তিস্তা পাড়ে শেষ আশ্রয় বাঁচাতে নিজ অর্থায়নে বৃদ্ধের লড়াই

উপজেলার থেতরাই ইউনিয়নের গোড়াই পিয়ার এলাকায়, পিয়ারি দাখিল মাদরাসার পাশেই নুরুজ্জামানের ছোট্ট বসতভিটা। একসময় যেখানে ছিল তার পৈত্রিক সম্পদ, সেখানে এখন বেঁচে আছে মাত্র আড়াই শতক জমি। তিস্তার ভয়াল গ্রাসে গত কয়েক বছরে হারিয়ে গেছে প্রায় সবকিছু—ভিটেমাটি, স্মৃতি, নিশ্চয়তা।

Location :

Ulipur
উলিপুর উপজেলার গোড়াই পিয়ার এলাকায় তিস্তার ভাঙন থেকে বসতভিটা রক্ষায় নিজ অর্থে বালু ফেলছেন নুরুজ্জামান মিয়া
উলিপুর উপজেলার গোড়াই পিয়ার এলাকায় তিস্তার ভাঙন থেকে বসতভিটা রক্ষায় নিজ অর্থে বালু ফেলছেন নুরুজ্জামান মিয়া |নয়া দিগন্ত

মুরাদ হোসেন মন্ডল, উলিপুর (কুড়িগ্রাম)
তিস্তার অব্যাহত ভাঙনের মুখে দাঁড়িয়ে জীবনের শেষ সম্বল রক্ষায় মরিয়া হয়ে উঠেছেন কুড়িগ্রামের উলিপুরের ৮০ বছর বয়সী নুরুজ্জামান মিয়া। সরকারি সহায়তার অপেক্ষায় না থেকে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী বালুভর্তি বস্তা সাজিয়ে নদীর পাড়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলছেন তিনি—শুধু একটি ছাদের নিরাপত্তার আশায়।

উপজেলার থেতরাই ইউনিয়নের গোড়াই পিয়ার এলাকায়, পিয়ারি দাখিল মাদরাসার পাশেই নুরুজ্জামানের ছোট্ট বসতভিটা। একসময় যেখানে ছিল তার পৈত্রিক সম্পদ, সেখানে এখন বেঁচে আছে মাত্র আড়াই শতক জমি। তিস্তার ভয়াল গ্রাসে গত কয়েক বছরে হারিয়ে গেছে প্রায় সবকিছু—ভিটেমাটি, স্মৃতি, নিশ্চয়তা।

চার বছর আগে নদীগর্ভে বিলীন হয় তার মূল বসতভিটা। পরে সাড়ে সাত শতক জমিতে নতুন করে ঘর তোলেন। কিন্তু সেখানেও টিকতে পারেননি বেশিদিন। গত বছরের ভাঙনে আবারো হারান পাঁচ শতক জমি। এখন অবশিষ্ট সামান্য জায়গায় স্ত্রীকে নিয়ে কোনোমতে দিন কাটছে তার। জীবিকার একমাত্র অবলম্বন বাড়ির সামনের ছোট্ট চা-বিস্কুটের দোকান।

বর্ষা মৌসুম সামনে, আর সেই সঙ্গে উজানের ঢল। নদীর স্রোত বাড়লেই আবার শুরু হবে ভাঙন—এই আশঙ্কায় দিন কাটছে নুরুজ্জামানের। তাই অপেক্ষা না করে নিজ উদ্যোগেই প্রতিরোধ গড়ে তুলছেন তিনি। প্রতিবেশীদের সহযোগিতায় শতাধিক প্লাস্টিকের বস্তায় বালু ভরে নদীর তীরে সারি করে সাজাচ্ছেন, যেন অন্তত কিছুটা সময় কেনা যায় প্রকৃতির কাছে।

নুরুজ্জামান বলেন, “তিস্তা আমাকে প্রায় নিঃস্ব করে দিয়েছে। এই বয়সে আর কোথায় যাব? শেষ ভিটেটুকু বাঁচাতে নিজের মতো করে চেষ্টা করছি।”

তিনি জানান, সন্তানরা সবাই আলাদা হয়ে গেছে। নিজের কোনো স্থায়ী আশ্রয় না থাকায় তারা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসবাস করছেন। তিস্তার পাড়ে স্ত্রীকে নিয়েই তার শেষ লড়াই।

স্থানীয়রা জানান, গত বছর ভাঙনের সময় কিছু বালুভর্তি বস্তা ফেলা হলেও বর্তমানে নুরুজ্জামানের বাড়ির আশপাশে তার কোনো কার্যকর উপস্থিতি নেই। ফলে পুরোপুরি ঝুঁকির মধ্যেই রয়েছে তার বসতভিটা।

এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল ইসলাম জানান, বিষয়টি তাদের নজরে এসেছে এবং ইতোমধ্যে স্থানটি পরিদর্শন করা হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া সাপেক্ষে দ্রুত প্রয়োজনীয় জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন রোধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

ততদিন পর্যন্ত তিস্তার সাথে একাই লড়াই চালিয়ে যাবেন নুরুজ্জামান—এক টুকরো মাটি আর বেঁচে থাকার শেষ আশাটুকু আঁকড়ে ধরে।