মেহেদী হাসান ভূঁইয়া, তাহিরপুর (সুনামগঞ্জ)
সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার ২৩টি হাওরে এবার বাম্পার ধান উৎপাদন হলেও আনন্দের পাশাপাশি বেড়েছে উদ্বেগ। ধান কাটা ও মাড়াই মৌসুমে বজ্রপাতে মৃত্যুর খবরে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন হাওরাঞ্চলের কৃষক-শ্রমিকরা।
হাওরে ধান পেকে যাওয়ায় পুরোদমে কাটার কাজ শুরু হয়েছে। শ্রমিক ও বিভিন্ন যানবাহনে করে কাটা ধান খলায় এনে মাড়াই ও শুকানোর কাজ চলছে। তবে কাজের ফাঁকেই আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকেন কৃষকরা। আকাশে মেঘ জমলেই বজ্রপাতের আশঙ্কায় কাজ বন্ধ করে নিরাপদ আশ্রয়ে ছুটতে হয় তাদের।
টাঙ্গুয়ার হাওরের কৃষক আরিফ আহমেদ বলেন, “মেঘ দেখলেই ত্রিপল দিয়ে ধান ঢেকে খলা ছেড়ে চলে যাই। শ্রমিকরাও কাজ বন্ধ করে দেয়। বজ্রপাতের ভয় সবসময়ই থাকে।”
মাটিয়ান হাওরের কৃষক জহির মিয়া জানান, “আকাশ কখন ভালো, কখন খারাপ—বুঝা যায় না। হঠাৎ অন্ধকার হয়ে ঝড়-বজ্রপাত শুরু হয়। তাই সারাক্ষণ আতঙ্কে থাকি।”
সচেতন মহলের মতে, বজ্রপাতে নিহতদের পরিবার যে সরকারি সহায়তা পায়, তা খুবই অপ্রতুল। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে অনেক পরিবার দিশেহারা হয়ে পড়ে। তাই বজ্রপাত প্রতিরোধ এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য সরকারি সহায়তা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন তারা।
জানা গেছে, গত শনিবার (১৮ এপ্রিল) একদিনেই জেলার বিভিন্ন উপজেলায় বজ্রপাতে ৫ জন নিহত ও ৬ জন আহত হয়েছেন। এছাড়া ৫টি গৃহপালিত পশুও মারা গেছে। এতে করে হাওরাঞ্চলের কৃষকদের মধ্যে উৎকণ্ঠা আরও বেড়েছে। গত ১০ বছরে জেলায় দুই শতাধিক কৃষক-শ্রমিক বজ্রপাতে প্রাণ হারিয়েছেন বলে স্থানীয়দের দাবি।
একই দিনে তাহিরপুর উপজেলার মাটিয়ান হাওরের জামলাবাজ এলাকায় গাজীপুর গ্রামের আবু বকরের ছেলে আবুল কালাম ওরফে কালা মিয়া (২৮) নিহত হন। এ সময় নূর মোহাম্মদ (২৪) গুরুতর আহত হন এবং তাকে সিলেটে উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. নওশাদ আহমেদ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
সুনামগঞ্জ জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে ১১ জন, ২০২১ সালে ১১ জন, ২০২২ সালে ২৪ জন, ২০২৩ সালে ২৯ জন, ২০২৪ সালে ১১ জন, ২০২৫ সালে ১৫ জন এবং ২০২৬ সালের ১৯ এপ্রিল পর্যন্ত ৭ জন বজ্রপাতে প্রাণ হারিয়েছেন।
হাওর নিয়ে কাজ করা সংগঠন ‘হাওর বাঁচাও আন্দোলন’-এর সাধারণ সম্পাদক তোজাম্মিল হক নাসরুমসহ নেতারা বলেন, এটি দেশের অন্যতম বজ্রপাতপ্রবণ এলাকা। আধুনিক ও টেকসই প্রযুক্তি ব্যবহার করে দ্রুত বজ্রপাত প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন, যাতে কৃষক, শ্রমিক ও জেলেরা নিরাপদে কাজ করতে পারেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বজ্রপাতের প্রবণতা বিবেচনায় সরকার ২০১৬ সালে প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বজ্রপাতকে দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ২০২৪ সালে সুনামগঞ্জের ৬টি উপজেলায় ১৮টি লাইটনিং অ্যারেস্টার স্থাপন করা হয়, যার ব্যয় ধরা হয় ১ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। তাহিরপুর উপজেলায় স্থাপন করা হয়েছে ৩টি যন্ত্র।
সুনামগঞ্জ জেলা দুর্যোগ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ হাসিবুল হাসান জানান, এসব বজ্র নিরোধক যন্ত্রের কার্যকারিতা পুরোপুরি যাচাই করা হয়নি। তবে বজ্রপাতে আহতদের নগদ সহায়তা দেয়া হয় এবং সচেতনতা বাড়াতে বিভিন্ন উপজেলায় প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) শাহরুখ আলম শান্তনু বলেন, “বৃষ্টি ও ঝড় শুরু হলে সবাইকে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার জন্য বলা হচ্ছে। এই সময় সবাইকে আরো সচেতন থাকতে হবে।”


