লোডশেডিংয়ের কারণে তাঁত শিল্পে জ্বালানি ব্যয় বেড়েছে ৪ গুণ

‘বড় বড় তাঁত কারখানা মালিকরা চড়া দামে ডিজেল কিনে চার গুণ খরচ বৃদ্ধির পরেও কাপড় তৈরি করছে। বাজারে টিকে থাকার লড়াই করছে। তবে প্রান্তিক তাঁতিরা, যাদের পাঁচটি থেকে ১০টি তাঁত তারা বিপাকে পড়ে তাঁতকল বন্ধ করে দিচ্ছে।’

মুহাম্মদ আবদুল হাই, চৌহালী (সিরাজগঞ্জ)

Location :

Chauhali
সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুরের খামার গ্রামে লোডশেডিংয়ের ফলে বন্ধ তাঁতকারখানা
সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুরের খামার গ্রামে লোডশেডিংয়ের ফলে বন্ধ তাঁতকারখানা |নয়া দিগন্ত

‘লোডশেডিংয়ের কারণে তাঁত শিল্পের সবকিছু এখন ওলট-পালট হয়ে যাচ্ছে। একটি জামদানি শাড়ি পাওয়ারলুমে (বিদ্যুৎচালিত তাঁত) তৈরি করতে আগে যেখানে খরচ হতো ৪০ টাকা, বর্তমানে সেটা ডিজেলচালিত জেনারেটরে খরচ বেড়ে চার গুণ হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিটি শাড়ি তৈরিতে জালানি খরচ হচ্ছে ১৬০ টাকা। এখন বিদ্যুৎ ও জালানি সঙ্কটে তাঁত শিল্পে হাহাকার শুরু হয়েছে।‘

কথাগুলো এভাবেই হতাশার সুরে বলছিলেন কয়েক যুগ ধরে তাঁত ব্যবসার সাথে যুক্ত সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানার খামার গ্রামের তাঁত ব্যবসায়ী আফজাল হোসেন লাভলু।

সরেজমিনে খামার গ্রামের লাভলু-বাবলু কম্পোজিট টেক্সটাইলের তাঁত কারখানা ঘুরে দেখা গেছে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় বিদ্যুৎচালিত তাঁত পাওয়ারলুম মেশিন বন্ধ। শ্রমিকরা বাইরে বসে লুডু খেলছেন। অনেকে মোবাইলে গান শুনছেন, আবার কেউ অলস সময় কাটাচ্ছেন।

খামার গ্রামের তাঁত শ্রমিক জুলমাত বলেন, বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের ফলে কাপড় তৈরি করতে পারছি না। অধিকাংশ সময় বিদ্যুৎ থাকে না। কাজ না থাকায় সংসারের ব্যয় নির্বাহ এখন কঠিন হয়ে পড়েছে। দেনা (ঋণ) করে চলতে হচ্ছে।

শ্রমিক শহিদুল, জামাল ও সোলায়মান বলেন, বিদ্যুৎ না থাকায় তাঁত বন্ধ, ডিজেলও পাওয়া যাচ্ছে না, তাই মেশিন বন্ধ রয়েছে। বাধ্য হয়ে লুডু খেলে সময় পার করছি।

এদিকে মালিকপক্ষ বলছেন, অতিরিক্ত মূল্য দিয়েও চাহিদামতো জ্বালানি পাওয়া যাচ্ছে না। প্রান্তিক পর্যায়ের তাঁতিদের কাপড় উৎপাদন কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে। সময়মতো অর্ডার ও ডেলিভারি দিতে না পারায় বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে। অনেকেই পেশা বদল করছে। বন্ধ হয়ে যাচ্ছে তাঁতকল। কেউ কেউ ব্যাংক লোন নিয়ে টিকে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করছে।

শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, তাঁত কুঞ্জ ব্র্যান্ডিং জেলা সিরাজগঞ্জ। এক সময় দেশের অন্যতম প্রধান ঐতিহ্যবাহী শিল্প হিসেবে পরিচিত ছিল। বেলকুচি ও এনায়েতপুরসহ জেলার নয়টি উপজেলায় প্রায় ১০ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই শিল্পের সাথে জড়িত ছিল। পাওয়ারলুম ও হ্যান্ডলুম মিলিয়ে জেলায় প্রায় পাঁচ লাখ তাঁত ছিল। তবে অব্যাহত লোডশেডিং ও জালানি সঙ্কটসহ কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি, বাজারের অস্থিরতা ও নীতিগত সমস্যার কারণে ইতোমধ্যে বহু তাঁতকল বন্ধ হয়ে গেছে।

ঘনঘন লোডশেডিংয়ের কারণে তাঁতে কাপড় উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে। তবে জ্বালানি খরচ বেড়েছে কয়েক গুণ। দিনের বেশিরভাগ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় শ্রমিকরা বেকার বসে থাকছেন।

এ বিষয়ে জাতীয় তাঁতি সমিতির সভাপতি আব্দুস ছামাদ খান বলেন, ‘বড় বড় তাঁত কারখানা মালিকরা চড়া দামে ডিজেল কিনে চার গুণ খরচ বৃদ্ধির পরেও কাপড় তৈরি করছে। বাজারে টিকে থাকার লড়াই করছে। তবে প্রান্তিক তাঁতিরা, যাদের পাঁচটি থেকে ১০টি তাঁত তারা বিপাকে পড়ে তাঁতকল বন্ধ করে দিচ্ছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘ইতোমধ্যে জেলার পাঁচ লাখের মধ্যে জেনারেটর (ডিজেলচালিত) ও হস্তচালিত দুই লাখ বাদে বাকি তাঁতকল বন্ধ হবার পথে। এতে প্রায় কয়েক লাখ মানুষ বেকার হয়ে পড়বে। দ্রুত সকল সঙ্কট ও সমস্যা নিরসন করতে হবে। না হলে ধ্বংসের মুখে পড়বে ঐতিহ্যবাহী তাঁত শিল্প।’