মাদারীপুরের শিবচরে প্রকাশ্যে চলছে জুয়া ও মাদকের রমরমা ব্যবসা। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলছে প্রায় কোটি টাকার লেনদেন। জুয়া ও মাদকের প্রভাবে বাড়ছে চুরি, ছিনতাই, মাদকসেবন ও সামাজিক অস্থিরতা। যার ফলে আতঙ্ক, ক্ষোভ ও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে শিবচরের সাধারণ জনগণ। জুয়াড়ি, মাদকসেবী এবং মাদককারবারিরা প্রকাশ্যেই বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে প্রশাসনকে।
স্থানীয়দের মাধ্যমে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সকাল হলেই শিবচরের বিভিন্ন নির্জন এলাকা মাঠ, ইটভাটা, স্কুল এবং কলেজের পেছনের ফাঁকা জায়গা ও সীমান্তবর্তী চরাঞ্চল পরিণত হয় জুয়া এবং মাদকের আড্ডায়। মোটরসাইকেলযোগে দূর-দূরান্ত থেকে জুয়াড়িরা এবং মাদকসেবীরা এসে জড়ো হয়। তাদের মাদক সেবন চলে মধ্যরাত পর্যন্ত, এমনকি কখনো ভোর পর্যন্ত চলে।
শিবচরে সবচেয়ে বড় জুয়া ও মাদকের আসর বসে শিবচরের উমেদপুর ইউনিয়নের ড. নুরুল আমিন কলেজের পেছনে হিন্দু বাবুর ভিটা এলাকায়।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, শিবচরের শীর্ষ জুয়াড়ী ও ইয়াবা সম্রাট শওকত ঢালী, কালু ঢালী ও হালান ঢালীর নেতৃত্বে দীর্ঘদিন ধরে পরিচালিত হচ্ছে এই জুয়ার আসর ও মাদকের ব্যবসা। শুধু জুয়াই নয়, সেখানে ইয়াবাসহ বিভিন্ন প্রকার মাদক সেবন ও মাদক ক্রয়-বিক্রয় হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে আমাদের শিবচরের যুব সমাজ।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, জুয়াড়িদের পরিবহনের জন্য গড়ে উঠেছে আলাদা মোটরসাইকেল সিন্ডিকেট। খবির খান ও বারেক মিয়া নামের দুই চালকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন এলাকা থেকে জুয়াড়িদের বহনের অভিযোগ রয়েছে। প্রতিদিন ৪০ থেকে ৫০টি মোটরসাইকেলে করে জুয়াড়িরা সেখানে পৌঁছান।
শুধু শিবচর নয়, নাওডোবা, জাজিরা, শরীয়তপুর, ভাঙ্গা, ফরিদপুর, মাদারীপুর, কালকিনি, খাসেরহাট ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকেও জুয়াড়িরা অংশ নিচ্ছে এসব জুয়ার আসরে।
স্থানীয়দের দাবি, অন্তত ছয়টি স্থানে নিয়মিত বসছে জুয়ার আসর। এর মধ্যে রয়েছে চান্দেরচর ড. নুরুল আমিন কলেজের পেছনে হিন্দু বাবুর ভিটা, চান্দেরচর ইটের ভাটার পাশে লিওন ঢালীর গরুর খামারের পাশে, কুতুবপুরের সীমানায় পিলারের নিচে সামু মাদবরের বাড়ির পাশে, মাদবরেরচর ইউনিয়নের নাসিরের মোড় এলাকা, ভদ্রাসন ইউনিয়নের ক্রোকচর আ: জব্বার মেম্বারের বাড়ির পাশে এবং কাঁওড়াকান্দি পুরাতন ফেরিঘাটে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট ছোট পরিসরে শুরু হওয়া এই জুয়ার আসর ও মাদকের ব্যবসা এখন ভয়ানক আকার ধারণ করেছে। রাতভর মোটরসাইকেলের শব্দ, অপরিচিত লোকজনের আনাগোনা এবং অবৈধ অর্থের অবাধ লেনদেনে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যহত করছে।
শিবচর উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক ইমতিয়াজ আহমেদ (তুরাগ) খান দৈনিক নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি আমার জন্মস্থান উমেদপুর ইউনিয়নকে মাদকমুক্ত করতে যত ধরনের সহযোগিতা লাগে আমি প্রশাসনকে সহযোগিতা করবো। আমি চিরতরে মাদককে নির্মূল করতে চাই। মাদক এবং জুয়া আমাদের পুরো এলাকায় সয়লাব হয়ে গিয়েছে। রাত হলেই এলাকায় আতঙ্ক শুরু হয়। অচেনা বাইরের লোকজন এসে ভীড় জমায়। কেউ প্রতিবাদ করতে সাহস পায় না। যুব সমাজ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু দেখার কেউ নেই। আমাদের যুব সমাজকে বাঁচাতে হলে প্রশাসনকে কঠোর ভূমিকা পালন করতে হবে।’
