সিলেটে ২ পরিবহন শ্রমিকের মৃত্যু ঘিরে পাল্টাপাল্টি মামলা, ১৯ মে ধর্মঘটের ডাক

‘শ্রমিকদের মধ্যে মারামারি হলো, দু’জন মারা গেলো। এর জের ধরে মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে ধর্মঘট আহ্বানের নামে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করা আইনের শাসনের পরিপন্থি। যেখানে জনগণের কোনো সম্পৃক্ততা নেই, সেখানে জনগণকে জিম্মি করে কর্মসূচি পালন কোনোভাবেই সঠিক প্রতিবাদ হতে পারে না।’

সিলেট ব্যুরো

Location :

Sylhet
সিলেট নগরীর কদমতলী কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল
সিলেট নগরীর কদমতলী কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল |নয়া দিগন্ত

আগামী ১৯ মে ভোর ৬টা থেকে সিলেট বিভাগে অনির্দিষ্টকালের পরিবহন শ্রমিক ধর্মঘটের ঘোষণা করেছেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন বিভাগীয় কমিটির নেতারা।

সিলেট নগরীর কদমতলী কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে পরিবহন শ্রমিকদের অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষের ঘটনায় দুই শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনা ঘিরে পাল্টাপাল্টি মামলা হয়েছে। ওই মামলার জেরে পরিবহন ধর্মঘটের ডাক দেয়া হয়েছে।

তবে সচেতন মহল বলছেন, শ্রমিক নেতারা মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে ধর্মঘটের ডাক দিয়ে এর দায় জনগণের ঘাড়ে চাঁপানোর চেষ্টা করছে। তাদের মামলার জন্য জনগণ কেন দুর্ভোগের শিকার হবেন এ ব্যাপারে তাদের জিজ্ঞাসা করা উচিত।

বৃহস্পতিবার (১৪ মে) রাতে নগরীর দক্ষিণ সুরমায় ফেডারেশনের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত জরুরি সভায় মামলা থেকে কমিটির বিভাগীয় সভাপতি ময়নুল ইসলাম, যুগ্ম সম্পাদক আলী আকবর রাজন, কোষাধ্যক্ষ আব্দুস শহীদসহ শীর্ষস্থানীয় শ্রমিক নেতাদের নাম প্রত্যাহারের দাবিতে ধর্মঘটের ডাক দেয়া হয়।

তবে ফেডারেশনের বিভাগীয় সহ-সভাপতি ও জেলা বাস, মিনিবাস, কোচ, মাইক্রোবাস শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মুহিমের নাম সংযুক্ত না করায় ক্ষুব্ধ হয়েছেন শ্রমিক সংগঠনের কেউ কেউ।

তাদের দাবি, যেহেতু পাল্টাপাল্টি মামলায় আব্দুল মুহিমকে আসামি করা হয়েছে, তাই কর্মসূচিতে তার নামও যুক্ত করা প্রয়োজন ছিল। এর মাধ্যমে মূলত শ্রমিক সংগঠনের বিভক্তি প্রকাশিত হলো। যা শ্রমিকদের মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে।

জরুরি সভায় ফেডারেশনের বিভাগীয় নেতৃবৃন্দ ছাড়াও সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার প্রতিনিধিত্বশীল সড়ক পরিবহন শ্রমিক সংগঠনের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

ফেডারেশনের সিলেট বিভাগীয় কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি দেলোয়ার হোসেনের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক সজিব আলীর পরিচালনা অনুষ্ঠিত সভায় বক্তব্য রাখেন সুনামগঞ্জ জেলা বাস, মিনিবাস, কোচ, মাইক্রোবাস শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক নুরুল হক, সুনামগঞ্জ জেলা ট্রাক, পিকাপ, কাভার্ড ভ্যান শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি ফয়েজুর নুর, সাধারণ সম্পাদক নুর উদ্দিন, সুনামগঞ্জ জেলা সিএনজি শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি কালা মিয়া, মৌলভীবাজার জেলা ট্রাক, পিকাপ, কার্ভাড ভ্যান শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি অদুদ আহমদ, সিলেট জেলা ট্রাক, পিকাপ, কার্ভড ভ্যান শ্রমিক ইউনিয়নের কার্যকরী সভাপতি কাওসার আহমদ, কোষাধ্যক্ষ বাদল আহমদ, সিলেট জেলা সিএনজি অটোরিকশা শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আজাদ মিয়া, সিলেট জেলা ইমা লেগুনা শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ইনসান আলী, সিলেট জেলা বাস, মিনিবাস, কোচ, মাইক্রোবাস শ্রমিক ইউনিয়নের সহ-সাধারণ সম্পাদক মাহবুব মিয়া, সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল হাসনাত আবুল, প্রচার সম্পাদক হারিছ আলী প্রমুখ।

সভায় নেতৃবৃন্দ বলেন, গত ২৭ এপ্রিল সিলেট কদমতলী বাস টার্মিনালে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরিবহন শ্রমিকদের শীর্ষ সংগঠনের বিভাগীয় সভাপতি ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকসহ নিরপরাধ শ্রমিক নেতৃবৃন্দকে আসামি করার ঘটনায় সর্বস্তরের শ্রমিক নেতৃবৃন্দ ক্ষুব্ধ। আমরা উক্ত ঘটনা ও অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানাচ্ছি।

