দাগনভূঞায় আইনশৃঙ্খলার অবনতিতে জনমনে ক্ষোভ-আতঙ্ক

দাগনভূঞা আতাতুর্ক স্কুল মার্কেটের ব্যবসায়ী কামাল উদ্দিন বলেন, দাগনভূঞাতে কিশোর গ্যাং ও মাদক এক ভয়াবহ আতঙ্কের নাম। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত ১০ থেকে ১১টা পর্যন্ত ১২ থেকে ১৮ বছরের কিছু উচ্ছৃঙ্খল কিশোর দাগনভূঞার কিছু পয়েন্টে আড্ডা দিয়ে মাদক সেবন করে। স্কুলের ছাত্রীদের ইভটিজিং করে এমনকি ছিনতাইও করে থাকে। বিশেষ করে দাগনভূঞা আতাতুর্ক স্কুল মার্কেটের কিছু চা দোকানে তাদের আড্ডা জমে।

শাহাদাত হোসাইন, ফেনী অফিস

Location :

Feni
ফেনী ম্যাপ
ফেনী ম্যাপ |নয়া দিগন্ত

ফেনীর দাগনভূঞা উপজেলায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে এলাকার জনমনে একদিকে উদ্বেগ-আতঙ্ক, অন্যদিকে ক্ষোভ-অসন্তোষ বিরাজ করছে। এলাকায় দিনদিন সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, মাদক, ইভটিজিং, কিশোর গ্যাং বেড়েই চলেছে।

দাগনভূঞায় কিশোর গ্যাং, মাদক ও মাটি ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য একটি বড় আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই কিশোর অপরাধীরা বেপরোয়া হয়ে উঠছে, এলাকায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে এবং মাদক কেনা-বেচায় জড়িত রয়েছে। কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা মাদককারবারের সাথে সরাসরি জড়িত এবং প্রতিদিন একত্রিত হয়ে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছে। কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা মাদককারবারকে কেন্দ্র করে এলাকায় সংঘর্ষ ও রক্তপাতের ঘটনাও ঘটছে, যা জনজীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে।

দাগনভূঞাতে বর্তমানে কিশোর গ্যাংয়ের কয়েকটি সক্রিয় গ্রুপ রয়েছে। যারা বিভিন্ন দেয়ালে গ্রুপভিত্তিক নাম লিখে তাদের অবস্থান জানান দিচ্ছে। কিশোর গ্যাংয়ের এসব গ্রুপের মধ্যে রয়েছে ‘ভইরা দে গ্রুপ’, ‘ডিকে ২৮’, ‘এস২কে ১০’, ‘ডিআরবি-জেড’। সম্প্রতি র‌্যাব ‘ভইরা দে’ গ্রুপের সক্রিয় সদস্য রাকিবকে গ্রেফতার করেছে।

কিশোর গ্যাংয়ের এসব গ্রুপের সদস্যরা দলবদ্ধ হয়ে দাগনভূঞা পৌর শহরের ডাকবাংলা রোড পুকুর পাড়, আতাতুর্ক স্কুল গেইট, মোল্লা বাড়ি রোড়, ইসহাক মার্কেটের দুই পাশে, বসুরহাট রোড়, গজারিয়া রোড় ও স্কুল মার্কেটের দোতলা থেকে চতুর্থতলা পর্যন্ত আড্ডা দেয় এবং মাদক সেবন করে। কিশোর গ্যাংয়ের এসব সদস্যরা শুধু মাদক সেবনই নয় চুরি, ছিনতাই ও ইভটিজিংসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত। এদের দৌরাত্মে অনেকে ভয়ে তাদের মেয়েকে স্কুলে একা দিতে পারে না। আতাতুর্ক স্কুল মার্কেটে ক্রেতারা ভয়ে যেতে চায় না। এরা অত্যন্ত ভয়ানক ও হিংস্র। মাদকের জন্য টাকা না পেলে এরা এমন কোনো অপরাধ নেই যা করতে পারে না।

সবশেষে নিজের মাকেও হত্যা করতে দ্বিধা করেনি মাদকাসক্ত মোহাম্মদ রাফি (২১)। গত রোববার রাতে উপজেলার সিন্দুরপুর ইউনিয়নের দিলপুর গ্রামে মাদক সেবনের টাকা না পেয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে মায়ের ওপর পৈশাচিক হামলা চালিয়েছে এক মাদকাসক্ত যুবক। ছেলের ছুরিকাঘাতে মা লাকি বেগম (৪৫) নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় গুরুতর আহত বাবা ও বোনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। ঘটনার পরই ঘাতক ছেলেকে রক্তমাখা ছুরিসহ আটক করেছে পুলিশ।