একজন অভিভাবক অ্যাডভোকেট রাহাত সিদ্দিকী বলেন, ‘জুয়া এবং মাদক যুব সমাজ ধ্বংসের অন্যতম হাতিয়ার। জুয়ার টেবিলে মানুষ শুধু টাকা হারায় না, হারায় নিজের বুদ্ধি, বিবেক, আত্নসম্মান, পরিবারের শান্তি এবং সন্তানদের ভবিষ্যৎ। প্রতিনিয়ত যারা জুয়ার আসরে বসছে,তারাই একের পর এক অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।’
স্থানীয়দের অভিযোগ,শিবচরের কয়েকজন ভুয়া সাংবাদিক ঘটনাস্থলে গেলেও এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর সংবাদ প্রকাশ করেনি।তাঁরা উল্টো মাদককারবারি এবং জুয়াড়ীদের নিকট থেকে নিয়মিত মাশোহরা গ্রহণ করে।এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে আরো সন্দেহের তীর ও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, প্রশাসনের মাধ্যমে দ্রুত অভিযান চালিয়ে এসব অবৈধ জুয়ার আসর বন্ধ করতে হবে এবং জড়িতদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় শিবচরের বিস্তীর্ণ জনপদ ভয়াবহ সামাজিক অবক্ষয়ের মুখে পতিত হবে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
এ বিষয়ে শিবচর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মঞ্জুরুল মোর্শেদ বলেন, ‘আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি। ইতোমধ্যে বেশ কিছু জুয়াড়ী এবং মাদককারবারিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতিতে কাজ করছে পুলিশ।’
স্থানীয় সংসদ সদস্য সাইদ উদ্দিন আহমাদ হানজালা দৈনিক নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘জুয়া এবং মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের কঠোর কর্মসূচি রয়েছে। আমি এমপি হওয়ার আগে থেকেই জুয়া এবং মাদকের বিরুদ্ধে কাজ করতেছি। আমি বেশ কয়েকজনকে ধরে আইনের হাতে সোপর্দ করছি। কয়েকদিন পরে জামিনে বের হয়ে আবার পুরোনো ব্যবসা করে। শুধু একা আমার পক্ষে জুয়া এবং মাদক ধ্বংস করা সম্ভব না। প্রশাসনকে কঠোর ভূমিকা পালন করতে হবে। আমি মাদারীপুর-২ ও মাদারীপুর-৩ আসনের এমপিদের নিয়ে জেলা জজ সাহেবের সাথে কথা বলে স্থায়ীভাবে জুয়ার আসর ও মাদক ব্যবসা বন্ধ করবো, ইনশাআল্লাহ!’
শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এইচ এম ইবনে মিজান সাংবাদিকদের জানান, ইতোমধ্যে জুয়া এবং মাদকের বিরুদ্ধে আমরা কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছি। স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবারের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতেই আমরা অভিযান পরিচালনা করে বেশ কয়েকজনকে ধরতে সক্ষম হয়েছি। বর্তমান সরকারের মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতির অংশ হিসেবে শিবচরের প্রতিটি ইউনিয়নে এ ধরনের অভিযান নিয়মিত পরিচালনা করা হবে।
মাদারীপুরের শিবচর সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মো: সালাহ উদ্দিন কাদের বলেন, ‘জুয়াড়ি ও মাদকের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে বিশেষ অভিযান শুরু হয়েছে। জুয়াড়ি ও মাদক কারবারি এবং জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে। তাদের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে।’



