দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় জেলা ঝালকাঠির লবণশিল্প এক সময় স্থানীয় অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ চালিকা শক্তি ছিল। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সেই শিল্প এখন নানা সঙ্কটে জর্জরিত। বিশেষ করে ন্যায্য মজুরি না পাওয়ায় লবণ শ্রমিকদের জীবনযাত্রা ভয়াবহ দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। দিনভর কঠোর পরিশ্রম করেও ন্যূনতম পারিবারিক চাহিদা পূরণে হিমশিম খাচ্ছেন তারা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিন ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রখর রোদে কাজ করেও একজন শ্রমিক গড়ে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা পর্যন্ত মজুরি পান, যা বর্তমান বাজার দরের তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল। ফলে পরিবার চালাতে অনেকেই বাধ্য হয়ে এনজিও বা মহাজনের কাছ থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নিচ্ছেন। উৎপাদন ব্যবস্থার দুর্বলতা ও প্রযুক্তির অভাবও এই সঙ্কটকে আরো বাড়িয়ে তুলেছে। আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাবে উৎপাদন কম হওয়ায় অনেক সময় কারখানা বা মাঠ পুরোপুরি চালু রাখা সম্ভব হয় না। এতে শ্রমিকদের কর্মসংস্থান অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। পাশাপাশি কাজের সময়ে কাজ না থাকায় তাদের আয়ের উৎস প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। স্বাস্থ্যঝুঁকিও এই পেশার একটি বড় সমস্যা। দীর্ঘ সময় লবণের মাঠে কাজ করার কারণে অনেক শ্রমিক চর্মরোগ, চোখের সমস্যা ও পানিশূন্যতায় ভুগছেন। কিন্তু তাদের জন্য নেই পর্যাপ্ত চিকিৎসা সুবিধা বা স্বাস্থ্য সুরক্ষা ব্যবস্থা।
লবণ শ্রমিক রফিক সরদার বলেন, ‘সারাদিন লবণের কাজ করি, কিন্তু যা পাই তা দিয়ে চাল-ডালই ঠিকমতো কেনা যায় না। সন্তানদের পড়াশোনা করানো তো দূরের কথা, অনেক সময় দু’বেলা খাবার জোটানোও কঠিন হয়ে পড়ে।’
নারী শ্রমিক মালা রানী জানান, ‘সারাদিন খাটুনি করি, রোদ-বৃষ্টির মধ্যে কাজ করি। কিন্তু দিনের শেষে যে মজুরি পাই, তা দিয়ে সংসার চালানো খুবই কঠিন। বাজারে সবকিছুর দাম বাড়ছে, কিন্তু আমাদের মজুরি বাড়ে না। অনেক সময় ঠিকমতো টাকা পর্যন্ত পাই না। আমাদের কষ্ট কেউ দেখে না, শোনে না। আমরা শুধু চাই আমাদের কাজের ন্যায্য মূল্যটা যেন দেয়া হয়।’
অর্থনীতিবিদদের মতে, লবণ শিল্প একটি কৌশলগত খাত, যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও স্থানীয় অর্থনীতির সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত। তাই এই খাতকে টিকিয়ে রাখতে হলে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা, সরাসরি বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি, দালাল চক্র নিয়ন্ত্রণ এবং সরকারি ভর্তুকি ও সহজ ঋণ সুবিধা প্রদান জরুরি।
হ্যান্ডলিং শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মো: কুদ্দুস হাওলাদার বলেন, ‘আমাদের শ্রমিকরা দিন-রাত কঠোর পরিশ্রম করে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে তারা তাদের প্রাপ্য ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে যে মজুরি দেয়া হচ্ছে, তা দিয়ে একটি শ্রমিক পরিবারের ন্যূনতম জীবনযাপনও সম্ভব নয়। আমরা বারবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানিয়েছি-মজুরি কাঠামো পুনর্বিবেচনা করে শ্রমিকদের জন্য একটি মানবিক ও বাস্তবসম্মত মজুরি নির্ধারণ করতে হবে। অন্যথায় এই বৈষম্য দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করবে।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক মিল মালিক জানান, ‘নীতিমালা অনুযায়ী শ্রমিকদের মজুরি দেয়া হচ্ছে। তবে মজুরি বাড়ানোর বিষয়টি বোর্ড সভায় আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।’
ঝালকাঠির লবণশ্রমিকদের এই নীরব সঙ্কট দীর্ঘদিন ধরে চললেও কার্যকর সমাধান এখনো দৃশ্যমান নয়। দ্রুত নীতিগত উদ্যোগ না নিলে শুধু একটি শিল্প নয়, বরং বৃহৎ শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎই অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে।



