গাজীপুর সিটি করপোরেশনের তুরাগ নদী তীরবর্তী ধনঞ্জয়খালী এলাকায় নির্মাণাধীন সড়কের ধস নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা আলোচনা ও সমালোচনার পর উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ভিন্ন বাস্তবতা। বহুল আলোচিত এ ঘটনায় দুই প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে আনা দুর্নীতি ও দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়নি। বরং তদন্তে ‘জিওটেকনিক্যাল ফেইলিওর’ ও ‘ডিজাইন ফেইলিওর’-কেই ধসের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
স্থানীয় সরকার বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ‘গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ১ থেকে ৫ নম্বর জোনের অভ্যন্তরীণ রাস্তা, নর্দমা ও ফুটপাত নির্মাণ’ প্রকল্পের আওতায় কাশিমপুর নামাবাজার থেকে ধনঞ্জয়খালী পর্যন্ত নদীর সমান্তরালে নির্মাণাধীন প্রায় ১১৫০ মিটার সড়কের একটি অংশ গত ফেব্রুয়ারিতে ধসে পড়ে। ঘটনাটি গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করলে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী সরেজমিন পরিদর্শন করেন এবং তাৎক্ষণিকভাবে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এ.কে.এম হারুনুর রশীদ ও নির্বাহী প্রকৌশলী এস.এম শামছুর রহমান মাহমুদকে সাময়িক বরখাস্তের নির্দেশ দেন।
একইসাথে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। পরে স্থানীয় সরকার বিভাগের গঠিত ৮ সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি দীর্ঘ অনুসন্ধান, সরেজমিন পরিদর্শন, কারিগরি বিশ্লেষণ, প্রকল্প নথিপত্র যাচাই, বিশেষজ্ঞ মতামত এবং স্থানীয়দের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে যে প্রতিবেদন দাখিল করেছে, সেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে ধসের ঘটনাটি মূলত ভূ-প্রযুক্তিগত ও নকশাগত ত্রুটিজনিত।
তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, নদীর বাঁক, নিচের নরম কাদামাটি, দীর্ঘদিনের ড্রেজিং, পানির ঘূর্ণায়ন, পাইলের মধ্যবর্তী দূরত্ব এবং নদীতীরের জটিল ভূ-প্রকৃতি মিলেই এ বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়েছে।
তদন্ত কমিটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ধসে পড়া অংশে ‘ক্লাসিক লিমিট স্টেট জিওটেকনিক্যাল ফেইলিওর’ ঘটেছে এবং এটি মূলত ‘ডিজাইন ফেইলিওর’ হিসেবে প্রতীয়মান হয়।
কমিটি আরো উল্লেখ করে, রাস্তার ভরাট মাটি বা রিটেইনিং ওয়ালের গুণগত মানের ঘাটতির কারণে ধস হয়েছে-এমন সম্ভাবনা কম। বরং প্রয়োজনীয় ভূ-প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ, নদীর হাইড্রোলজি, মাটি পরীক্ষা এবং ডিজাইন রিভিউ যথাযথভাবে না হওয়াই বড় কারণ।
এ ঘটনায় বহুল আলোচিত দুই প্রকৌশলীর বিষয়ে তদন্ত প্রতিবেদনে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এ.কে.এম হারুনুর রশীদ প্রকল্পের তৃতীয় প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেন অনেক পরে এবং তিনি পূর্ব অনুমোদিত ডিজাইন অনুসারেই কাজ বাস্তবায়ন করেন।
অন্যদিকে নির্বাহী প্রকৌশলী এস.এম শামছুর রহমান মাহমুদ প্রকল্পের অনুমোদিত মেয়াদ শেষ হওয়ার কয়েক মাস পর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ফলে এ দুর্ঘটনার দায় তার ওপর বর্তায় না বলে মত দিয়েছে তদন্ত কমিটি।
তদন্ত প্রতিবেদনে আরো উঠে আসে যে প্রকল্পটির মূল নকশা প্রস্তুত করেছিল একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এবং পরে নদীর ভেতরে প্রায় পাঁচ মিটার স্থান পরিবর্তন করে কাজ করার অনুমোদন দেয়া হয়। কিন্তু এ পরিবর্তনের ফলে নদীর প্রবাহ, মাটির ধরন, পাইলের সক্ষমতা ও নদীর হাইড্রো-মরফোলজিক্যাল প্রভাব পুনর্মূল্যায়ন করা হয়নি।
কমিটি মনে করে, এ বিষয়গুলো যথাযথভাবে বিশ্লেষণ করা হলে হয়তো এমন দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হতো।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, তদন্ত কমিটি বলেছে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের কোনো আর্থিক ক্ষতি হয়নি। কারণ প্রকল্পটির মেয়াদ ২০২৫ সালের মে মাসেই শেষ হয়ে যায় এবং পরে যেসব কাজ হয়েছে, তার কোনো বিল পরিশোধ করা হয়নি। ফলে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ বা আর্থিক অনিয়মের প্রশ্নও তদন্তে প্রমাণিত হয়নি।
এদিকে পুরো ঘটনায় গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ সোহেল হাসানের ভূমিকা নিয়েও নানা আলোচনা সৃষ্টি হয়। তবে নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে, তিনিই প্রথমে শৃঙ্খলামূলক বিধি অনুযায়ী সাময়িক বরখাস্তের আদেশ কার্যকর করেন এবং পরে স্থানীয় সরকার বিভাগের তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশ ও মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী পুনর্বহালের অফিস আদেশ জারি করেন। অর্থাৎ পুরো প্রক্রিয়াই প্রশাসনিক বিধিবিধান ও তদন্ত প্রতিবেদনের আলোকে সম্পন্ন হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ঘটনা বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়ন ব্যবস্থার একটি বড় শিক্ষা। তদন্ত প্রতিবেদনে জাতীয় পর্যায়ে ভূ-প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ ও ডিজাইন কোড প্রণয়ন, প্রকল্প ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা, আধুনিক প্রযুক্তিভিত্তিক নির্মাণ পদ্ধতি এবং পেশাদার প্রকৌশলীদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়েছে।
স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছে, একটি প্রকৌশলগত ও নকশাগত জটিল ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুরুতে যেভাবে দুর্নীতির অভিযোগ ছড়িয়ে দেয়া হয়েছিল, তদন্ত প্রতিবেদন তার অনেকটাই ভিন্ন চিত্র সামনে এনেছে।
তারা বলছেন, কোনো দুর্ঘটনা ঘটলেই তাৎক্ষণিকভাবে ব্যক্তিকে দায়ী না করে পূর্ণাঙ্গ কারিগরি তদন্তের ওপর গুরুত্ব দেয়া উচিত।