সূত্রে জানা গেছে, অভিযুক্ত রাফি দীর্ঘদিন ধরে মাদকাসক্ত ছিলেন। রোববার রাতে সে বাড়িতে এসে মাদক সেবনের জন্য মায়ের কাছে টাকা চায়। মা টাকা দিতে অস্বীকার করলে এবং তার বেপরোয়া চলাফেরা নিয়ে শাসন করলে সে (রাফি) ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে অনলাইনে অর্ডার করে কেনা ধারালো ছুরি দিয়ে মায়ের ওপর অতর্কিত হামলা চালায় রাফি। মাকে বাঁচাতে বোন মিথিলা মোস্তফা (১৮) এগিয়ে এলে তাকেও ছুরিকাঘাত করা হয়। পরে বাবা মোহাম্মদ মোস্তফা (৫৫) তাদের রক্ষা করতে গেলে ঘাতক রাফি তাকেও এলোপাতাড়ি কুপিয়ে জখম করে।

এদিকে শনিবার (৯ মে) দাগনভূঞা পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ড আমানউল্লাহপুরে ১৮ মাস বয়সী শিশু হাসান নিখোঁজ হয়। নিখোঁজের পর তার পরিবারের কাছে অপরিচিত নম্বর থেকে প্রথমে ১২ হাজার পরে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। মুক্তিপণ দিতে না পারায় শিশু হাসানকে হত্যা করে লাশ তার বাসার পাশে ড্রেনে ফেলে যায়। পরে সোমবার সকালে ওই ড্রেন থেকে হাসানের লাশ উদ্ধার করা হয়।

অন্যদিকে গত ২২ এপ্রিল দিবাগত রাতে মাটি কাটাকে কেন্দ্র করে ইকবাল কলেজ ছাত্রদলের সভাপতি মাসুমের সাথে স্ব-দলীয় অন্য একটি পক্ষের সাথে মারামারির ঘটনা ঘটে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে একই রাতে মাসুমের বসতঘরে আগুন দেয়ার ঘটনাও ঘটে।

সম্প্রতি ইয়াকুবপুর ইউনিয়নের দুধমুখা বাজারে ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে আজাদ আলি ও সারোয়ারের নির্দেশনায় ওই ছেলেকে দুধমুখা বাজারে মারধরও পরে রাতে তার বাড়ি ভাঙ্চুর করে।

দাগনভূঞার প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রতিনিয়ত ঘটে যাচ্ছে কোনো না কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা।

গত ২৩ এপ্রিল রাতে সরকারি ইকবাল মেমোরিয়াল কলেজের ছাত্রদলের সভাপতি আবদুল্লাহ আল মাসুমের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে দলীয় প্রতিপক্ষ গ্রুপ।

মাসুম জানান, তাদের জমি থেকে মাটি কেটে পুকুর ভরাট করছিল। ওই দিন রাতে ছাত্রদল থেকে বহিষ্কৃত ফটিকের লোকজন এসে মাটি কাটার জন্য ১০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করে। এ বিষয়ে মাসুমের বড় ভাই মামুনের সাথে কথাকাটাকাটির জেরে বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়। এতে তার চাচার ঘর পুড়ে প্রায় ১০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়।

এছাড়া গণঅভ্যুত্থানের পটপরিবর্তনের পরে পৌর শহরসহ বিভিন্ন এলাকায় সরকারি উন্নয়ন কাজে চাঁদা দাবি করে একটি চক্র। দাবি করা চাঁদা না পেয়ে ওই চক্র ট্রাকসহ নির্মাণ সামগ্রী লুট এমনকি কাজে বাঁধা দিয়ে মারধরসহ হুমকি-ধামকি দেয়। এসব ঘটনায় থানায় একাধিক অভিযোগ দেয়া হয়।