কিন্তু এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরিবহন শ্রমিকদের ঐক্য বিনষ্টের কোনো ষড়যন্ত্র শ্রমিক সমাজ মেনে নিবে না। আমরা খোঁজ নিয়ে জেনেছি, সেদিন ঘটনার সময় ফেডারেশনের বিভাগীয় সভাপতি হাজী ময়নুল ইসলাম, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আলী আকবর রাজন, কোষাধ্যক্ষ আব্দুস শহিদসহ শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ নাজিরবাজারে শ্রমিক সংগঠনের নির্বাচন পরিচালনায় দায়িত্ব পালন করেছেন।

তারা ঘটনা শুনে সেখানে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। সেই ঘটনায় নিরীহ শ্রমিক নেতৃবৃন্দকে আসামি করা হয়েছে, যা দুঃখজনক। আমরা এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে আগামী ১৯ মে ভোর ৬টা থেকে সিলেট বিভাগে সর্বাত্মক সড়ক পরিবহন শ্রমিক কর্মবিরতি সফলের জন্য শ্রমিকদের প্রতি আহ্বান জানান তারা।

এ ব্যাপারে সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সিলেট বিভাগীয় সহ-সভাপতি ও জেলা বাস, মিনিবাস, কোচ, মাইক্রোবাস শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মুহিম দৈনিক নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘নেতৃবৃন্দের মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে পরিবহন ধর্মঘট আহ্বান করা হলো কিন্তু আমার নাম সংযুক্ত করা হলো না। অথচ আমি দু’টি মামলার আসামি। তবুও উক্ত কর্মসূচিতে আমার সম্মতি রয়েছে। আমার বিশ্বাস বিভাগীয় নেতৃবৃন্দ কর্মসূচিতে আমার মামলা প্রত্যাহারের দাবির বিষয়টি সংযুক্ত করবেন।’

এ ব্যাপারে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সিলেটের সেক্রেটারি মো: মিজানুর রহমান দৈনিক নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘শ্রমিকদের মধ্যে মারামারি হলো, দু’জন মারা গেলো। এর জের ধরে মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে ধর্মঘট আহ্বানের নামে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করা আইনের শাসনের পরিপন্থি। যেখানে জনগণের কোনো সম্পৃক্ততা নেই, সেখানে জনগণকে জিম্মি করে কর্মসূচি পালন কোনোভাবেই সঠিক প্রতিবাদ হতে পারে না। এ ব্যাপারে পরিবহন শ্রমিক নেতৃবৃন্দ ও সরকারের সংশ্লিষ্ট বিষয়ের হস্থক্ষেপ করা উচিত বলে মনে আমি মনে করি।’

এ বিষয়ে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘শ্রমিক সংগঠনের সংঘর্ষে দু’টি তাজা প্রাণ ঝরে যাওয়ার ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক। এতে মামলা হওয়া স্বাভাবিক। পুলিশ প্রশাসন মামলার তদন্ত করছে। সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষাসহ তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহারে প্রকৃত আসামিরা আইনের আওতায় আসবে। এটিকে কেন্দ্র করে পরিবহন ধর্মঘটের নামে জনগণকে জিম্মি করার সুযোগ নেই। পরিবহন শ্রমিক নেতাদের এ ধরনের জনদুর্ভোগ সৃষ্টিকারী কর্মসূচি পালন থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানাচ্ছি।’

সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘পরিবহন শ্রমিক নেতাদের সাথে কথা হয়েছে। শনিবার (১৬ মে) তাদের সাথে একটি সভা হবে। উক্ত সভায় বিস্তারিত আলাপ হবে। জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হয় এমন কর্মসূচি পালনের কোনো সুযোগ দেয়া হবে না।’

উল্লেখ্য, গত ২৭ এপ্রিল নগরীর কদমতলীস্থ সিলেট কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে সিলেট-জগন্নাথপুর রুটে পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের আহ্বায়ক কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে পরিবহন শ্রমিকদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষ চলাকালে বিভিন্ন বাস ও টিকিট কাউন্টার ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এতে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং একাধিক শ্রমিক আহত হন।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রথমে পুলিশ মোতায়েন করা হলেও পরে সেনাবাহিনী গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এরপর ধীরে ধীরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। এই ঘটনায় সাতজন শ্রমিককে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এর মধ্যে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দু’জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়।

গত ২ মে চিকিৎসাধিন অবস্থায় সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে মারা যান পরিবহন শ্রমিক রিপন আহমদ (৩০)। এ ঘটনায় নিহতের বাবা গোলাপগঞ্জ উপজেলার রণকেলী উত্তর গ্রামের ছাবলু মিয়া গত ৫ মে দক্ষিণ সুরমা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।

মামলায় সিলেট জেলা বাস, মিনিবাস, কোচ, মাইক্রোবাস পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি ময়নুল ইসলামকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। মামলায় সাবেক ছাত্রদল নেতা ও শ্রমিক ইউনিয়নের বর্তমান যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আলী আকবর রাজনসহ (৩৬) মোট ২৯ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া মামলায় অজ্ঞাতপরিচয় আরো ৬০ জনকে আসামি করা হয়েছে।

এদিকে গত ৭ মে ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান অপর শ্রমিক দেলোয়ার হোসেন (৩৫)। এই ঘটনায় নিহতের বাবা সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার বাঘবাড়ী গ্রামের মো: আজির উদ্দিন দক্ষিণ সুরমা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।

মামলায় জেলা বাস, মিনিবাস, কোচ, মাইক্রোবাস পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মুহিমসহ ১৯ জনের নাম উল্লেখ করা হয়। এছাড়া মামলায় অজ্ঞাত আরো ১০-১৫ জনকে আসামি করা হয়।

দু’টি মামলাই বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে বলে জানিয়েছেন এসএমপির দক্ষিণ সুরমা থানার ওসি আশরাফুজ্জামান।