ভোলায় বাড়ছে হাত পাখার কদর

‘তীব্র গরমে আগের মতো আবারো বাড়ছে হাত পাখার চাহিদা। এলাকায় দিনের বেশিরভাগ সময় বিদ্যুৎ থাকে না। তাই এমন গরমের দিনে হাতপাখাই একমাত্র ভরসা।’

লালমোহন (ভোলা) সংবাদদাতা

Location :

Bhola
তাল পাতার তৈরি হাতপাখা
তাল পাতার তৈরি হাতপাখা |নয়া দিগন্ত

ভোলার লালমোহনের পল্লী অঞ্চলের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে তীব্র তাপদাহে অসহনীয় গরমে হাত পাখার কদর বাড়ছে। গ্রামের মানুষের কাছে প্রচণ্ড গরমে শান্তির পরশ দেয়া তালপাখা এখন ক্রমশই হারিয়ে যাচ্ছে। প্রচণ্ড গরমে দেহে ও মনে শান্তির পরশ লাগানো বাংলার ঐতিহ্যবাহী তালপাখা আধুনিক প্রযুক্তির প্রভাবে ভোলাসহ লালমোহনের উপকূলীয় এলাকা তথা দক্ষিণাঞ্চল থেকে ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে।

আগে প্রায়ই তালগাছের পাতায় তৈরি পাখায় লেখা থাকতো ‘তালের পাখা প্রাণের সখা, শীতকালে হয় না দেখা, গরমকালে হয় যে দেখা।’

আবহমান কালের গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যময় ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ এই তালের পাখা। বর্তমানে পল্লী বিদ্যুতের অসহনীয় লোডশেডিং যখন জনজীবনে বিপর্যস্ত তখনই ফের কদর বাড়ছে হারানো ঐতিহ্য হাত পাখার। চৈত্র-বৈশাখ মাসে তীব্র দাবদাহ শুরু হলেই স্মরণ হতো বন বাঁশ ও বেতগাছের পাখার পাশাপাশি তাল পাতার তৈরি হাত পাখার। প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কাছে গরমকাল মানেই হাতপাখার কদর বেড়ে যাওয়া। এটা যেন তাদের পরম বন্ধু।

বাংলাদেশের শ্রমিক শিল্পী আকবরের গাওয়া সেই বিখ্যাত রোমান্টিক গান, ‘তোমার হাত পাখার বাতাসে প্রাণ জুড়িয়ে আসে, আরো কিছু সময় তুমি থাকো আমার পাশে’ গান পাগল শ্রোতারা আজো ভুলে যায়নি সেই স্মৃতির কথা। তবে আজকাল প্লাস্টিক ও বৈদ্যুতিক পাখা, এয়ার কন্ডিশনার ইত্যাদি আধুনিক সামগ্রীর বাজারে একচ্ছত্র আধিপত্যে তালপাখা ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে।

তবে যতই আধুনিক সামগ্রী সহজলভ্য হোক না কেনো তালপাখার শীতল পরশ আর কিছুতে পাওয়া যায় না। ঘন ঘন লোডশেডিং, পল্লী বিদ্যুতের ভেলকিবাজিতে অতিষ্ঠ হয়ে গ্রামের মানুষ এখন হাত পাখাকে ঠাণ্ডার পরশ হিসেবে বেচে নিয়েছেন। এক সময় পাত পাখা বিক্রি করে প্রচুর অর্থ উপার্জন করতো গ্রামের নারীরা। তবে কাঁচামালের সঙ্কট ও মুনাফা কম হওয়ায় এই পেশাও পালটে ফেলছেন তালপাখার কারিগররা। যারা এখনো এ পেশায় আছেন তাদের অবস্থা ভালো নয়। কোনোরকমে টিকে থাকার জন্য প্রতিনিয়তই সংগ্রাম করছেন তারা। আবার কেউ কেউ বাংলার বিভিন্ন উৎসবে হাজার বছরের ঐতিহ্যকে সম্বল করে তৈরি করছেন এই তালের পাখা।

লালমোহনের তালপাখা কারিগর লেঙ্গটিয়ার বিনোদ চন্দ্র ও কৃষ্ণা রানী জানান, একটি তালের পাতায় দু’টি পাখা তৈরি করা যায়। পুরো একটি পাখা বানাতে ব্যয় হয় ১২ থেকে ১৫ টাকা। সেগুলো বাজারে ফেরি করে বিক্রি করলে ১৮ থেকে ২০ টাকা দাম পাওয়া যেতো, এখন ৪০ থেকে ৫০ টাকা বিক্রি করা যায়।

লালমোহনের আরেক হাতপাখা শিল্পী নুরনাহার বেগম জানান, প্রথমে তালপাতা গাছ থেকে সংগ্রহ করে রোদে শুকাতে হয়। এরপর পাতাকে পাখার মতো আকার দেয়া হয়। পরে তা সুতার সাহায্যে বাঁধাই করা হয়। এরপর হাতল ও পাখার বাড়তি অংশ কেটে ফেলে রঙ করলেই তা বিক্রির উপযোগী হয়ে ওঠে।

জানা যায়, পাখা সেলাই করা থেকে যাবতীয় কাজ সম্পন্ন করে গ্রামের গৃহবধূরা আর তা বাজারজাত করতেন পুরুষরা। একজন কারিগর সারাদিন কাজ করে ৫০ থেকে ৫৫টি পাখা তৈরি করতে পারেন। কিন্তু নানান প্রতিবন্ধকতায় অনেকে এ পেশা বদল করলেও অধিকাংশ কারিগরের দাবি বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রশিক্ষণ ও পৃষ্ঠপোষকতা পেলে টিকে থাকবে বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্যময় তালের পাখা। তীব্র গরমে দেবে শীতল বাতাসের ছোঁয়া।

লালমোহন উপজেলার রমাগঞ্জের আবুল কালাম মিয়া, আ: সহিদ, শাহাবুদ্দীন মাস্টার প্রমুখ বলেন, আগে আমাদের এলাকায় বিদ্যুৎ ছিল না, বৈদ্যুতিক পাখা ছিল না তাই গরমে হাত পাখাই সকল পরিবারের মানুষের কাছে হাত পাখার আলাদা কদর ছিল। এখন প্রায় এলাকায় বিদ্যুৎ চালু হওয়ায় হাত পাখার গুরুত্ব অনেকটা কমে গেছে। তবে আমাদের এলাকায় দিনের বেশিরভাগ সময় বিদ্যুৎ থাকে না। তাই এমন গরমের দিনে হাতপাখাই একমাত্র ভরসা।

উপজেলার একাধিক প্রবীণ ব্যক্তি বলেন, তীব্র গরমে বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ে হাতপাখার কদর কমেনি বরং বাড়ছেই। গ্রামের মানুষ হাতপাখা বাদ দিয়ে প্রচণ্ড গরম এড়িয়ে যেতে পারে না। তাই বর্তমান সময়েও হাত পাখার কদর ভোলার মতো নয়।