ময়মনসিংহে শ্রমিক সঙ্কট ও দরপতনে হিমশিম খাচ্ছেন কৃষকরা

দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে এবার বাম্পার উৎপাদনের আশা করছেন কৃষকরা। কিন্তু শ্রমিক সঙ্কট, অস্বাভাবিক মজুরি, অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতা, জোঁকের আক্রমণ এবং বাজারে ধানের দরপতন- এসব চাপে ধান ঘরে তুলতেই হিমশিম খাচ্ছেন তারা।

মো: সাজ্জাতুল ইসলাম, ময়মনসিংহ

Location :

Mymensingh
ময়মনসিংহের ম্যাপ
ময়মনসিংহের ম্যাপ |ফাইল ছবি

দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে এবার বাম্পার উৎপাদনের আশা করছেন কৃষকরা। কিন্তু শ্রমিক সঙ্কট, অস্বাভাবিক মজুরি, অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতা, জোঁকের আক্রমণ এবং বাজারে ধানের দরপতন- এসব চাপে ধান ঘরে তুলতেই হিমশিম খাচ্ছেন তারা।

গফরগাঁওয়ের পাগলা থানার দিগল বাঁগ গ্রামের কৃষক বাদল মিয়া চলতি মৌসুমে কয়েক একর জমিতে ধান আবাদ করে ভালো ফলনের আশা করেছিলেন। প্রকৃতিও ছিল অনুকূলে। কিন্তু ধান কাটতে গিয়ে পড়েছেন তীব্র সঙ্কটে।

তিনি জানান, স্থানীয়ভাবে শ্রমিক না পেয়ে গফরগাঁও রেলওয়ে স্টেশন থেকে প্রতি কাঠা এক হাজার ৫০০ টাকা চুক্তিতে সাতজন শ্রমিক নিয়ে আসেন তিনি। শ্রমিক আনা-নেয়ায় অতিরিক্ত ৫০০ টাকা ব্যয় হয়। কিন্তু ক্ষেতে কাজ শুরুর পরপরই জোঁকের আক্রমণে আতঙ্কিত হয়ে শ্রমিকরা কাজ ফেলে চলে যান।

বাদল মিয়া বলেন, ‘অনেক কষ্ট করে শ্রমিক আনলাম, কিন্তু জোঁকের কারণে তারা কাজ শেষ না করেই চলে গেছে। এখনো প্রায় ২০০ মণ ধান মাঠে পড়ে আছে। দ্রুত কাটতে না পারলে বৃষ্টি বা পানিতে সব নষ্ট হয়ে যাবে।’

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শ্রীপুরের কাওরাইদ, পাগলার মশাখালি এবং গফরগাঁও রেলস্টেশনসহ বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকের তীব্র সঙ্কট চলছে। অনেক কৃষক রাত ৩টা থেকেই স্টেশন এলাকায় গিয়ে শ্রমিকের জন্য অপেক্ষা করছেন। ফজরের আগেই শুরু হচ্ছে শ্রমিক নেয়ার প্রতিযোগিতা, এতে মজুরি বেড়ে গেছে অস্বাভাবিক হারে।

শুধু শ্রমিক সঙ্কটই নয়, ধানের বাজারদরও কৃষকদের নতুন দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে স্থানীয় বাজারে প্রতি মণ ধান ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা উৎপাদন খরচের তুলনায় অনেক কম।

কৃষক মো: সাইজুদ্দিন জানান, প্রতি কাঠা জমিতে ধান উৎপাদনে তার খরচ হয়েছে প্রায় সাড়ে তিন হাজার টাকা। কিন্তু বর্তমান দামে ধান বিক্রি করে সেই খরচও উঠছে না, বরং লোকসান গুনতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘এভাবে চলতে থাকলে কৃষক ধানচাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে।’

কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্রাম থেকে শ্রমশক্তির শহরমুখী প্রবণতা, দক্ষ শ্রমিকের অভাব, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি- সব মিলিয়ে কৃষি এখন নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে। উৎপাদন বাড়লেও তা ঘরে তুলতে না পারলে সেই সাফল্য অর্থনৈতিকভাবে কোনো সুফল বয়ে আনবে না।

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো: আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে কৃষির টেকসই উন্নয়নে যান্ত্রিকীকরণের কোনো বিকল্প নেই। ধান কাটা, মাড়াই ও প্রক্রিয়াজাতকরণে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে শ্রমনির্ভরতা ও ব্যয় কমানো সম্ভব।’

তিনি জানান, কম্বাইন হারভেস্টারসহ বিভিন্ন আধুনিক কৃষিযন্ত্র ইতোমধ্যে মাঠপর্যায়ে সফলভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এসব প্রযুক্তি সহজলভ্য করা, কৃষিযন্ত্রে সহজ ঋণ ও ভর্তুকি নিশ্চিত করা জরুরি।

এদিকে কৃষকদের অভিযোগ, সঙ্কটের এই সময়ে মাঠপর্যায়ে কৃষি বিভাগের তৎপরতা খুব একটা চোখে পড়ছে না। প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও তাৎক্ষণিক সহায়তার অভাব রয়েছে।

গফরগাঁও উপজেলা কৃষি অফিসের অতিরিক্ত কৃষি কর্মকর্তা মো: সাফাত জামান পনির জানান, ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক অতিবৃষ্টির কারণে অনেক জমিতে পানি জমে থাকায় ধান কাটা ব্যাহত হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘পানি কমলে দ্রুত বাকি ধান কাটার জন্য কৃষকদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেয়া হবে।’

ভুক্তভোগী কৃষকদের দাবি, কৃষি শুধু খাদ্য উৎপাদনের বিষয় নয়, এটি জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনীতির সাথে সরাসরি জড়িত। তাই শ্রমিক সঙ্কট ও প্রাকৃতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আধুনিক কৃষিযন্ত্র সহজলভ্য করা এবং কার্যকর নীতিগত পদক্ষেপ নেয়া এখন সময়ের দাবি।

মাঠে এখনো দুলছে সোনালি ধান। তবে কৃষকদের প্রশ্ন- ফসল যদি ঘরেই না ওঠে, তবে বাম্পার উৎপাদনের সেই সাফল্য আসলে কতটুকু?