তিনি বলেন, ‘স্ক্যাবিস রোগটি দিন দিন ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়ছে। এই রোগে আক্রান্ত শিশুর মধ্যে মাদরাসা শিক্ষার্থীরা বেশি। এছাড়া পাঁচ থেকে দশ বছরের শিশুরাই বেশি। বর্তমানে এ উপজেলায় এক লাখের বেশি শিশু এ রোগে আক্রান্ত হয়েছে। আমাদের হাসপাতালে শিশু ও চর্ম বিশেষঞ্জ নেই তাই মেডিক্যাল অফিসাররাই প্রাথমিক চিকিৎসা দিচ্ছেন।’
তিনি দ্রুত শিশু ও চর্ম বিশেষঞ্জ ডাক্তার পদায়নের দাবি জানান।
ডা: নীল রতন দেব আক্লান্ত রোগীদের পরামর্শ দিয়ে বলেন, ‘স্ক্যাবিস রোগটি একপ্রকার অণুজীব দ্বারা সংঘঠিত হয়। এর প্রধান লক্ষন হলো শরীরে চুলকানি ও দানা বা বিচির মত র্যাশ উঠা। এটি স্পর্শেও মাধ্যমে ছড়ায়। তাছাড়া রোগীর ব্যবহৃত কাপড়-চোপড় , বিছানার চাদর ও বালিশ ব্যবহার করলে এ রোগ হতে পারে। তাই আক্রান্ত রোগীর দ্রুত সেরে উঠতে পরিস্কার কাপড়-চোপড় পরিধান ও সচেতন হওয়া জরুরি।’


