সিলেটে সুন্দরী নারীদের ভয়ঙ্কর ফাঁদ ‘হানি ট্র্যাপ’, টার্গেট তরুণ ও প্রবাসীরা

এই চক্রগুলোর মূল কাজই হলো নারীদের মাধ্যমে পুরুষদের জন্য ফাঁদ পাতা এবং মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেয়া। মহানগরের বিভিন্ন এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে তারা গড়ে তুলেছে নিজস্ব আস্তানা। এসব ঘটনা সামনে আসার পরই নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন।

আবদুল কাদের তাপাদার, সিলেট ব্যুরো

Location :

Sylhet
গ্রেফতার হানি ট্র্যাপ চক্রের সদস্যরা
গ্রেফতার হানি ট্র্যাপ চক্রের সদস্যরা |নয়া দিগন্ত

সিলেট নগরীতে সক্রিয় এক ভয়ানক প্রতারক চক্র। চক্রটি নারীদের দিয়ে ভয়ঙ্কর ফাঁদ ‘হানি ট্র্যাপ’ তৈরি করছে। এই চক্রটি মূলত টার্গেট করে থাকে উঠতি বয়সী ছেলে, ধর্ণাঢ্য ও প্রবাসীদের। এই চক্রের ফাঁদে পড়ে সর্বস্ব হারিয়েছেন অনেক মানুষ। অনেকেই লজ্জায় পরিবার কিংবা পুলিশের কাছে লুকিয়ে রাখেন সর্বস্ব হারানোর এসব ভয়াবহ ঘটনা। সম্প্রতি পুলিশের জালে ধরা পড়েছে এই চক্রের কয়েকজন।

পুলিশ বলছে, প্রতারক চক্রের অস্ত্র সুন্দরী নারী। সুন্দরী যুবতী মেয়েরা হোয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুক ও অনলাইন বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে টার্গেট করে সখ্যতা গড়ে তোলে পুরুষদের সাথে। পরিচয় থেকে বন্ধুত্ব, এক সময় ঘনিষ্ট আলাপন। ছবি আদান-প্রদান, ভিডিও কলে কথোপকথন। এভাবেই নিজের অজান্তেই সুন্দরী নারীদের ফাঁদে পড়েন পুরুষরা। এরপর সুযোগ বুঝে ডাকা হয় নিজেদের আস্তানায়।

ভুক্তভোগীরা বলছেন, ফাঁদে পড়ে তাদের আস্তানায় গেলে বেরিয়ে আসে কথিত বন্ধু বা নারী বন্ধুর আসল রূপ। জিম্মি করা হয় ডাকে সাড়া দেয়া যুবক কিংবা মধ্যবয়সী পুরুষকে। হাতিয়ে নেয়া হয় মোবাইলফোন, সাথে থাকা টাকা ও অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী। এরপর ভিডিও ক্যামেরা অন করে বিবস্ত্র করা হয় ভিকটিমকে। পরিবার, বন্ধু-বান্ধব আত্মীয়-স্বজনের কাছে ফোন দিয়ে বড় অঙ্কের টাকা নিয়ে আসার জন্য বলা হয়। অন্যথায় ভিডিও অনলাইনে ছেড়ে দেয়ার হুমকি দেয়া হয়। মারধরও করা হয় জিম্মিদশায় থাকা পুরুষকে। ফাঁদে আটকা পড়া সবাই ইজ্জত বাঁচাতে নানা অঙ্কের টাকা দিয়ে সেই চক্রের হাত থেকে রেহাই পান।

পুলিশের তথ্য বলছে, ভয়ঙ্কর এই চক্র যে ফাঁদ পাতে তার নাম ‘হানি ট্র্যাপ’ বা ‘ভালোবাসার ফাঁদ’। এমন ‘ভালোবাসার ফাঁদের’ একাধিক চক্র গড়ে উঠেছে সিলেটে।

