মাদারীপুরে রবি শস্য ক্ষেতের পাশে বাড়ছে ভ্রাম্যমাণ মধুচাষ। তাই এই পেশায় ঝুঁকছেন নতুন নতুন উদ্যোক্তা। কর্মসংস্থান তৈরি হওয়ায় সাবলম্বী হচ্ছেন বেকার যুবকরা।
পাশাপাশি মৌমাছির পরাগায়ন হওয়ায় সরিষা, ধনিয়া ও কালিজিরার উৎপাদনও বৃদ্ধি পাচ্ছে। সেইসাথে খাঁটি মধু হাতে পাওয়ায় খুশি ক্রেতারাও। অন্যদিকে ভ্রাম্যমাণ মৌচাষীদের সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস কৃষি বিভাগের।
সরেজমিনে দেখা যায়, চারদিক শুধু হলুদ আর হলুদ। বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে এ দৃশ্য দেখতে প্রতিদিনই বিকেলে ছুটে আসছে শিশু-কিশোরসহ প্রকৃতিপ্রেমিরা। সরিষা ক্ষেতে বাড়ছে দর্শনার্থী।
জানা যায়, মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার পূর্ব এনায়েতনগরে সরিষা ক্ষেতের পাশে ৩০০ বাক্স নিয়ে চলতি বছর ভ্রাম্যমাণ মধুচাষ করেন খামারি ইব্রাহিম মিয়া। এই মৌসুমে আট লাখ টাকা ব্যবসার আশা তার। শুধু ইব্রাহিম মিয়াই নন; তার মতো জেলার বিভিন্ন এলাকার সরিষা, ধনিয়া ও কালিজিরাসহ রবি শস্যের ক্ষেতের পাশে বসানো হয়েছে মৌমাছির ভ্রাম্যমাণ বাক্স। স্বল্প পুঁজিতে অধিক লাভ হওয়ায় অনেকেই ঝুঁকছেন এই পেশায়। এতে বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান হওয়ায় খুশি তারাও।
জেলায় আড়াই শ’র বেশি ভ্রাম্যমাণ মৌচাষী রয়েছে। এক একজন মৌচাষীর খরচ বাদ দিয়ে এই মৌসুমে লাভের আশা আট থেকে ১০ লাখ টাকা। বছরের ছয়-আট মাস মধু সংগ্রহে ব্যস্ত সময় কাটান মৌচাষীরা। সরকারি ও বেসরকারিভাবে সহযোগিতা করা গেলে বিদেশে মধু রফতানী করে পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব বলে জানান চাষীরা।
এছাড়া মৌমাছির পরাগায়নে বেড়েছে সরিষা, ধনিয়া ও কালিজিরার ফলন, আর উৎপাদন হচ্ছে খাঁটি মধু। বাড়ির পাশে ভালো মানের মধু পাওয়ায় খুশি ক্রেতারাও। কিনতে ভিড় করছেন তারা।
জেলা কৃষি অফিস সূত্র বলছে, চলতি অর্থবছরে ধনিয়ার লক্ষ্যমাত্রা চার হাজার ৯৬৭ হেক্টর ধরা হলেও উৎপাদন হয়েছে পাঁচ হাজার ৭৮ হেক্টর। কালোজিরার লক্ষ্যমাত্রা দুই হাজার ৩৪২ হেক্টর ধরা হলেও ফলন বেশি হওয়ায় উৎপাদন হয়েছে দুই হাজার ৪৫১ হেক্টর। আর সরিষার লক্ষ্যমাত্রা ১৭ হাজার হেক্টর ছিল। ৫৬০ হেক্টর বেশি উৎপাদন হওয়ায় তা দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ৫৬০ হেক্টরে।

কাজী ইকবাল হোসেন বাবু নামে এক মধু ক্রেতা বলেন, ‘চোখের সামনেই নির্ভেজাল মধু উৎপাদন হচ্ছে। খাঁটি মধু এখান থেকে কিনে নিয়েছি, যা সারাবছর খেতে পারব। গতবছরও মধু কিনে নিয়েছিলাম এমন ভ্রাম্যমাণ মৌচাষীদের কাছ থেকে।’
রাতিন ইসলাম নামে এক মৌচাষী বলেন, ‘এখন থেকে ছয় মাসের আয় দিয়ে সারাবছর সংসার চালাই। প্রতিবছর খরচ বাদে দুই-চার লাখ টাকা ব্যবসা হয়। আমার খামারে কাজ করেন চারজন।’
আরেক মৌচাষী ইব্রাহীম মিয়া বলেন, ‘প্রথমে আমার দেড় শ’ মৌ বাক্স ছিল। পাঁচ বছরের মাথায় আমার এখন ৪৫০টি বাক্স রয়েছে। আমি বিভিন্ন জেলায় ঘুরে ঘুরে এই মৌচাষ করে থাকি। এর মাধ্যমে সংসার খুব ভালোই চলছে। আমরা উৎপাদিত মধু দেশের বাইরেও যায়। এছাড়া সরকারিভাবে একটু সহযোগিতা পেলে আরো বেশি সাবলম্বী হতে পারব।’
কালকিনির পূর্ব এনায়েতনগর ইউনিয়নের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো: জোবায়ের হোসেন বলেন, ‘ইউনিয়নে বেশ কয়েকজন ভ্রাম্যমাণ মৌচাষী রয়েছে। দিনভর বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে তাদের দিক নির্দেশনামূলক পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। কৃষি বিভাগের এই পরামর্শের মাধ্যমে তারা আরো বেশি বেশি মধু উৎপাদন করতে আগ্রহ দেখাচ্ছে।’
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের মাদারীপুরের উপপরিচালক ড. রহিমা খাতুন জানান, ভ্রাম্যমাণ মৌচাষীদের সবধরনের সহযোগিতা করা হচ্ছে। যেকোনো পরিস্থিতিতে পাশে আছে কৃষি বিভাগ। প্রান্তিক চাষীদের ভ্রান্ত ধারণা ছিল এই মৌমাছির চাষ করলে ফসলের ক্ষতি হবে, সেই ধারণা দূর করেছে কৃষি বিভাগ। এছাড়া মৌচাষীদের নানান পরামর্শ ও দিক নির্দেশনাও দেয়া হচ্ছে।



