জ্বালানি সঙ্কট ব্যবস্থাপনায় জাবি শিক্ষকের ডিজিটাল রেশনিং পদ্ধতি

প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রতিটি যানবাহন বা জ্বালানি ব্যবহারকারীর জন্য একটি ইউনিক ডিজিটাল পরিচয় তৈরি করা হবে, যা কিউআর কোডের মাধ্যমে শনাক্ত করা যাবে। ব্যবহারকারীর ধরন অনুযায়ী সাপ্তাহিক বা মাসিক জ্বালানি কোটা নির্ধারণ করে সীমিত জ্বালানির ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

আতাউর রহমান, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
জ্বালানি সঙ্কট ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাল রেশনিং পদ্ধতি নকশা চিত্র
জ্বালানি সঙ্কট ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাল রেশনিং পদ্ধতি নকশা চিত্র |নয়া দিগন্ত

দেশে চলমান জ্বালানি সঙ্কট মোকাবেলায় ন্যায্য বণ্টন, স্বচ্ছতা ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে প্রযুক্তিনির্ভর একটি ডিজিটাল রেশনিং ব্যবস্থার প্রস্তাব দিয়েছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের অধ্যাপক আবু সাঈদ মো. মোস্তাফিজুর রহমান। ‘

কিউআর কোড ও ওটিপি ভিত্তিক সমন্বিত জ্বালানি রেশনিং সিস্টেম’ শীর্ষক এ প্রস্তাবে সীমিত জ্বালানি সম্পদের সুষম ব্যবহার নিশ্চিতের একটি কাঠামো তুলে ধরা হয়েছে।

মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) বিকেলে গণমাধ্যমের মাধ্যমে সরকারের কাছে তিনি জ্বালানি সঙ্কট ব্যবস্থাপনায় এ প্রযুক্তিনির্ভর পদ্ধতির বিস্তারিত উপস্থাপন করেন।

প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রতিটি যানবাহন বা জ্বালানি ব্যবহারকারীর জন্য একটি ইউনিক ডিজিটাল পরিচয় তৈরি করা হবে, যা কিউআর কোডের মাধ্যমে শনাক্ত করা যাবে। ব্যবহারকারীর ধরন অনুযায়ী সাপ্তাহিক বা মাসিক জ্বালানি কোটা নির্ধারণ করে সীমিত জ্বালানির ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। তবে কেবল কিউআর কোডনির্ভর ব্যবস্থা যথেষ্ট নয় বলেও মত দেন তিনি। তার মতে, কিউআর কোড সহজেই কপি বা শেয়ার করা সম্ভব হওয়ায় প্রকৃত ব্যবহারকারী শনাক্তে জটিলতা তৈরি হতে পারে।

এ সীমাবদ্ধতা কাটাতে প্রতিটি লেনদেনের সময় নিবন্ধিত মোবাইল নম্বরে ওটিপি (ওয়ান-টাইম পাসওয়ার্ড) পাঠানোর প্রস্তাব দেন তিনি। এতে অতিরিক্ত নিরাপত্তা স্তর যুক্ত হবে এবং অননুমোদিত ব্যবহার কমানো সম্ভব হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় জ্বালানি গ্রহণ প্রক্রিয়াটি হবে সহজ ও স্বচ্ছ। পাম্পে যানবাহন এলে প্রথমে কিউআর কোড স্ক্যান করে ব্যবহারকারীর অবশিষ্ট কোটা যাচাই করা হবে। এরপর নির্ধারিত পরিমাণ জ্বালানি ইনপুটের পর মালিক বা অনুমোদিত ড্রাইভারের মোবাইলে ওটিপি পাঠানো হবে। ওটিপি যাচাই সম্পন্ন হলে জ্বালানি বিতরণ করা হবে। একই সাথে কেন্দ্রীয় সার্ভারে ব্যবহারকারীর কোটা ও পাম্পের স্টক রিয়েল-টাইমে আপডেট হবে।

অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বর্তমান সঙ্কটে পাম্পের সামনে দীর্ঘ লাইনের পাশাপাশি আরেকটি অদৃশ্য সমস্যা হলো—কে প্রকৃত প্রয়োজনের জন্য জ্বালানি নিচ্ছে আর কে অতিরিক্ত মজুদ করছে। এই অসম বণ্টনই সঙ্কটকে আরও তীব্র করে তুলছে। প্রযুক্তিনির্ভর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মাধ্যমে এই বৈষম্য কমানো সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, শ্রীলঙ্কায় চালু হওয়া কিউআর ভিত্তিক ‘ন্যাশনাল ফুয়েল পাস’ পদ্ধতির মাধ্যমে নির্দিষ্ট সাপ্তাহিক কোটা নির্ধারণ করে জ্বালানি বিতরণ করা হচ্ছে, যা একাধিকবার জ্বালানি সংগ্রহ ও কালোবাজারি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর হয়েছে। এছাড়া ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন ও ভিয়েতনামসহ বিভিন্ন দেশ নির্দিষ্ট দিনভিত্তিক সরবরাহ, সীমিত কোটা এবং ‘ওড-ইভেন’ পদ্ধতি চালুর মাধ্যমে চাহিদা নিয়ন্ত্রণে রাখছে।

তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশের বাস্তবতায় ড্রাইভার-নির্ভর ব্যবহার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, কারণ অধিকাংশ ক্ষেত্রে যানবাহনের মালিক নিজে জ্বালানি সংগ্রহ করেন না। তাই ড্রাইভার-ভিত্তিক ওটিপি যাচাইকরণ যুক্ত করা হলে ব্যবস্থাটি আরও কার্যকর ও বাস্তবসম্মত হবে।

এই ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে একই ব্যবহারকারীর একাধিকবার জ্বালানি গ্রহণ সীমিত করা, পাম্পের স্টক পর্যবেক্ষণ, অস্বাভাবিক লেনদেন শনাক্ত করা এবং কেন্দ্রীয় ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে রিয়েল-টাইম মনিটরিং সম্ভব হবে। ফলে কালোবাজারি ও অনিয়ম অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

তবে ওটিপি শেয়ার করার ঝুঁকি, ডিজিটাল সাক্ষরতার ঘাটতি, প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা এবং ডেটা নিরাপত্তা নিশ্চিত করা—এসব বিষয় এই ব্যবস্থার সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।

সবশেষে অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, জ্বালানি সঙ্কটে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কেবল সরবরাহ নয়, বরং এর ন্যায্য ব্যবহার নিশ্চিত করা। বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা বলছে, সঙ্কট যত গভীর হয়, প্রযুক্তিনির্ভর নিয়ন্ত্রণ তত বেশি প্রয়োজন হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একটি কার্যকর ডিজিটাল রেশনিং কাঠামো হতে পারে সময়োপযোগী ও টেকসই সমাধান।