৬৬ বছর ধরে একই জায়গায় বসে চুল কাটছেন ৮৭ বছরের অখিল

হাটের দিনে এখনো পুকুরপাড়ে বসে হাতে কাঁচি ও ক্ষুর নিয়ে পুরোনো গ্রাহকদের অপেক্ষায় থাকেন তিনি। কাঁচির টুংটাং শব্দেই যেন লেখা হয়ে চলেছে তার ৬৬ বছরের জীবনের গল্প।

কাজী আফতাব হোসেন, নগরকান্দা (ফরিদপুর)

Location :

Faridpur
টানা ৬৬ বছর ধরে একই জায়গায় বসে মানুষের চুল-দাড়ি কেটে যাচ্ছেন অখিল শীল
টানা ৬৬ বছর ধরে একই জায়গায় বসে মানুষের চুল-দাড়ি কেটে যাচ্ছেন অখিল শীল |ছবি : নয়া দিগন্ত

ফরিদপুরের সালথা উপজেলার মাঝারদিয়া ইউনিয়নের মাঝারদিয়া বাজারের পুকুরপাড়ে একটি ছোট কাঠের পিঁড়ি। সেই পিঁড়িতেই বসে চুল কাটেন ৮৭ বছর বয়সী অখিল শীল। বাজারে আধুনিক সেলুনের সংখ্যা বাড়লেও বদলায়নি তার কর্মস্থল। টানা ৬৬ বছর ধরে একই জায়গায় বসে মানুষের চুল-দাড়ি কেটে যাচ্ছেন তিনি।

অখিল শীলের বাড়ি নগরকান্দা উপজেলার সদর গ্রামের চৌমুখা এলাকায়। তার বাবা হরিবদন শীল। জীবিকার তাগিদে কৈশোর বয়সেই তিনি নাপিতের পেশায় যুক্ত হন। সেই শুরু থেকে আজও থামেননি তিনি।

সপ্তাহে দুই দিন মাঝারদিয়া বাজারে হাট বসে। হাটের দিন সকালে তিনি পুকুরপাড়ে এসে একটি কাঠের পিঁড়ি পেতে বসেন। হাতে থাকে পুরোনো কাঁচি ও ক্ষুর। সেখানেই বসে গ্রামের মানুষের চুল-দাড়ি কেটে দেন।

সরেজমিনে দেখা যায়, বয়সের ভার পড়লেও কাজের প্রতি তার আগ্রহ কমেনি। পুকুরপাড়ের ছোট জায়গাটিতেই বসে চুল কাটছেন তিনি। সামনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন কয়েকজন গ্রাহক। কেউ আবার সিরিয়াল ধরে বসে আছেন।

স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ আলী মাতুব্বর বলেন, ‘আমি সেলুনে চুল কাটাই না। ছোটবেলা থেকেই অখিল শীলের কাছেই চুল কাটাই। তার হাতে চুল কাটালে আলাদা একটা তৃপ্তি লাগে।’

আরেক স্থানীয় বাসিন্দা সাইদুল বলেন, ‘ওনার কাছে ধনী-গরিব সবাই চুল কাটান। তবে অখিল শীলের কাছে চুল কাটাতে অন্যরকম একটা আনন্দ আছে।’

অখিল শীল জানান, বর্তমানে প্রতিজনের চুল কাটার জন্য তিনি ৫০ টাকা নেন। হাটের দিনে তার কাছে গড়ে ২০ থেকে ২৫ জন গ্রাহক আসেন। সেই আয় দিয়েই সংসার চালানোর চেষ্টা করেন তিনি।

তিনি আরো বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই এই কাজ করছি। তখন বাজারে সেলুন ছিল না। পুকুরপাড়ে বসেই মানুষের চুল কেটে সংসার চালিয়েছি। এখন বয়স হয়েছে, তবুও কাজ না করলে মন ভালো লাগে না। তাছাড়া সংসারও চলে না।’

অখিল শীলের পাঁচ ছেলে-মেয়ে। তবে তাদের কেউই এই পেশার সাথে যুক্ত নন।

স্থানীয়দের মতে, মাঝারদিয়া বাজারের পুরোনো স্মৃতির সাথে জড়িয়ে আছে অখিল শীলের এই পুকুরপাড়ের সেলুন।

আধুনিকতার ভিড়েও তার এই সরল জীবিকা গ্রামীণ জীবনের এক জীবন্ত ইতিহাস হয়ে আছে।

হাটের দিনে এখনো পুকুরপাড়ে বসে হাতে কাঁচি ও ক্ষুর নিয়ে পুরোনো গ্রাহকদের অপেক্ষায় থাকেন তিনি। কাঁচির টুংটাং শব্দেই যেন লেখা হয়ে চলেছে তার ৬৬ বছরের জীবনের গল্প।