দাগনভূঞা আতাতুর্ক স্কুল মার্কেটের ব্যবসায়ী কামাল উদ্দিন বলেন, দাগনভূঞাতে কিশোর গ্যাং ও মাদক এক ভয়াবহ আতঙ্কের নাম। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত ১০ থেকে ১১টা পর্যন্ত ১২ থেকে ১৮ বছরের কিছু উচ্ছৃঙ্খল কিশোর দাগনভূঞার কিছু পয়েন্টে আড্ডা দিয়ে মাদক সেবন করে। স্কুলের ছাত্রীদের ইভটিজিং করে এমনকি ছিনতাইও করে থাকে। বিশেষ করে দাগনভূঞা আতাতুর্ক স্কুল মার্কেটের কিছু চা দোকানে তাদের আড্ডা জমে। বসে বসে ধূমপান এবং টার্গেট করে ছিনতাই করে থাকে। তাদের কারণে এ মার্কেটে কাস্টমার আসতে চায় না। কারণ কাস্টমারদের সাথে এরা বাজে ব্যবহার করে, বিশেষ করে মহিলা কাস্টমার। এদের এসব বেপরোয়া আচরণ ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের ভূমিকাও নিস্ক্রিয়।

অন্যদিকে মাটি কাটা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সন্ধ্যা নামলেই দাগনভূঞা বাজারের উপর যে বেপরোয়াভাবে মাটিবাহী ট্রাক চলাচল করে তাতে যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনা হতে পারে। মাটিকাটা অবৈধ তারপরেও প্রকাশ্যে মাটিবাহী ট্রাক চলাচল করে কিন্তু প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না।

উপজেলা জামায়াতের আমির গাজী সালেহ উদ্দিন বলেন, বর্তমানে মহামারীর মতোই দাগনভূঞার বড় সমস্যা মাদক ও কিশোর গ্যাং। কিশোর গ্যাং ও মাদক দাগনভূঞার এখন সবচেয়ে বড় অভিশাপ। কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরাই মাদক বিক্রির সাথে জড়িত এবং সেবনও করে। আর এই মাদকের টাকা না পেলে আবার বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। তাদের আচরণ এতোই বেপরোয়া যে তাদের অভিভাবক ও শিক্ষকরাও ভয়ে তাদের কিছু বলতে পারেন না। মাদককারবারি, সেবনকারী ও কিশোর গ্যাং এদের নির্দিষ্ট কোনো দল নেই। যে দলই ক্ষমতায় আসে তারা সে দলের কতিপয় কিছু নেতার ছত্রছায়ায় থেকে এসব অপরাধ কর্মকাণ্ড চালিয়ে যায়। তাই এদের প্রতিহত করা একা কারো পক্ষে সম্ভব নয়। তার জন্য প্রশাসনসহ সকল রাজনৈতিক, ব্যবসায়ী ও সুশীল সমাজের নেতৃবৃন্দ ঐক্যবদ্ধ হয়ে এদের দমনে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

উপজেলা বিএনপির আহবায়ক আকবর হোসেন বলেন, কিশোর গ্যাং, মাদককারবার ও মাটি ব্যবসা কোনোটির সাথেই দাগনভূঞা উপজেলা বিএনপির কোনো সম্পৃক্ততা নেই। এই কিশোর গ্যাং দমন ও মাদককারবারিদের বিরুদ্ধে ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর থেকেই বলে আসছি। প্রশাসনকে শতবার বলেছি তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্ট্যাটাস দিয়েছি কিশোর গ্যাংয়ের ছবি ও নাম পরিচয় দিয়ে। তারপরেও প্রশাসন কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

তিনি আরো বলেন, আমি উপজেলা বিএনপির আহবায়ক বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আমি বারবার বলার পরেও প্রশাসন কোনো কিশোর গ্যাং সদস্য বা কোনো মাদককারবারিকে গ্রেফতার করেনি। কেন করেনি বা কোন কারণে করেনি তা দাগনভূঞার জনগণ বুঝে নিবে। তবে কিশোর গ্যাং, মাদক এসবের বিরুদ্ধে আমার অবস্থান সবসময়ই অনড় আছে, থাকবে।

সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (সোনাগাজী সার্কেল) সৈয়দ মুমিদ রায়হান বলেন, কিশোর গ্যাং দমনে পুলিশের অভিযান অব্যাহত আছে। এছাড়া মাদক নিয়ন্ত্রণেও পুলিশ কঠোর অবস্থানে রয়েছে। অর্থাৎ যেকোনো অপরাধ দমনে পুলিশ কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। অপরাধী যেই হোক না কেন তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।