মমেকে হাম প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণহ‌ীন, টিকার আগেই শিশু-মৃত্যু

নয় মাস বয়সে হামের প্রথম ডোজ দেয়া হয়। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, সেই বয়সে পৌঁছানোর আগেই সংক্রমণে মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে। এটি শুধু একটি স্বাস্থ্য সংকট নয়—এটি স্পষ্টতই ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা।

মো: সাজ্জাতুল ইসলাম, ময়মনসিংহ

Location :

Mymensingh
ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল
ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল |নয়া দিগন্ত

ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল (মমেক)-এ হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যু এখন যেন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। টিকা নেয়ার আগেই একের পর এক শিশুর প্রাণ ঝরে পড়ছে—যা দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ভয়াবহ দুর্বলতাকে নগ্নভাবে সামনে এনে দিয়েছে।

গত ১৩ মে পর্যন্ত হাসপাতালের তথ্যে দেখা যায়, চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয়েছে ৩১ শিশুর। উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এই মৃতদের প্রায় ৭৭ শতাংশই নয় মাসের কম বয়সী অর্থাৎ যাদের হামের টিকা নেয়ার ন্যূনতম বয়সই পূর্ণ হয়নি। প্রশ্ন উঠছে—এই শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করবে কে?

চিকিৎসা বিজ্ঞানের নিয়ম অনুযায়ী, শিশুদের নয় মাস বয়সে হামের প্রথম ডোজ দেয়া হয়। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, সেই বয়সে পৌঁছানোর আগেই সংক্রমণে মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে। এটি শুধু একটি স্বাস্থ্য সংকট নয়—এটি স্পষ্টতই ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, মৃত ৩১ শিশুর মধ্যে ২৪ জনের বয়স ছিল ০ থেকে নয় মাস। এদের মধ্যে ১৮ জন ছেলে ও ছয়জন মেয়ে। ১০ থেকে ১৫ মাস বয়সী চারজন—সবাই ছেলে। ১৫ মাসের বেশি বয়সী দুইজনের মধ্যে একজন ছেলে ও একজন মেয়ে। একটি শিশুর বয়সের তথ্যই অনুপস্থিত—যা তথ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে।

মৃতদের বেশিরভাগই ময়মনসিংহ জেলার বাসিন্দা। এছাড়া নেত্রকোনা, জামালপুর, কিশোরগঞ্জ, শেরপুর ও টাঙ্গাইল থেকেও মৃত্যুর খবর এসেছে। অর্থাৎ এটি কোনো একক জেলার সমস্যা নয়—পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া এক ভয়াবহ জনস্বাস্থ্য বিপর্যয়।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নয় মাসের আগে টিকা দেয়া না গেলেও প্রতিরোধের বিকল্প পথ রয়েছে। গর্ভবতী মায়েদের টিকাদান নিশ্চিত করা, শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করা এবং অভিভাবকদের সচেতনতা বাড়ানো—এসব ক্ষেত্রেই বড় ধরনের ঘাটতি রয়ে গেছে।

আরো উদ্বেগজনক বিষয় হলো—অনেক শিশুকে গুরুতর অবস্থায় দেরিতে হাসপাতালে আনা হচ্ছে। ফলে চিকিৎসা শুরুর আগেই পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠছে।

আইসিইউ নেই, শয্যা নেই—তবুও চলছে চিকিৎসা!

মমেক হাসপাতালের বাস্তব চিত্র আরো ভয়াবহ। হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে শয্যা রয়েছে মাত্র ৬৪টি, অথচ ভর্তি শিশু ১০২ জন। ফলে অনেক শিশুকে মেঝে ও বারান্দায় রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে—যা সংক্রমণের ঝুঁকি আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে।

চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, অধিকাংশ মৃত শিশুই ছিল আইসিইউ সাপোর্টের প্রয়োজনীয়। কিন্তু শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত আইসিইউ না থাকায় চিকিৎসা কার্যত অর্ধেকেই থেমে যাচ্ছে।

শিশু বিভাগের একাধিক চিকিৎসক জানিয়েছেন, ‘এই সময়ে আইসিইউ থাকলে হয়তো অনেক শিশুকে বাঁচানো যেত।’ অথচ সেই আইসিইউ এখনও বাস্তবায়নের অপেক্ষায়।

নিয়ন্ত্রণহীন প্রাদুর্ভাব
গত ১৭ মার্চ থেকে শুরু হওয়া এই প্রাদুর্ভাবে এখন পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১,৩৭২ শিশু। এর মধ্যে ১,২১৭ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেও প্রতিদিন নতুন করে ২৬ থেকে ৩২ জন শিশু ভর্তি হচ্ছে—যা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত।

প্রশ্ন এখন একটাই—টিকা নেয়ার আগেই যদি শিশুরা মারা যায়, তবে তাদের সুরক্ষার দায়িত্ব কার? আইসিইউ ও শয্যা সংকট কেনো এখনও কাটেনি? কেনো সময়মতো কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়নি?

একটি আধুনিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় এমন মৃত্যু কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। অথচ বাস্তবতা হলো— অবহেলা, সমন্বয়হীনতা এবং অদক্ষ ব্যবস্থাপনার বলি হচ্ছে নিরীহ শিশুরা। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই মৃত্যু মিছিল আরো দীর্ঘ হবে—এতে কোনো সন্দেহ নেই।