এদের মধ্য থেকে এখন পর্যন্ত মোট ছয়জনকে গ্রেফতার করতে পেরেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এর মধ্যে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ পাঁচজন ও র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব-৯) একজনকে গ্রেফতার করেছে।

এসব চক্রের অপকর্ম আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরে আসে গত এপ্রিলে। দুই ভুক্তভোগীর পরিবারের দেয়া অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ অভিযান চালালে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য।

পুলিশ জানায়, ৯ এপ্রিল রাতে রিফাত ও মাহফুজ নামে দু’জন হানি ট্র্যাপ চক্রের ফাঁদে পড়েন। সিলেট মহানগরের মেন্দিবাগ পয়েন্ট থেকে চক্রের সদস্য মো: আব্দুল জলিল প্রতারণার মাধ্যমে তাদের তুলে নিয়ে যান। চক্রের অপর সদস্য মো: জায়েদ আহমদ রিফাতদের বহনকারী সিএনজিচালিত অটোরিকশাটির চালক ছিলেন।

এরপর রাত সাড়ে ১০টায় শাহজালাল উপশহরের যতরপুর এলাকার নবপুষ্প ১১৩ নম্বর বাসার পঞ্চমতলায় নিয়ে গিয়ে পূর্বপরিকল্পিতভাবে চক্রের অন্যান্য সদস্যদের সহায়তায় এই দু’জনকে জিম্মি করে। ওই বাসায় আগে থেকেই অবস্থান করে জেসমিন আক্তার ও চক্রের মূলহোতা তানজিলা আক্তার ওরফে রাবেয়া বেগম তানহাসহ চার-পাঁচজন।

এ সময় সবাই মিলে রিফাত ও মাহফুজকে ধারালো অস্ত্র প্রদর্শন করে ইলেকট্রিক শক প্রদানের মাধ্যমে শারীরিক নির্যাতন চালায়। তাদের উলঙ্গ করে অশ্লীল ভিডিও ধারণ করা হয় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়ার হুমকি দিয়ে মোট ১০ লাখ টাকা দাবি করা হয়।

পরে ভিকটিম মাহমুদুল হাসান রিফাত আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে ৯০ হাজার টাকা সংগ্রহ করে এনে দেন। তখন ওই দুই যুবকের পরিবারের লোকজনের সন্দেহের পরিপ্রেক্ষিতে কোতোয়ালি মডেল থানা পুলিশকে অবহিত করা হয়। পরে পুলিশ অভিযান চালিয়ে ওই বাসা থেকে দুই নারী ও দুই পুরুষকে আটক করে। এ ঘটনায় মামলার পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ পরে এ চক্রের আরেকজনকে গ্রেফতার করে।

এদিকে, ওই মামলার আরেক আসামিকে গত ৫ মে গ্রেফতার করে র‌্যাব-৯-এর একটি টিম।

এই চক্রগুলোর মূল কাজই হলো নারীদের মাধ্যমে পুরুষদের জন্য ফাঁদ পাতা এবং মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেয়া। মহানগরের বিভিন্ন এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে তারা গড়ে তুলেছে নিজস্ব আস্তানা। এসব ঘটনা সামনে আসার পরই নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন।

সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) মিডিয়া অফিসার অতিরিক্ত উপ-কমিশনার মোহাম্মদ মনজুরুল আলম নয়া দিগন্তকে সোমবার বলেন, ‘সিলেটে ‘হানি ট্র্যাপ’র একাধিক চক্র গড়ে উঠেছে। পুলিশ এসব চক্রের শেকড়সহ উপড়ে ফেলতে চায়। এ লক্ষ্যে তদন্ত ও অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তবে একটি বিষয়, এক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা পুলিশের দ্বারস্থ হতে লজ্জা পান। কিন্তু যারাই আমাদের কাছে অভিযোগ নিয়ে আসবেন, তাদের আমরা সর্বোচ্চ সহযোগিতা করব।’