বৈশাখেই হাওরে বর্ষার রূপ, কৃষকের মাথায় ঋণের বোঝা

কৃষকদের অভিযোগ, ব্যাংক, এনজিও ও স্থানীয় মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে তারা বোরো আবাদ করেছিলেন। বৈশাখে নতুন ধানে গোলা ভরার স্বপ্ন দেখলেও এখন সেই স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। ঋণ পরিশোধ, সংসার চালানো, সন্তানদের লেখাপড়া, চিকিৎসা ও আসন্ন কোরবানির ঈদের খরচ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন তারা।

তৌহিদ চৌধুরী প্রদীপ, সুনামগঞ্জ

Location :

Sunamganj

টানা বর্ষণ ও ভারতীয় পাহাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বৈশাখ মাসেই হাওরজুড়ে নেমে এসেছে বর্ষার আবহ। বিস্তীর্ণ এলাকার ধানখেত পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন কৃষক ও গৃহস্থ পরিবারগুলো।

কয়েক দিনের রোদে কোথাও কোথাও কাটা ও মাড়াই করা ধান শুকাতে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষাণীরা। অন্যদিকে কৃষকরা হাঁটু, কোমর এমনকি বুকসমান পানিতে নেমে কষ্টার্জিত ধান রক্ষার প্রাণান্তকর চেষ্টা চালাচ্ছেন। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, পানি আরও বাড়লে সাঁতার কেটে বা অন্য উপায়ে ধান তুলতে হবে।

সুনামগঞ্জের বিভিন্ন হাওরে এখন এমন দৃশ্যই চোখে পড়ছে। ধান সংগ্রহের পাশাপাশি গবাদিপশুর খাদ্য জোগাড় করতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে কৃষকদের।

কৃষকদের অভিযোগ, ব্যাংক, এনজিও ও স্থানীয় মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে তারা বোরো আবাদ করেছিলেন। বৈশাখে নতুন ধানে গোলা ভরার স্বপ্ন দেখলেও এখন সেই স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। ঋণ পরিশোধ, সংসার চালানো, সন্তানদের লেখাপড়া, চিকিৎসা ও আসন্ন কোরবানির ঈদের খরচ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন তারা।

অনেক কৃষক জানান, যে ধান কিছুটা সংগ্রহ করতে পেরেছেন, বাজারে দাম কম থাকায় তা বিক্রি করতে পারছেন না। আবার হাওরে ফেলে রাখায় অনেক ধানে চারা গজাতে শুরু করেছে। ফলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়ছে।

সুনামগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দাবি, বিভিন্ন হাওরে প্রায় ২০ হাজার হেক্টর জমির বোরো ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে কৃষকদের দাবি, প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ আরও অনেক বেশি। তাদের ভাষ্য, জেলায় প্রায় ৪০ শতাংশ ধান নষ্ট হয়েছে। সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন বর্গাচাষি ও ক্ষুদ্র কৃষকরা।

জামালগঞ্জ উপজেলার ফেনারবাঁক গ্রামের কৃষক তোফায়েল আলম চৌধুরী বলেন, “৩৬ কিয়ার জমিতে ধান আবাদ করেছিলাম। অনেক কষ্টে কিছু ধান কাটতে পারলেও অধিকাংশ জমি তলিয়ে গেছে। শ্রমিকের মজুরি, সংসার খরচ, সন্তানদের পড়াশোনা—সবকিছু নিয়ে এখন দুশ্চিন্তায় আছি।”

একই গ্রামের বর্গাচাষি ফারুখ মিয়া বলেন, “ঋণ করে অন্যের জমি নিয়ে চাষ করেছি। এখনও একটি ধানও কাটতে পারিনি। সব পানির নিচে। এখন ঋণ শোধ করবো কীভাবে, সংসারই বা চালাবো কী করে বুঝতে পারছি না।”

লক্ষীপুর গ্রামের কৃষক হেলাল মিয়া জানান, তার ২০ কিয়ার জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। ঋণের চাপ এখন তাকে দিশেহারা করে তুলেছে।

এদিকে বন্যার আশঙ্কা, বজ্রপাতের ভয় এবং টানা দুর্ভোগের মধ্যেও কৃষকরা ধান তোলার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরির কাজ চলছে। সরকারের পক্ষ থেকে তিন মাস মেয়াদি সহায়তা কার্যক্রম চালু করা হয়েছে এবং পর্যায়ক্রমে জেলার সব উপজেলার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তা দেয়া হবে।